Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

রোহিঙ্গাদের পর এবার চিন জাতিগোষ্ঠী?

Advertisement

Icon

তন্ময় চৌধুরী

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গাদের পর এবার চিন জাতিগোষ্ঠী?

Advertisement

গত ৬ জানুয়ারি বাড়ি ফেরার সময় মিয়ানমারের চিন রাজ্যের (Chin state) সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী পু তুই দিম দেশটির সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। ১৩ বছর বয়সি এক কিশোরসহ একই গ্রামের আরও নয়জন বেসামরিক নাগরিককেও তার সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে পু তুই দিম এবং বাকি গ্রেফতারদের মৃতদেহ খুঁজে পায় গ্রামবাসী। লাশগুলোর হাত পেছনে বাঁধা ছিল। কয়েকজনের গলাও কেটে ফেলা হয়েছে।

অন্যদের পেটে ছুরিকাঘাতের ক্ষত রয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের জনগণের ওপর সেনাবাহিনী নিয়মিতভাবে এ রকম গণহত্যাসহ আরও নৃশংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে আসছে। নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এবং কট্টরপন্থি বামারদের সমর্থন পেতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর একটি পুরোনো কৌশল হলো সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো, যেমনটা চালিয়ে আসছে রাখাইনের রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর।

বলে রাখা ভালো, মিয়ানমারের ১৪টি রাজ্য ও অঞ্চলের মধ্যে চিন রাজ্যটি দেশটির উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত এবং এটি দেশটির দরিদ্রতম রাজ্য। তাছাড়া এটি মিয়ানমারের ক্ষুদ্রতম রাজ্যগুলোর মধ্যেও একটি, যার আয়তন ১৩.৯ হাজার বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার। মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে এবং বাকি ৭৯ শতাংশ মানুষের বাস গ্রামে।

গ্রাম ও শহর উভয় ক্ষেত্রেই নারীর মোট সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে পুরুষদের চেয়ে বেশি। চিন গোষ্ঠী ছাড়াও আরও প্রায় ৫০টি উপগোষ্ঠী পাহাড়-পর্বতপূর্ণ এ রাজ্যে বসবাস করে। অনুন্নয়ন ও দারিদ্র্য রাজ্যটিকে মিয়ানমারের অন্যতম বঞ্চিত অঞ্চলে পরিণত করেছে। রাজ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জনেরও বেশি মানুষের অবস্থান দারিদ্র্যসীমার নিচে। মিয়ানমার বৌদ্ধ অধ্যুষিত হলেও এ রাজ্যটির ৮৫.৪ শতাংশ মানুষ খ্রিষ্টান এবং ১৩ শতাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

উল্লেখ্য, খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ চিন রাজ্য সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অগ্রভাগে রয়েছে। এর প্রত্যুত্তরে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সামরিক বাহিনী বিমান হামলা, ভারী কামান এবং নির্বিচার নিপীড়নসহ ভয়ানক আক্রমণ চালাচ্ছে। শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে এবং কয়েক ডজনকে হত্যা করা হয়েছে।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর সংখ্যালঘুদের গ্রামগুলো পুড়িয়ে ফেলার অনেক উদাহরণ রয়েছে। যেমনটি করা হয়েছে রোহিঙ্গা, কাচিন, শান, কারেন ও কারেন্নি জাতিগোষ্ঠীর ওপর। বাড়িঘর ছাই হয়ে যাওয়ায় বাসিন্দারা কাছাকাছি দেশ বা সম্প্রদায় বা জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রবল নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা যেমন আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে, তেমনি এখন প্রায় ১৬ হাজার চিন আশ্রয় নিয়েছে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে। এ পর্যন্ত সামরিক জান্তার আক্রমণে প্রায় অর্ধলক্ষ চিন বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচারে গ্রেফতার ও আটক, নির্যাতন, মৃত্যুদণ্ড, বেসামরিক এলাকা ও শহরগুলোতে নির্বিচারে গোলাবর্ষণ, রাতের বেলা সহিংস অভিযান এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি ধ্বংস-গত বছর মিয়ানমারজুড়ে এসব ছিল নিত্য ঘটনা, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের আলামত সংগ্রহে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে সেনাবাহিনী।

গত সেপ্টেম্বর থেকে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪টি টাউনশিপে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা অবরুদ্ধ রয়েছে এবং মাঝে মাঝে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া সামরিক আইন জারি করে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ঘটিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করাসহ সব ধরনের মানবিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করে রাখা হয়েছে।

যেহেতু সামরিক জান্তা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণ বাড়িয়েছে, তাই পশ্চিম মিয়ানমারের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত চিন রাজ্যে বাড়িঘর ও গির্জা সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। জানুয়ারি মাসে জান্তার আর্টিলারি আক্রমণে অন্তত ১৩ জন বেসামরিক লোক নিহত এবং আরও ১৫ জন আহত হয়। জান্তা সৈন্যরা চিন রাজ্যে বড় ধরনের আক্রমণ চালাচ্ছে এবং স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনী পুরোনো, ইম্প্র্রোভাইজড হান্টিং রাইফেল ব্যবহার করে লড়াই করছে।

চিন এবং উত্তর-পশ্চিম মিয়ানমারে পণ্য চলাচলও প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক মাস ধরে নতুন কোনো সরবরাহ বা খাদ্য মজুদ না থাকায় জনগণ চরম খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। সিএইচআরও নামক একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যানুসারে, গত বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে সামরিক বাহিনী চিন রাজ্যে ৩৫০টিরও বেশি বেসামরিক বাড়িসহ কমপক্ষে ২২টি চার্চ পুড়িয়ে ধ্বংস করেছে।

অং সান সু চির ‘এনএলডি’ নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রপন্থি ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’কে (এনইউজি) সমর্থন করে ২০২১ সালের এপ্রিলে চিনল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্স (সিডিএফ) নামের একটি প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে ওঠে চিন রাজ্যে। জানুয়ারিতে এ রাজ্যের আটটি টাউনশিপে সিডিএফ এবং জান্তা সেনাদের মধ্যে মোট ৭১টি সংঘর্ষ হয়েছে।

এর মধ্যে মাটুপি টাউনশিপে ২৯টি এবং মিন্দাত টাউনশিপে ১৪টি সংঘর্ষ হয়েছে। সিডিএফ, চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (সিএনএফ) নামের আরেকটি পুরোনো সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ আরও তীব্র হচ্ছে।

বিদ্রোহ দমন অভিযানের অন্যতম কৌশল হিসাবে অগ্নিসংযোগের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কুখ্যাতি রয়েছে। পশ্চিম রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালের একটি নৃশংস অভিযানে সৈন্যরা ২০০টিরও বেশি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়, যার ফলে সাত লাখেরও বেশি মুসলিম রোহিঙ্গা গ্রামবাসী সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডের জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও ধর্ষণও অন্তর্ভুক্ত আছে।

ক্যু-পরবর্তী সামরিক শাসনবিরোধী গণআন্দোলন গড়ে উঠলে তা দমাতে সামরিক বাহিনী যে অভিযান শুরু করে, তাতেও তাদের বিরুদ্ধে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত ২৩ ডিসেম্বর সাগাইং অঞ্চলের দুটি চিন গ্রামে নির্বিচারে বিমান হামলা শুরু করে সামরিক বাহিনী। বেসামরিক লোকেরা পালানোর চেষ্টা করার সময় সৈন্যরা গ্রামে হামলা চালায় এবং কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়।

বড়দিনের প্রাক্কালে সামরিক বাহিনী কায়াহ রাজ্যে মহিলা, শিশু ও ত্রাণকর্মীসহ কমপক্ষে ৩৫ জনকে গাড়িতে পুড়িয়ে হত্যা করে। ‘এএপিপি’ নামক বেসরকারি সংস্থার বরাতে জানা যায়, ক্যু’র পর থেকে এ পর্যন্ত জান্তা বাহিনী প্রায় ১ হাজার ৫৪০ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা এবং ১২ হাজার জনকে নির্বিচারে গ্রেফতার করেছে। তাছাড়া সংঘর্ষের কারণে ফেব্রুয়ারিতে এ পর্যন্ত আনুমানিক ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ মিয়ানমারজুড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

দুঃখজনক বিষয় হলো, এ আক্রমণগুলো ছিল পূর্বাভাসযোগ্য। অথচ বিশ্ববিবেক এখনো এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার আহ্বান সত্ত্বেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। ভূ-রাজনীতির গোলকধাঁধায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হওয়ায় মিয়ানমার সামরিক বাহিনী দায়মুক্তির সঙ্গে নৃশংসতা চালিয়ে যেতে পারছে।

বাড়িঘর ও উপাসনালয় পুড়িয়ে ফেলা ও ধ্বংস করা এবং নিরস্ত্র বেসামরিক লোকদের হত্যা করা অব্যাহত রেখেছে তারা। ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা থেকে বঞ্চিত করছে জান্তাবাহিনী। আর সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ছে সংখ্যালঘুসহ সাধারণ মানুষ। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুরতার কারণে আজ সংখ্যালঘু চিন জাতিগোষ্ঠীর জীবনে যে ভয়াবহ পরিণতি নেমে এসেছে, তা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিভীষিকাময় অবস্থার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

তন্ময় চৌধুরী : গবেষক ও লেখক

[email protected]

 

Advertisement

রোহিঙ্গা চিন জাতিগোষ্ঠী

Advertisement

আরও পড়ুন

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

সাক্ষাৎকার উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম