Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

দক্ষ জনশক্তির অভাব ও বেকারত্ব

Advertisement

Icon

ড. মো. কামরুজ্জামান

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষ জনশক্তির অভাব ও বেকারত্ব

Advertisement

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা, বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যা, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, আবাসন, কর্মসংস্থান, জীবনমান ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গবেষণা চালিয়ে একটি ফলাফল প্রস্তুত করে তা জাতির সামনে পেশ করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে ৬ হাজার ৭০ জন শিশু। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্র্ট) রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে প্রতি মিনিটে জন্মগ্রহণ করে ৫.৮টি নবজাতক। মৃত্যুবরণ করে ১.৬ জন।

প্রতি মিনিটে এদেশে জনসংখ্যা বাড়ছে ৪.২ জন। প্রতি ঘণ্টায় বৃদ্ধি পাচ্ছে ২৫৩ জন। মাসে বাড়ছে ১ লাখ ৮২ হাজার ১০০ জন। আর বছর শেষে মোট জনসংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ নতুন শিশু। এ শিশুরা আমাদের নতুন মেহমান। মেহমানের আগমন নিশ্চয়ই আনন্দের। আর প্রত্যেক বাবা-মায়ের কাছে শিশুর আগমন মানেই হল নতুনের গান গাওয়া; নতুনের কেতন উড়ানো। সীমাহীন আনন্দের ব্যাপার এটি। সাধারণের কাছে আনন্দের হলেও বিষয়টি নিয়ে গবেষকরা রীতিমতো হতাশা প্রকাশ করেছেন।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে প্রতিটি শিশু ৬০ হাজার টাকা বাজেট ঘাটতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বছর শেষে প্রতিটি নবজাতকের মাথার ওপর ঋণের বোঝা চাপছে এক লাখ টাকা। তার মানে হল, প্রতিদিন ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ ৩৬ কোটি টাকা। শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসাসহ অন্যান্য বিষয়ের সুযোগ লাভ করা শিশুর মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা নীতির অংশ হিসেবে শিশুরা এ অধিকারগুলো পূর্ণ মাত্রায় ভোগ করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের সংবিধানে এ অধিকারের কথা উল্লেখ থাকলেও সামগ্রিকভাবে শিশুরা তা থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ তরুণ, যাদের বয়স ২৪ বছর বা এর নিচে। আর কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ এবং তাদের সবার বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। দেশের এ জনসংখ্যা নিঃসন্দেহে দেশের সম্পদ। এটি যে কোনো দেশের জন্য ভালো খবর। কিন্তু হতাশার ব্যাপার হল, এ বিশাল জনশক্তির অধিকাংশই বেকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমান অশিক্ষিত বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। আর শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ।

এ প্রতিবেদন বলছে, দেশে প্রাথমিক পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ, মাধ্যমিক পাস করা যুবকের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ আর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজারের বেশি। উল্লেখ্য, সর্বস্তরের বেকাররাই বয়সে তরুণ এবং তাদের প্রত্যেকের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে এসএসসি পাস করা তরুণ-তরুণীদের ২৭ শতাংশ, এইচএসসি পাস করা তরুণ-তরুণীদের ২৮ শতাংশ বেকার এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার যথাক্রমে ৩৭ ও ৩৪ শতাংশ।

এর সঙ্গে যুক্ত হল ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা না দিয়ে পাস করা আরও ১৩ লাখ তরুণ-তরুণী। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের হিসাবমতে, করোনাকালীন মহামারীর কারণে দেশে বেকার হবে প্রায় দেড় কোটি মানুষ।

এ প্রেক্ষাপটে নতুন জন্ম নেয়া এ শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন মহল খুবই উদ্বিগ্ন। দেশে তরুণ-তরুণীরা কাজ চায়; কিন্তু পায় না। কারণ তারা উন্নত বিশ্বের মতো বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মমুখী শিক্ষা পায়নি। তারা শুধু পাস করেছে আর সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। ফলে সার্টিফিকেটনির্ভর লেখাপড়া তাদের কোনো কাজে আসছে না। তরুণ-তরুণীদের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করতে চলে যায় ২৪-২৫ বছর। আর লেখাপড়া শেষে একটা ভালো চাকরি পাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা তাদের নেই। ফলে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে এক বিপজ্জনক পথে পা বাড়াচ্ছে এবং ভুল পথ বেছে নিচ্ছে।

রাজনৈতিক বড় ভাই এবং প্রভাবশালী টাকাওয়ালাদের বিশ্বস্ত অনুচর আর অনুসারী হয়ে তারা তোষামোদ ও দলবাজিতে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। তারা অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত, জঙ্গিবাদ, খুন, মাস্তানি চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এ অসামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম হল বিবাহবহির্ভূত অজাচার। আর এ অজাচার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল আমাদের সামাজিক অব্যবস্থাপনা। কেননা, এ সমাজব্যবস্থার অন্যতম একটি প্রথা হল, চাকরি না হলে বিয়ে করা যাবে না।

অর্থাৎ চাকরি নেই তো বিয়ে নেই- ব্যাস্ ওখানেই শেষ। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কেউই এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসে না। ফলে যা ঘটার তাই ঘটে। যৌবনের আবেদন পূরণ করতে অনেকে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য পথ বেছে নেয়। সম্প্রতি অনৈতিক এ অজাচারের বিরুদ্ধে জনগণ ফুঁসে ওঠে। দেশের সচেতন জনতা প্রতিবাদ করে, বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং অবশেষে কর্তৃপক্ষ করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান। এতৎসত্ত্বেও সমাজে স্বস্তি ফিরে আসছে না। তরুণদের মধ্যে ফিরে আসছে না স্থিরতা। অপরাধ আর বিশৃঙ্খলা যেন বেড়েই চলেছে।

মূলত যে কোনো দেশে সামাজিক শৃঙ্খলা জাগ্রত করতে এবং তা বজায় রাখতে মানুষের দুটি বিষয় দরকার। একটি হল ধর্মীয় অনুশাসনের যথাযথ অনুসরণ ও তার বাস্তবায়ন। আর অপরটি হল, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুশাসন। ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের মানবিক মূল্যবোধকে সদা জাগ্রত রেখে নিজের ও সমাজের পাহারাদার হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। মানুষকে ইনসান বলা হয়। আর ইনসান অর্থ ভুল করা ও ভুলে যাওয়া।

তাই সে ভুল করবে, ভুলে যাবে; এটাই স্বাভাবিক। আর যখন সে ভুল করবে, তখনই রাষ্ট্র এগিয়ে আসবে। রাষ্ট্র খতিয়ে দেখবে কেন সে ভুলটি করল- অভাবে না স্বভাবে? অপরাধের ধরন অনুযায়ী রাষ্ট্র তখন ব্যবস্থা নেবে। জাতির দুর্ভাগ্য এই যে, তারা দীর্ঘ অর্ধশত বছরেও পেল না একটি যুগোপযোগী, সময়োপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, পেল না সামগ্রিক জনবান্ধব একটি রাষ্ট্র আর একটি নৈতিক সমাজ।

দেশে বিপুল জনশক্তি বেকার অথচ দেশীয় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিক আমদানি করা হচ্ছে। কারণ ওই একটাই- বাজারের চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনশক্তির অভাব। আর এ কারণেই দেশের এ বিপুল জনশক্তি তেমন কোনো কাজে আসছে না। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান হার দেশকে বড় ধরনের ঝুঁকির দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমি ও সম্পদের তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি।

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার চীন, ভারত, বাংলাদেশ- এ তিনটি দেশই ব্যাপক জনবহুল। আর অতিমাত্রায় জনঘনত্ব বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চীনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৪২ জন মানুষ বসবাস করে। ভারতে প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় বসবাস করে ৩৪৬ জন। আর বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে ১২০০ জন। ২০২১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ১৭ কোটি ২৩ লাখ। আর ২০৫০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২৩ কোটিতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সম্পদ ও জমির তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। তারা বলছেন, যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে সে হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বর্তমানে দেশের মোট জনশক্তির ৬৬ শতাংশ কর্মক্ষম আর ১৫ বছর পর এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৭০ শতাংশে। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হবে প্রায় ১৩ কোটি। অন্যদিকে ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখ। আশঙ্কার ব্যাপার হল, ৮০ শতাংশের বেশি নবজাতক জন্ম নেয় এ দরিদ্র, অসহায় আর বস্তিবাসী পরিবারে। আর শিক্ষিত ও ধনী পরিবারে জন্ম নেয় মাত্র ২০ শতাংশ নবজাতক বা এর কম।

৫-১০ তলা সুরম্য অট্টালিকায় স্বর্গীয় জীবনযাপনে যখন ব্যস্ত সময় পার করছে মাত্র ৩ থেকে ৪ জন মানুষের বিত্তশালী একটি পরিবার, ঠিক তখন ওই ভবনের নিচে বস্তির একটি জীর্ণ কক্ষে অনাহারে, অর্ধাহারে, অশিক্ষায়, কুশিক্ষায় ঠাসাঠাসি করে জীবন কাটাচ্ছে ১০-১২ জন মানুষের আরেকটি পরিবার। এ দরিদ্র মানুষগুলো অট্টালিকা চায় না, চায় না কোনো বিত্তবৈভব। তারা চায় তিনবেলা তিন মুঠো ভাত, ছোট্ট একটি কর্ম, যা থেকে দিনে আয় হবে মাত্র ৪০০-৫০০ টাকা আর একটু মাথা গোজার ঠাঁই।

কিন্তু এর নিশ্চয়তাও যখন পাচ্ছে না, তখন হতাশায় জর্জরিত এ লোকগুলোর মনে একই গ্রাম বা শহরে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা টাকাওয়ালাদের প্রতি ঘৃণা, ক্ষোভ, হিংসা, ক্রোধ ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে সমাজের প্রভাবশালী, অর্থশালী আর রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি, যারা রাজনীতি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে।

এভাবে সৃষ্টি হচ্ছে শ্রেণিবৈষম্য। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এ শ্রেণিবৈষম্য, শ্রেণি-সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। সুতরাং দলীয় তোষামোদ, নির্লজ্জ দলবাজি আর নোংরা রাজনীতির খেলা বাদ দিয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় শ্রেণি-সংঘর্ষের আগুন একবার জ্বলে উঠলে দলমত নির্বিশেষে সবার ঘরই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। কোনোভাবেই সে আগুন নেভানো সম্ভব হবে না।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

Advertisement

দক্ষ জনশক্তি বেকারত্ব ড. মো. কামরুজ্জামান

Advertisement

আরও পড়ুন

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম