ঈসা খাঁ : যে রাজা খালও কাটেন
মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নদীমাতৃক দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের জননন্দিত শাসকদের জনগণের প্রয়োজনে পুকুর খনন বা রাষ্ট্রের যোগাযোগ সহজ করার অথবা যুদ্ধের কৌশলগত দরকারে খাল খনন একটি প্রাচীন প্রথা। ইতিহাসের পাতায় এ ধরনের বহু উদাহরণ রয়েছে। ঈসা খাঁর জীবনে আমরা পুকুর খনন এবং খাল খনন উভয় বিষয়টিই লক্ষ করি। বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রশাসনে নৌবাহিনী বা নাওয়ারা ছিল তখনকার দিনের মূল সামরিক শক্তি। এমনকি ঘোড়সওয়ার বাহিনী, হস্তি বাহিনী, গোলন্দাজ বাহিনীও নির্ভর করত নৌ যোগাযোগের ওপর। একেক প্রয়োজনে একেক ধরনের নৌকা ব্যবহার করা হতো। এসবের বিবরণ দিতে গেলে অনেক বড় লেখা হয়ে যাবে। আমি এ ধারার কিছু বিবরণ তুলে ধরছি।
দিঘি খননে ঈসা খাঁর অংশগ্রহণ
ঈসা খান মসনদ-ই-আলা (১৫৩৭-১৫৯৯) তার পিতা সোলেমান খানকে শের শাহের (১৫৩৯-১৫৪৪) পুত্র ইসলাম শাহ কৌশলে হত্যা করে শাসনক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার সময় বালক ছিলেন। ৮/৯ বছরের বালক ঈসা খাঁ ও ইসমাইল খাঁ দুই ভাইকে সেসময় তুরানি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল বলে ‘আকবরনামা’ গ্রন্থের জিলদে ছুয়ামে বর্ণিত আছে। পরবর্তীকালে ঈসা খাঁর চাচা কুতুবুদ্দীন খাঁ কররানি শাসনামলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের প্রচুর পণমূল্য দিয়ে বিদেশ থেকে উদ্ধার করে এনে পিতার কর্মস্থল সরাইলে দায়িত্ব প্রদান করেন। সেসময় সরাইলের পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজের সঙ্গে তার বন্ধুসুলভ আচরণের কথা জানা যায়। ত্রিপুরা রাজের ইতিহাস রাজমালা গ্রন্থে দেখা যায়, ত্রিপুরার মহারাজ অমর মানিক্যের সময়কালে (১৫৭৭-১৫৮৬) একটি বিশাল আয়তনের দিঘি খনন করা হয়। ২০ হেক্টর জমির ওপর খনন করা এ দিঘিটি তার নামে নামকরণ হয় অমর দিঘি বা অমর সাগর। এ দিঘি খননের জন্য মহারাজ অমর মানিক্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরাইলের জমিদারখ্যাত নৌশক্তিতে বলিয়ান ঈসা খান সরাইল থেকে ৫০০ এবং অষ্টগ্রাম থেকে ৫০০ কোদালী দিয়ে সহায়তা করেন। তরফের জমিদার সৈয়দ মূসা এ আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় রাজা অমর মানিক্যের নির্দেশে তার নিয়োজিত নৌবাহিনীপ্রধান ঈসা খাঁ তরফ অভিযান করে সৈয়দ মূসা ও তার সমর্থক ফতে খাঁকে ১৫৮১ সালে সংঘটিত এক যুদ্ধে পরাজিত করে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে ফতেহ সৈয়দ মূসা, তার ছেলে আদম ও ফতে খাঁকে ত্রিপুরা রাজ মুক্তি দেন।
আকালিয়ার খাল খনন
ঈসা খাঁর সময় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি তখন কাজের বিনিময়ে খাদ্য ধারার একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে একটি খাল খনন করেন। আকালিয়ার খাল নামে এটি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উৎপন্ন এ খালটি ঈসা খানের কাটরাব দুর্গের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আবার মূল শীতলক্ষ্যায় মিলিত হয়। ১৯০৯ সালে দেওয়ানবাগ নামক স্থান থেকে ঈসা খাঁর নির্মিত কামানসহ ৭টি কামান উদ্ধার করার পর এর বিবরণ দিয়ে সে সময়ের ঢাকা শিক্ষা বিভাগের ইনস্পেকটর অব স্কুলস এইচ. ই. স্টেপলটন এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখেন। বাংলায় ঈসা খানের নাম সংবলিত সে কামান জাতীয় জাদুঘরে এখনো সংরক্ষিত আছে।
ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলার নামাঙ্কিত কামান
আর ঈসা খাঁর প্রপৌত্র দেওয়ান মনোয়ার খাঁর বাড়িখ্যাত মৌজা মনহরখানের সে বাড়ি ও জায়গা স্বৈরাচার সরকারের আমলে তাদের পুষ্ট লোকজন ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার অনুমতির ছুতায় দখল করে নেয়। তারা দেওয়ান মনোয়ার খাঁর কবরটি ও দুর্গের দমদমা (উঁচু ঢিবি) ধ্বংস করে দেয়। ঈসা খাঁ বংশের চতুর্থ অধস্তন দেওয়ান মনোয়ার খাঁর নামের স্মারক দেওয়ানবাগ নামটিও সুচতুরভাবে তারা হাইজ্যাক করে। ঈসা খাঁর কাটরাবু দুর্গখ্যাত এ প্রত্ন এলাকাটি সরকারি উদ্যোগে উদ্ধার ও ইতিহাসের স্বার্থে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি।
চাঁপাতলির ব্রিজ
ইতিহাসে এ খালটি আকালিয়ার খাল নামে পরিচিত, যা স্টেপলটনের লেখায় হয়ে গেছে আকাটিয়া খাল। হতে পারে কাটা খাল হওয়ার কারণে এরূপ নামকরণ যেটি প্রাচীনকালের দোহার নওয়াবগঞ্জ এলাকায় এবং কিশোরগঞ্জ এলাকায় এ ধরনের কাটা খালকে কাটাখালি ও কাটখাল নামে পরিচিত হতে দেখা যায়। আকালের সময় কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি ধারায় লোকদের সহায়তা করার মাধ্যমেই খালটি খনন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। যে কারণে এটি আকালিয়ার খাল নামে পরিচিতি পায়। সম্রাট আকবরের দরবারি লেখক আবুল ফজল যে ঈসা খাঁকে ‘মর্জুবানে ভাটি’ বা ভাটির রাজা বলে উল্লেখ করেন; সেই রাজা খালও কাটেন সেটি ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়। ঢাকা থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়ে মদনপুরের চৌরাস্তার একটু আগে যে সেতুটি পার হতে হয় সেটিই সেই আকালিয়ার খাল বলে মনে হয়। এ খালটির ওপর শায়েস্তা খানের সময়ের চট্টগ্রাম অভিযানের দ্বিতীয় সেনাপতি মনোয়ার খানের রাজস্ব সচিব লালা রাজমল একটি সেতু নির্মাণ করেছিলেন। সে সেতুটি এখনো অক্ষুণ্ন আছে। বাংলাদেশে এ ধারার খাল খনন বা প্রয়োজনে খাল কাটা ঈসা খাঁর সময় থেকে একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সারা দেশে খালসংশ্লিষ্ট এ ধারার নামগুলো দিয়েই আলাদা একটি প্রবন্ধ রচনা সম্ভব।
নৌকাবাইচ ও নাওয়ারা মহাল
ঈসা খাঁর সময় নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল নৌকা। সরকারি কাজে দ্রুত গতির নৌকা চালনায় পারদর্শী লোকদের তখন রাজকীয় বহরে নিয়োগ দেওয়া হতো। যুদ্ধের প্রয়োজনে নৌকা ও ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন নেভাল স্টাফ তথা মাঝি বাছাই করার জন্য নৌকাবাইচের আয়োজন করা হতো। ঈসা খাঁর নৌবাহিনী প্রধান তথা কারার পদবিধারী নৌপ্রধান সে আয়োজনটি করতেন। কিশোরগঞ্জের নিকলী এলাকায় তখন থেকেই নৌকাবাইচের প্রচলন হয়, যা একটি ঐতিহ্য হিসাবে এখনো জারি আছে। গোটা বাংলাদেশের মধ্যে এখনো সেরা সাঁতারুরা নিকলী থেকেই উঠে আসা। গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুন্সী আবদুর রহিমের লেখা দেওয়ান মছনদালীর পুঁথিতে ঈসা খানের নৌপ্রধান হিসাবে এ কারার পরিবারের কথা উল্লেখ আছে।
অন্যদিকে যুদ্ধের প্রয়োজনে তলব পাওয়া মাত্র নৌকা ও মাঝি সরবরাহ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে খাজনা সরবরাহের জোত-নিয়তকে বলে নাওয়ারা। এ নামে না হলেও খোদ লক্ষণ সেনের সময়ও আমরা দেখি নদীয়াতে মোহাম্মদ বখতিয়ারের আক্রমণ মোকাবিলা না করেই লক্ষণ সেন ১২০৪ সালে পালিয়ে বিক্রমপুরে এসে আশ্রয় নিয়েছিল এ ক্ষিপ্রগতির নৌবাহিনীর সহায়তায়। সেসময় থেকেই ঘোড়সওয়ার মুসলিম বাহিনী বাংলায় নৌযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়। সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইউয়াজ খলজিই (১২১৩-১২২৭) প্রথম নাওয়ারার পত্তন করে। বাংলার বারভূঁইয়ারা ঈসা খাঁর নেতৃত্বে এ নাওয়ারা তথা নৌবাহিনীর মাধ্যমে মোগলদের নানা যুদ্ধে নাস্তানাবুদ করে। এ কারণেই সম্রাট আকবরের দরবার থেকে বিশেষ করে আবুল ফজল লিখিত আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে ঈসা খাঁকে ‘মর্জুবানে ভাটি’ বা ভাটির রাজা বলে উল্লেখ করতে দেখা যায়। কিশোরগঞ্জের ভাটি এলাকায় দশকোষা ও নয়কোষা নাওয়ারা মহাল জমিদারি উচ্ছেদ হওয়ার আগ পর্যন্ত জারি ছিল। বাংলার এ নৌশক্তি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এক সময় উচ্ছেদ করার আশঙ্কায় ইংরেজ বড়লাট লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসয়ের প্ররোচনায় ১৭৭২ সালে ইংরেজ কোম্পানির সার্কিট কমিটি নাওয়ারা মহালের ব্যয় হ্রাস করার উদ্যোগ নেয়। তার ইতঃপূর্ব থেকে চলে আসা নাওয়ারা মহালের বাজেট সাত লাখ টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা বরাদ্দ করে। সেসময় থেকেই রাজকীয় নাওয়ারা হ্রাস হতে শুরু করে।
প্রতিটি দুর্গই নদী-খাল বা আড়াবেষ্টিত
ঈসা খাঁর প্রতিটি দুর্গের পাশ দিয়েই কোনো-না-কোনো নদী প্রবাহিত। দুর্গ প্রাকারের বাইরে পরিখা বা আড়া ও এক ধরনের কৃত্রিম খাল বা জলাশয় প্রতিটি দুর্গেই লক্ষ করা যায়। এগারোসিন্ধুর দুর্গের পাশ দিয়ে পুরোনো ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও এগারোটি খাল বা নদী থাকার কথাও বলা হয়ে থাকে। যে কারণে এলাকাটির নাম এগারোসিন্ধু বা এগারোটি নদী। টোক, টোকচাঁদপুর, এগারোসিন্ধুর ব্রহ্মপুত্র, বানার ইত্যাদি নদীসংশ্লিষ্ট। কাটরাব দুর্গের পাশ দিয়ে আকালিয়ার খাল। হাজিগঞ্জ দুর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ উভয়টিই নদী তীরবর্তী। ঢাকার লালবাগ কেল্লা যেটি ঈসা খাঁর সময় প্রথম অস্থায়ী কেল্লা ছিল এটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী। জঙ্গলবাড়ী দুর্গের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাওনার খাল (যা বর্তমানে নরসুন্দা নামে পরিচিত)। জঙ্গলবাড়ী দুর্গের আড়া এখনো বিদ্যমান। হাজীগঞ্জের দুর্গের এবং সোনাকান্দা দুর্গের পাশ দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী প্রবাহিত। এভাবে দেখা যায় ঈসা খানের দুর্গ এবং আবাসবাটী সবই নদী ও আড়া দিয়ে বেষ্টিত।
নৌকা ব্যবহারের রকমফের
ঈসা খাঁর সময় নৌবাহিনীতে যেসব নৌকা ব্যবহার করা হতো তার বিস্তারিত বিবরণ ঈসা খান-পরবর্তী তার ছেলে মূসা খান মসনদ-ই-আলার সময়কালের ইতিহাস গ্রন্থ ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বি’তে লেখা আছে। কামান বহনকারী নৌকাকে বলা হতো ঘুরাব বা ঘ্রাব। যুদ্ধের প্রয়োজনে এবং স্বাভাবিক ব্যবহারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হতো কোষা নৌকা, হাতি বহনকারী নৌকাকে বলা হতো মান্দকোশা নৌকা, খুব দ্রুত চলাচলের জন্য ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন নৌকাকে বলা হতো ছিপখান। আবার স্থানীয়ভাবে দৌড়ের নাও নামক নৌকা ব্যাপক হারে সারা দেশেই দেখা যায়। এগুলো আগে সরকারি কাজে ব্যবহৃত হতো। রাজা বাদশাহদের দীর্ঘসময় ধরে পানিতে ভাসমান থাকার জন্য ব্যবহার করা হতো সাজানো বজরা, ময়ূরপঙ্খি নাও ইত্যাদি। মাল পরিবহণের জন্য ব্যবহৃত হতো পাতাম নৌকা। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নৌকার বাজার বসত। মাগুরার নাওহাটা, ঠাঁটারী এক ধরনের নৌকায় নৌপথে ও নৌযুদ্ধে যুদ্ধকালীন কামানের গোলা নিক্ষেপ ও কামানের আঘাত মোকাবিলার ব্যবস্থা থাকত। সে ব্যবস্থাকে বলা হতো ঠাঁটারী।
১৯০৯ সালে ঢাকার অদূরবর্তী কাটরাব এলাকার দেওয়ানবাগ থেকে যে সাতটি কামান উদ্ধার করা হয় সেগুলো হলো ব্যাঘ্রমুখ কামান। বর্তমানে এগুলো ঢাকা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। উল্লেখ্য, বাঘকে শক্তির প্রতীক হিসাবে প্রথম ব্যবহার করেন ঈসা খান মসনদ-ই-আলা। তার ব্যাঘ্রমুখ কামান পরবর্তী সময়ে বাঘের আকৃতির ছাপযুক্ত বাংলাদেশের সামরিক পোশাক ও শক্তির প্রতীকে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ক্রিকেট তারকারা বাঘকে তাদের দলের প্রতীকরূপে ব্যবহার করে।
নদী জরিপ ও শুমারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নদীমাতৃক বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকে সাগর, হাওড়, বিল, ঝিল, নদ, নদী, খাল, ইত্যাদির যে ঐতিহ্য তা কালের প্রবাহে অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। নদ-নদী, খাল, পুকুর ইত্যাদি খনন করে এর ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা একটি জনবান্ধব সরকারের প্রধান কাজ। দেশে আজ পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত নদী ও জলাশয় শুমারি হয়নি। এ কাজটির গুরুত্ব দিয়ে প্রাচীন রেকর্ডপত্র ও সিএস খতিয়ানের সূত্র ধরে জরুরি ভিত্তিতে নদী জরিপ হওয়া দরকার।
মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম : ইতিহাসবেত্তা
