Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বক্ষণে

Advertisement

Icon

এ কে এম শাহনাওয়াজ

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বক্ষণে

Advertisement

১৯৭১। অক্টোবর মাস থেকেই পাকবাহিনীর ওপর মরণকামড় দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য ভারতের সরাসরি সামরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। ডিসেম্বরের শুরুতেই সে সুযোগ তৈরি হল। বেধে গেল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের দুর্বল দশা স্পষ্ট হতে থাকে।

যৌথবাহিনী বাংলাদেশের অনেকটা অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। কার্যত পাকিস্তানি বিমান ও নৌবাহিনী অকেজো হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় ছড়িয়ে পড়েছিল নানা ধরনের গুজব। প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ড. মালিক জেনারেল নিয়াজিকে গভর্নর হাউসে ডেকে পাঠান।

এ সময় সেনাবাহিনীর প্রেস কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিয়াজি গভর্নরের সামনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। পাকবাহিনীর দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।

তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গভর্নর জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে বার্তা পাঠাবেন যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে। পাকিস্তানি সামরিক অফিসাররাও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলেন। নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতে থাকেন।

পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রেক্ষাপট রচিত হয় ৯ ডিসেম্বর থেকেই। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা শত্রুমুক্ত হচ্ছিল। অনেক শহরে হানাদার বাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে থাকে। পাকবাহিনীর সৈন্যরা আত্মরক্ষার্থে পালিয়ে আসছিল ঢাকার দিকে।

এমন একটি পরিস্থিতিতে ৯ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ড. এএম মালিক ইয়াহিয়া খানের কাছে একটি বার্তা পাঠান। অতিদ্রুত যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। ইয়াহিয়া খান গভর্নর মালিক ও সেনাপ্রধান নিয়াজি উভয়কেই তাদের বিবেচনামতো সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দেশ দেন।

এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মার্ক হেনরি পাঁচ দফার একটি প্রস্তাব পাঠান। এগুলো হচ্ছে : ১. অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে ২. সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিতে হবে ৩. পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত অন্যসব নাগরিক, যারা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে ইচ্ছুক; তাদের পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিতে হবে ৪. ১৯৪৭ সাল থেকে যারা পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করছে, সেসব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে এবং ৫. নিশ্চয়তা দিতে হবে, এদের কখনও দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে না।

তবে এ প্রস্তাব যে তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পেরেছে, তেমন মনে হয়নি। এদিকে গভর্নর মালিক পরবর্তী নির্দেশনার জন্য রাওয়ালপিন্ডির দিকে তাকিয়েছিলেন। অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ১৪ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় গভর্নর হাউসে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি সভা ডাকেন তিনি এ সংবাদ সকাল সাড়ে ৯টায় ভারতীয় বাহিনীর সিগন্যাল ইনটেলিজেন্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লে. কর্নেল পিসি ভাল্লা পেয়ে যান।

তিনি দ্রুত টেলিফোনে এয়ার ভাইস মার্শাল দেবাসেরকে জানান। শিলংয়ে অবস্থিত ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডের তিনি একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, এ সময় গভর্নর হাউসে বিমান হামলা করলে আত্মসমর্পণের বিষয়টি ত্বরান্বিত হবে।

সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী, সভায় কর্মকর্তারা যোগ দেয়ার আগেই ভারতীয় বিমান থেকে গভর্নর হাউসে বেশ কয়েকটি বোমা নিক্ষিপ্ত হয়। গভর্নর মালিক ভীত হয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয় নেন।

১৩ অথবা ১৪ ডিসেম্বর রাতে নিয়াজি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদকে অনুরোধ করেন, যাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যুদ্ধ বন্ধের পদক্ষেপ নেন। ১৪ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খান নিয়াজির কাছে বার্তা পাঠিয়ে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেন।

নিয়াজির কাছে প্রেসিডেন্টের বার্তা এসে পৌঁছায় বিকাল ৩টায়। এরপর নিয়াজি এবং রাও ফরমান আলী ছুটে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল হার্বার্ট স্পিভেকের কাছে। তারা অনুরোধ করেন, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাতে যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা করেন।

স্পিভেক জানান, এ ধরনের আলোচনার জন্য যথাযোগ্য পদমর্যাদার অধিকারী তিনি নন। রাও ফরমান আলী প্রাসঙ্গিক একটি বার্তা প্রস্তুত করে এনেছিলেন। তারা বার্তাটি স্পিভাকের কাছে দিয়ে চলে আসেন।

বার্তাটিতে তারা যুদ্ধে সাধারণ মানুষের জীবনহানির কথা বলে একটি মানবিক আবেদন জানান। এর সম্মানজনক সমাধানের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবগুলো ছিল নিম্নরূপ-

ক. যুদ্ধ বন্ধ ও পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত সব শত্রুতা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

খ. জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পূর্ব পাকিস্তানের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রশাসন হস্তান্তর করতে হবে।

গ. জাতিসংঘকে নিশ্চিত করতে হবে-

১. পাকিস্তানের সব সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

২. পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানোর পূর্বপর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সব পশ্চিম পাকিস্তানি সাধারণ মানুষ, বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩. ১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সব অভিবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৪. ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তান সরকারকে সহযোগিতা করেছে; তাদের ওপর কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না- এ নিশ্চয়তা প্রদান।

এসব প্রস্তাবনার একটি কপি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রাও ফরমান আলীর হাতে দেয়া হয় গভর্নরের কাছে পৌঁছানোর জন্য। তবে বার্তাটি ভারতের কর্তৃপক্ষের কাছে না দিয়ে একটি কপি ওয়াশিংটনে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

১৯৭১-এ ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান (Chief of Staf) লে. জেনারেল জ্যাক জ্যাকব তার গ্রন্থে বলেছেন, ‘১৪ ডিসেম্বর বিকাল ৫টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কলকাতাস্থ কনসুলার অফিসের একজন কূটনীতিক তাকে স্পিভেকের সঙ্গে নিয়াজির সাক্ষাৎ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন।

তিনি জানান, এ সময় যুদ্ধ বন্ধ বা আত্মসমর্পণ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা হয়। জ্যাকব তখন কলকাতায় নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল হার্বার্ট গর্ডনকে টেলিফোন করেন; কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে তার অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবুও জ্যাকব বিষয়টি পুনরায় খোঁজ নিতে অনুরোধ করেন।

কিন্তু কনসাল জেনারেল নতুন কোনো তথ্য দেননি। এরপর জ্যাকব সেনাপ্রধান মানেকশকে টেলিফোন করে অনুরোধ জানান, তিনি যাতে দিল্লিতে নিয়োজিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বাসেডরের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করেন। অ্যাম্বাসেডর জানান, এ ব্যাপারে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।

তবে তার জানামতে, স্পিভেক তার বার্তাটি পাকিস্তানে নিয়োজিত তাদের অ্যাম্বাসেডরকে পাঠিয়েছেন এবং অ্যাম্বাসেডর তা পাঠিয়ে দিয়েছেন ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টে। পরে কিসিঞ্জার স্বীকার করেছিলেন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রস্তাবটি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে একদিন অপেক্ষা করতে বলেছিলেন।

বার্তাটি মানেকশ ১৫ ডিসেম্বর পান। তিনি পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ড ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিয়াজি আত্মসমর্পণের আহ্বানে সাড়া দেন। এখানে এ তথ্যটিও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা যায় যে, ১৫ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো সক্রিয় হয়ে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স ভারতের কাছে যুদ্ধবিরতির পক্ষে অভিমত প্রকাশ করে।

১৫ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা থেকে পরদিন অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর প্রথমে সকাল ৯টা পরে তা বাড়িয়ে বিকাল ৩টা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যুদ্ধবিরতিতে (যা বস্তুতপক্ষে আত্মসমর্পণ হিসেবে গৃহীত হবে) সম্মতিদান করেন।

তবে পাকিস্তান পক্ষ ‘আত্মসমর্পণ’ (Surrender) শব্দটি ব্যবহার না করার জন্য চেষ্টা করেছিল। স্পিভেকের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের দলিলটি নিয়াজি পান এবং এতে সম্মতি প্রকাশ করেন। জ্যাকব লিখেছেন, জেনারেল মানেকশ ১৬ ডিসেম্বর সকাল সোয়া ৯টায় তাকে আদেশ দেন দ্রুত ঢাকায় চলে যেতে এবং সন্ধ্যার মধ্যে আত্মসমর্পণের কাজ সম্পন্ন করতে।

তিনি জানিয়ে দেন, ইতিমধ্যে ব্রিগেডিয়ার সেন্থা অরোরাকে নিয়ে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত দলিল প্রস্তুত করেছে।... জ্যাকব ঢাকা পৌঁছে নিয়াজির সদর দফতরে যান। এখানে তিনি মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের না আসার পরামর্শ দেন। তার মতে, এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা খুবই উত্তেজিত ছিল।

ফলে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তার সঙ্গে শুধু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কয়েকজন সংবাদকর্মী যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা চিৎকার করে বলছিলেন, আমরা ভেতরে যেতে চাই; আমরা নিয়াজি ও তার সহযোগীদের ওপর প্রতিশোধ নেব।

ঘৃণাভরা নানা শব্দে তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন। জ্যাকব মুক্তিযোদ্ধাদের বোঝালেন, কিছুক্ষণের মধ্যে আত্মসমর্পণ সম্পন্ন হবে। তারা যেন চারদিকের পরিবেশ শান্ত রাখার ব্যবস্থা করেন। এখন যুদ্ধবিরতি চলছে। আর সবারই জেনেভা কনভেনশনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। মুক্তিযোদ্ধারা বিষয়টি বুঝতে পেরে সেখান থেকে চলে যান। জ্যাকব বেলা ১টায় নিয়াজির দফতরে পৌঁছেন।

নিয়াজি অভ্যর্থনা জানান ভারতীয় জেনারেলকে। এ সময় নিয়াজি ছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল জমশেদ, নৌবাহিনীপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ, এয়ার কমডোর ইমাম এবং ব্রিগেডিয়ার বাকার সিদ্দিক।

এর আগে ভারতীয় বাহিনীর মেজর জেনারেল জিসি নাগরার মেসেজ আসে। যৌথবাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বার্তায় তিনি নিয়াজিকে জানান, তিনি তার বাহিনী নিয়ে মিরপুর ব্রিজের কাছে চলে এসেছেন। তিনি যাতে তার প্রতিনিধি পাঠান। নাগরা একটি সাদা পতাকা ওড়ান। পাকিস্তানি সৈন্যরা নাগরাকে স্কট করে নিয়াজির সদর দফতরে নিয়ে যায়।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Advertisement

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ স্বাধীনতা

Advertisement

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকার সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

সমৃদ্ধি ভাগাভাগির বিশ্ব হোক আমাদের এই গ্রহ: টমাস পিকেটি

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

ভারতে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু রুখতে তরুণদের অদম্য প্রতিরোধ

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

জেরুজালেম : ইতিহাসের এক মহাকাব্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম