‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন’
Advertisement
জয়া ফারহানা
প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: এএফপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রসঙ্গ ও অভিযোগ দুটোই পুরনো। ২০০৯ সালের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি প্রণয়নের নির্দেশ জারি করে ২০১৪ সালে।
গত বছর ৩০ জুলাই আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির খসড়া প্রকাশ হয়। কারা শরণার্থী, অনুপ্রবেশকারী আর কারাই বা নাগরিক তা নির্ধারণে যে খসড়াপঞ্জি তৈরি হয়েছিল তা থেকে বাদ গিয়েছিল ৪০ লাখ নাগরিক।
এ ৪০ লাখ তথাকথিত অনাগরিক যারা কোনো না কোনো কারণে নাগরিকপঞ্জিভুক্ত হতে পারেনি, সংশোধনের রক্ষাকবচ যেন তাদের রক্ষা করে, নির্ভুল হয়ে যেন প্রকাশিত হয় চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি, আশা ছিল সেটাই।
কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে নাগরিকপঞ্জি সংক্রান্ত সমস্যায় তৈরি হয়েছে নতুন নতুন অভিমুখ। পাস হয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। যে কারণে আবার ফিরে এসেছে প্রসঙ্গটি। আবার চারপাশে একে ঘিরে আলোচনা।
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন এ সমস্যার একটি অভিমুখ, তবে সবচেয়ে বড় অভিমুখটি রয়েছে বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির মধ্যে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের এ তাস চতুরতার সঙ্গে এনআরসির মাধ্যমে খেলছে বিজেপি। বলা হচ্ছে, এনআরসি নাকি সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অনুসারে হচ্ছে।
কিন্তু বিজেপি নেতা, বিশেষ করে, অমিত শাহর আগ্রাসী বক্তব্য শুনলে মনে হয়, এনআরসির গাইডলাইন দিচ্ছেন তারাই। তার ভাষায় ’৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুরা ভারতে এসেছে তারা শরণার্থী আর যে মুসলিমরা এসেছে তারা অনুপ্রবেশকারী।
এ অনুপ্রবেশকারীদের নাকি গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে হবে। অমিত শাহর মতো বিবেকরা না হয় শীতঘুমে; কিন্তু ১২৫ কোটি ভারতবাসীর রক্ষাকবচ ভারতের সংবিধানও কি শীতঘুমে?
প্রদীপে তেল ঢালার আগে থাকে সলতে পাকানোর কাজ। দিল্লির রাস্তায় উর্দু ভাষায় লেখা এক দেয়াললিখনকে কেন্দ্র করে গ্রাফিতি শিল্পীদের প্রতি গেরুয়া শিষ্যদের মারমুখী আচরণ, কার ফ্রিজে কোন মাংস আছে তা নিয়ে গেরুয়াবসনধারী গুরুত্বপূর্ণদের মাথাব্যথা, তার জের ধরে গণপ্রহারে নিরীহ আখলাখের মৃত্যু, সমঝোতা এক্সপ্রেস মালেগাঁও বিস্ফোরণে হিন্দু অভিযুক্তদের একের পর এক ছাড় পেয়ে যাওয়া- এসবই ছিল বিভাজনের রাজনীতিতে প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর কাজ। ভিএইচপি নেত্রী সাদ্ধী প্রাচী তো বলেই ফেলেছিলেন দেশকে প্রায় কংগ্রেসমুক্ত করে ফেলেছি, এবার মুসলমানমুক্ত করার পথে হাঁটব।
ক্ষমতাসীন রাজনীতির ওপর আরএসএসের প্রভাব কতটা প্রবল হয়ে উঠছে এসবই তার উদাহরণ। সম্রাট আকবর ভারতজুড়ে বিভেদের মধ্যে ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন।
এ আকবরের নামাঙ্কিত সড়কটি পর্যন্ত বিজেপি নেতাদের এলার্জি হয়ে উঠেছে। ভারত ভাগের পর মুসলিমদের ওপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে উগ্রপন্থী হিন্দুদের হাতে নিহত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী।
তিনি তো বিজেপি নেতাদের বড় এলার্জি। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে মহাত্মা গান্ধীর সমান উচ্চতা দিতে গিয়ে তার সর্বোচ্চ উচ্চতার ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। ভারতে এখন বল্লভভাই প্যাটেল মহাত্মা গান্ধীর চেয়ে অধিকতর উচ্চতায়!
মানছি সীমান্তবর্তী রাজ্য গুজরাটে অনুপ্রবেশের সমস্যা বেশ পুরনো। পাক সীমান্তে চোরাচালান থেকে শুরু করে পাকিস্তান গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের মদদপুষ্টদের অনুপ্রবেশ আর পাঁচটি সীমান্তবর্তী রাজ্যের মতোই।
কিন্তু ভারত যখন অনুপ্রবেশকারী প্রসঙ্গ ধরে পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে এক কাতারে ফেলে কিংবা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের চেয়েও সন্দেহের চোখে দেখে, তখন গীতার মোক্ষযোগ অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৩২ নম্বর শ্লোকটির কথা মনে পড়ে। অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমস্যবৃতা/সর্বার্থান বিপরীতাংশচ বুদ্ধি: সা পার্থ তামসী।
হে পার্থ, যে বুদ্ধি অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে অধর্মকে ধর্ম মনে করে এবং সব বিষয়ে বিপরীত বোঝে তা তামসিক বুদ্ধি। অধর্মই যখন ধর্ম, বুদ্ধিবিহীন কুযুক্তিই যখন অপকর্মের ঢাল কিংবা অজুহাত, তখন দুটি সংগীত বড় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। একটি কাজী নজরুলের ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন’, অন্যটি জন লেননের ‘গিভ পিস এ চান্স’।
কিন্তু ব্যাধি যদি হয় অনিরাময়যোগ্য, সংগীত তাতে কতটুকুই বা প্রলেপ দিতে পারে? গঙ্গা পদ্মা সমান মর্যাদার মা, মেঘনা যমুনা দুই চোখের সমান জলধারা এত গাওয়ার পরও পানিচক্রের নির্মম আবর্ত থেকে রেহাই পেলাম কই?
আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কারণে সবচেয়ে লাভবান রাজ্য খরাপ্রবণ হরিয়ানা। অথচ এ আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কারণে ভাটি অঞ্চল বাংলাদেশের কৃষি জীববৈচিত্র্য এবং আবহাওয়ায় কত নেতিবাচক পরিবর্তনই যে এসেছে! বেড়েছে মরুকরণ লবণাক্ততা। বিপরীতে সেচসিক্ত হয়েছে হরিয়ানা।
পরিণত হয়েছে সর্বোচ্চ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্যে। সর্বোচ্চ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্য হরিয়ানায় পেঁয়াজের কেজি যখন পাঁচ টাকা, বাংলাদেশ তখন ২৫০ টাকায় পেঁয়াজ কিনে খেয়েছে।
বাংলাদেশ যখন পেঁয়াজের অভাবে মুলা আর মিষ্টি কুমড়া দিয়ে তরকারি রান্না করে খাচ্ছে, ভারত তখন মালদ্বীপে পেঁয়াজ রফতানি করেছে। সুবীর নন্দীর মতো আক্ষেপ নিয়ে গাইতে হয় ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্র“ বলে গণ্য হলাম। তবু একটা কিছু হয়েছি যে তাতেই আমি ধন্য হলাম!’
পেটে খাবার থাকলে পূর্ণিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি মনে হয় না। পরনে ম্যানচেস্টারের শীতবস্ত্র থাকলে শৈত্যপ্রবাহের মধ্যেও পৌষ মোহনীয় মনে হয়। সত্যি কথা বলতে মাথার ওপর ছাউনি এসবের চেয়ে বড়। অন্নহীনকে অন্ন দেয়া, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেয়া যতটা সরল মানবিকতা, বিপরীতে ততটাই জটিল কে নাগরিক আর কে নাগরিক নয়, তা নির্ধারণে কী সূচক ব্যবহার হবে সে রাজনীতি।
ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, ইতিহাসের সাক্ষ্যে বলা যায়, মুসলিমরা গোত্র ও পিতৃপরিচয়ের চেয়েও বেশি পছন্দ করে জন্মভূমির পরিচয়ে পরিচিত হতে। মক্কী, মদনী, নিশাপুরী, সমরখন্দী, বুখারি, খোরাসানী, এলাহাবাদী, দেহলভী, বেলভী, তাবকরেজী, কনুঈ, কাবুলী, রুমী, আফগানি এমন আরও বহু দৃষ্টান্ত দেয়া যায়।
ভাবছি, সেই লক্ষ মুসলিমে কথা যারা তাদের পিতৃভূমিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে অথচ এ মুহূর্তে আশঙ্কায় রয়েছে সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়ার। এ হাড় কাঁপানো শীতে প্রবল ঠাণ্ডা হাওয়ায়, থার্মোমিটারের পারদ যখন নামছেই তখন এ লাখ লাখ মানুষ আছে শীতের চেয়েও শীতলতর সমস্যায়। উদ্বাস্তু সমস্যায় যে পড়েছে সেই বোঝে এ কষ্টের মর্ম।
বিশ্বজুড়ে চলছে নতুন বর্ষবরণের প্রস্তুতি। বিপুল আওয়াজের সেই ডামাডোলের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে কয়েক লাখ মানুষের আর্তনাদ আর দীর্ঘশ্বাস। শিকাগোয় শরণার্থী, না অনুপ্রবেশকারী এ কূটতর্কে মা-বাবার কোল থেকে বাচ্চা আলাদা হওয়ার মেক্সিকান ট্র্যাজেডিতে আমরা তো যারপরনাই আবেগে আপ্লুত হই।
সেটা কি এ কারণে যে তা একটু দূরের ঘটনা? নাকি বাচ্চাগুলো সাদা রঙের, চেহারা ছবি ভালো বলে তাদের প্রতি আমাদের মায়া তৈরি হয়?
প্রশ্ন হচ্ছে, কে শরণার্থী আর কে অনুপ্রবেশকারী তার দায় কার? কে-ই বা বিচার করবে এ প্রমাণের সত্যতা? প্রমাণের অভাবে বঞ্চিতদের কি সত্যি ঠেলে দেয়া হবে বাংলাদেশে? এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কি আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে তবে এ কেমন রাজনীতি বিজেপির?
‘বিনাশকালে বুদ্ধি নাশ’ বহু পরিচিত একটি প্রবাদ। ভারতের অর্থনৈতিক মন্দা ও অন্যান্য সমস্যার কথা এ পরিসরে আলোচনার সুযোগ নেই; তবে নানা ঘটনায়ই বিজেপির আত্মতুষ্টির ফানুস ফেটে যেতে দেখছি। তাতে বিনাশের ইঙ্গিতও দেখা যায়।
আশার বিষয় এটুকুই যে, ভারতে এখনও শুভবুদ্ধির মানুষের অভাব নেই। তবে তারা বিজেপির বিভাজনের রাজনীতিকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারবেন প্রশ্ন সেটাই।
জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
