Logo
Logo
×
   

Advertisement

বাতায়ন

বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন

Advertisement

Icon

মোহাম্মদ শাহজাহান

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন

Advertisement

ইতিহাসে দুটি অসহযোগ আন্দোলনের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। একটি মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। আরেকটি ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তান সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে। মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ২৫ দিন। এই ২৫ দিনে শেখ মুজিব অসাধ্য সাধন করেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ২৫ দিনেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। তখন পাকিস্তানে সামরিক সরকার পুরোপুরি কার্যকর ছিল। কিন্তু এই ২৫ দিন পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের মানুষ মুজিবের নির্দেশেই পরিচালিত হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের শাসন ওই সময় সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। সরকারি-বেসরকারি প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে মুজিবের নির্দেশে চলেছে। পূর্ব বাংলায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিল মুজিবের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। একজন নেতার প্রতি এমন আনুগত্য বিশ্বইতিহাসে বিরল। শুধু শেখ মুজিবকে খুশি রাখার জন্য সামরিক গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ গ্রহণ করাননি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বিএ সিদ্দিকী। ১৯৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণ রিলে করতে না দেওয়ায় বেতার ও টিভি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুটি ভবন তালা দিয়ে সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। সামরিক সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ৮ মার্চ সকালে (সাড়ে ৭টায়) ৭ মার্চের ভাষণ রিলে করার মাধ্যমে বেতার-টিভির সম্প্রচার শুরু হয়। ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসার পর বাঙালি বাবুর্চিরা তার জন্য রান্না করতে অস্বীকার করেন। অসহায় কর্মকর্তারা ৩২ নম্বরের দ্বারস্থ হন। ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে অনুমতির পর বাবুর্চিরা রান্না করতে সম্মত হয়। অবস্থাটা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, বিশ্বের নামিদামি পত্রপত্রিকা ও প্রচার মাধ্যম শেখ মুজিবের ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবনকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সঙ্গে তুলনা করে। পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের লেখা গ্রন্থে তারা লিখেছেন, ওই সময় পূর্ব বাংলার ৭টি সেনানিবাস ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তান সামরিক সরকারের কর্তৃত্ব ছিল না। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান পরবর্তীকালে রাজনীতিবিদ এয়ার মার্শাল আসগর খান ১৯৭১-এর মার্চে ঢাকায় এসেছিলেন। ওই সময় তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। আসগর খান পাকিস্তানে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে সেনানিবাসগুলো ছাড়া সর্বত্র মুজিবের শাসন চলছে।’

১৯৭১-এর ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরকার ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে পূর্ব বাংলার মানুষ রাজপথে নেমে স্লোগান দেয়- ‘ভুট্টোর মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ শেখ মুজিব ঘোষণা করেন মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সামরিক কর্তৃপক্ষকে এক সপ্তাহের সময় দিয়ে তিনি বলেন, ৭ মার্চ পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। শেখ মুজিবের নির্দেশে হরতালসহ অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনির্ধারিতভাবে হাজির হয়ে বক্তৃতাকালে একজন সরকারপ্রধানের মতোই খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেন। শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়। ৭ মার্চ পাকিস্তান সামরিক সরকারের কামান-বন্দুক, মেশিনগান উপেক্ষা করে শেখ মুজিব তার ভাষণে বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব-এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

পাকিস্তান সামরিক সরকার পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর হামলা করার জন্য ছুতো খুঁজছিল। কৌশলী শেখ মুজিব সেই সুযোগ দেননি। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন এবং লিখবেন শেখ মুজিব ৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো বাকিও রাখেননি। ওই ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের আহ্বান জানিয়ে শেখ মুজিব বলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে-তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। রাস্তাঘাট সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দিও।’ পাকিস্তানি চিন্তাবিদ জেনারেল মতিন উদ্দীনসহ দেশি-বিদেশি গবেষক ও ঐতিহাসিকরা বলেন, মূলত ৭ মার্চেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। আন্দোলন চলতে থাকে। প্রতি দিনই আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠন মিছিল করে ৩২ নম্বরে যায়। বঙ্গবন্ধু নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। চূড়ান্ত আঘাত হানবে। তিনিও জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছিলেন। ১৫ মার্চ ৩৫টি নির্দেশ জারি করে শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। ওই দিনই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ইয়াহিয়া ঢাকায় এসে শেখ মুজিব ও তার সহকর্মীদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেন। আর ভেতরে ভেতরে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। শেখ মুজিব ইয়াহিয়া খানকে তার অতিথি হিসাবে উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে তিনি যে ইয়াহিয়া খানকে প্রেসিডেন্ট মানেন না, পরোক্ষভাবে সেটাই জানান দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার গাড়িতে কালো পতাকা এবং বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট হাউজে গিয়ে বৈঠক করতেন। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে শেখ মুজিব প্রতিরোধ দিবস হিসাবে পালন করেন। ওইদিন বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। মেজর সিদ্দিক সালিক এবং জেনারেল রাও ফরমান আলী ভিন্ন ভিন্নভাবে দুটি গ্রন্থে যা লিখেছেন, তার মূল কথা হলো, ওইদিন শেখ মুজিব তার বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বাস্তবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

মার্চের আন্দোলনে মওলানা ভাসানীও শামিল হন। ৯ মার্চ ভাসানী এক জনসভায় তেজোদীপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘পূর্ব বাংলা স্বাধীন হবেই। পাকিস্তান আর অখণ্ড থাকবে না। ইয়াহিয়ার বাপেরও স্বাধীনতাকে ঠেকাবার ক্ষমতা নেই।’ ২৫ মার্চ বিকালে পাকিস্তানের তারিক আলী খানের বাবা মাজহার আলী খান ড. রেহমান সোবহানকে সঙ্গে নিয়ে ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন। রেহমান সোবহান তার গ্রন্থে লিখেছেন, আলোচনাকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছে, তারা কঠোর ব্যবস্থা নেবে। ইয়াহিয়া মনে করেছে যে, আমাকে হত্যা করলেই সে আন্দোলন ধ্বংস করে দিতে পারবে। কিন্তু সে ভুল করছে। আমার কবরের ওপর বাংলাদেশের সৃষ্টি হবে।’ আসলে শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতার জন্য সর্বাগ্রে জীবন দিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন।

পরের ঘটনা সবার জানা, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব বাংলায় গণহত্যা শুরু করে। গ্রেফতারের আগে ওই রাতে শেখ মুজিব আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন হিসাবে ঘোষণা করেন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহিদের তাজা রক্ত এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আসলে অসহযোগ আন্দোলনের ২৫ দিনেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। পাকিস্তানের ন্যাপ নেতা খান মোহাম্মদ ওয়ালী খান ১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকায় এসেছিলেন। পরে তিনি বলেন, শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলন গান্ধীর অসহযোগের চেয়েও বেশি সফল হয়েছে। শেখ মুজিবের অমর কীর্তি স্বাধীন বাংলাদেশ।

মোহাম্মদ শাহজাহান : মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক; সিনিয়র সাংবাদিক

[email protected]

 

Advertisement

বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম