Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

এ উন্নত যুগেও কলেরা-ডায়রিয়া কেন হয়?

Advertisement

Icon

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এ উন্নত যুগেও কলেরা-ডায়রিয়া কেন হয়?

Advertisement

কলেরা-ডায়রিয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের পেটের অসুখ। একসময় এগুলো মহামারি আকারে ছড়াত এবং শহর-গ্রামের মানুষ দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। একসঙ্গে কয়েকটি গ্রামের মানুষ কলেরার সংক্রমণে উজাড় হয়ে যাওয়ার কথা এখন শুধু গল্প। দূষিত পানি পরিহার এবং ওরস্যালাইনের আবিষ্কারে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। সরাসরি হাওড়, পুকুর, নদীর পানি পান করা থেকে মানুষ সাবধান হয়েছে, তারপর এর প্রতি মানুষের ভীতি কমে গেছে।

কিন্তু কলেরা-ডায়রিয়ার সংক্রমণ থেমে যায়নি। এখনো বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এসব রোগে বহু মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে সারা বছর কোথাও না কোথাও ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা যায়। গরম শুরু হলে এর প্রকোপ শুরু হয় এবং বড় বড় শহরের দরিদ্র ও জনবহুল এলাকায় এর সংক্রমণ বেড়ে যায়। এ বছর মার্চের শুরু থেকে রাজধানী ঢাকায় এর প্রকোপ প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। এখনো তা অব্যাহত আছে।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে মহাখালীর আইসিডিডিআর,বির কলেরা হাসপাতালে রোগী ভর্তি শুরু হতে থাকে। সেখানে যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকার রোগী বেশি ছিলেন বলে জানা যায়। এসব রোগী শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা নিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি হন। নিয়ন্ত্রণহীন পাতলা পায়খানা, ঘন ঘন বমি, জ্বর, অবশ শরীর নিয়ে এসেছেন অনেকে। তাদের পরপর চারটি করে স্যালাইন দিতে হচ্ছে। ১৮ মার্চ থেকে প্রতিদিন ১ হাজারের বেশি ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হন। সাত দিনের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে ১৩০০ ছাড়িয়ে গেলে হাসপাতালে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় চিকিৎসা নিয়ে সংকট তৈরি হতে থাকে। এ অবস্থায় দুটি বড় তাঁবু টাঙিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু হয়।

গত ২০ মার্চ ছিল বিশ্ব পানি দিবস। সেদিন আইসিডিডিআর,বির কলেরা হাসপাতালে প্রতি ঘণ্টায় ৫০-৬০ জন রোগী মারাত্মক পানিশূন্যতা নিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি হন। সুজলা-সুফলা পানির দেশ বাংলাদেশ, বন্যার সময় দেশটির সিংহভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি উধাও হয়ে যায়। মিঠা পানির উৎস নদী, খাল, বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। গ্রামের মানুষ টিউবওয়েলের পানি পানে অভ্যস্ত হলেও শহরের মানুষ ওয়াসার পাইপে সরবরাহকৃত পানি পান করেন। ওয়াসার অতি পুরোনো পানির পাইপলাইনে ত্রুটি থাকায় সে পানিতে ময়লাসহ মারাত্মক দূষণ পাওয়া গেছে। অধুনা গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় পানি ফুটিয়ে পান করার প্রবণতা শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে কমে গেছে। বস্তিতে বসবাসরত মানুষ কোনোমতে সংগ্রহ করা পানি না ফুটিয়েই পান করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এটি ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে।

গরমকাল শুরু হলে আমাদের দেশের শহরগুলোয় মশা বেড়ে যায়। সারা দেশে কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড প্রভৃতি অসুখের প্রকোপ বাড়ে। আড়াই বছর ধরে করোনার কারণে মানুষের এসব অসুখের কথা কেউ ফোকাস করেনি। হয়তো করোনার ভয়ে এগুলোকে মানুষ পাত্তা দেয়নি। এছাড়া করোনার সময় মানুষ ঘরবন্দি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় বাইরের খাবার বেশি খায়নি।

এ বছর করোনার সংক্রমণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ঘরের বাইরে বের হয়ে পড়ে। খাদ্য ও পানীয় গ্রহণে অসতর্ক হয়ে যায়। বিশেষ করে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা আবারও খোলা খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা ভ্যানে খোলা দোকানের খাবার-আচার, আইসক্রিম, জুস, বেলের শরবত, চটপটি, আখের রস, ঝালমুড়ি প্রভৃতি খেতে খুব পছন্দ করে। শরবতের মধ্যে দূষিত পানি দ্বারা তৈরি বরফ ব্যবহার করা হয়। পুরোনো বোতলে ট্যাপের দূষিত পানি ভরিয়ে ফ্রিজে ঠান্ডা করে নকল লেবেল লাগিয়ে ফেরি করে বিক্রি করে একশ্রেণির অসাধু মানুষ। জীবিকার তাগিদে এটাই তাদের ব্যবসা।

নিম্ন আয়ের মানুষ রাস্তার পাশের খোলা দোকানের ভাত, বাসি-পচা খাবার, এলোভেরা ভেষজ পাতার নেলপা শরবত, লেবুর শরবত, বেলের শরবত প্রভৃতিতে অভ্যস্ত। সেসব দোকানে একই গ্লাস না ধুয়ে সবাইকে পরিবেশন করা হয়। অথবা ময়লা বালতির পানিতে একবার চুবিয়ে গ্লাস, থালাবাটি ধোয়া হয়। বাসস্টান্ডে, ফেরিঘাটে, অনেক জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টে পানির অভাবে একই পদ্ধতিতে গ্লাস, থালাবাটি ধোয়া হয়।

করোনার ভয় কমে যাওয়ার পর বিত্তবান পরিবারের মানুষ ভ্রমণে বের হয়ে আবারও দোকানের ফাস্টফুড খেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। রমজানের আগে সমুদ্রসৈকত, পর্যটনকেন্দ্র এবং শহরের দামি রেস্তোরাঁগুলোয় পার্সেল অর্ডার এবং সশরীরে গ্রাহকদের গণভিড় দেখে তাই মনে হয়। এগুলোয়ও ভাজাপোড়া খাবার বিক্রি হয় বেশি, যা অস্বাস্থ্যকর। বর্তমানে রমজানে বাসার বাইরে বিভিন্ন স্থানে ইফতার পার্টি চলছে। অনেক ক্ষেত্রে ইফতারের ভাজাপোড়া খাবার ও পানিও ডায়রিয়া সংক্রমণের কারণ হতে পারে।

বস্তুত হঠাৎ বাইরের খাবারের প্রতি আকর্ষণ ও নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ায় ডায়রিয়া-কলেরার মতো পেটের পীড়া বেড়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এছাড়া শহরের দরিদ্র এলাকাগুলোয় সুপেয় পানি সরবরাহে ঘাটতি থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে দূষিত পানি ব্যবহার করছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমে গছে। পথের পাশে কমমূল্যে পাওয়া যায় এমন খাদ্য তারা গ্রহণ করছে। ফলে বহুদিন ধরে নোংরা ড্রামে রক্ষিত পানি ও নিম্নমানের ভাজাপোড়া, পচা, বাসি খাবার খেয়ে তারা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। অনেক মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও বিশুদ্ধ পানি, সুখাদ্য, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আইসিডিডিআর,বির কলেরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডায়রিয়ার রোগীদের মধ্যে রিকশাচালক, শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের ক্ষুদ্র পেশার মানুষের পাশাপাশি সচ্ছল কিন্তু অসচেতন পরিবারের স্কুলগামী অবাধ্য বা অবুঝ শিশুদেরও দেখা গেছে।

এটা ঠিক, সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে পথের খাবার গ্রহণ থেকে বিরত রাখা বেশ কঠিন কাজ। তবে খাবারের ভাসমান দোকানগুলোকে বিকল্প ব্যবস্থায় সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। নতুবা মানসম্মত খাবার বিক্রি না করার জন্য জরিমানা করে তাদের সজাগ করে দিতে হবে। তাদের বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি বিক্রি বা সরবরাহ করতে বাধ্য করতে হবে। হজের সময় যেভাবে আরবসমাজের বিত্তশালীরা পানি ও জুসের বোতল বিনামূল্যে সরবরাহ করেন, আমাদের সমাজের ধনীরা সেভাবে বস্তিবাসী ও পথমানুষের পেটের অসুখ ঠেকানোর জন্য সুপেয় পানি, স্যালাইন প্যাক, জুসের বোতল প্রভৃতি সরবরাহ করার উদ্যোগ নিতে পারেন। বিশেষ করে রমজান মাসে এ কাজটি করতে পারলে সাধারণ মানুষের অতি উপকার হবে এবং কলেরা-ডায়রিয়ার সংক্রমণ ঠেকানো সহজ হবে। তা না হলে এত উন্নত যুগে বাস করেও আমাদের দেশে বারবার কলেরা-ডায়রিয়ার প্রকোপ খাদ্যনিরাপত্তার সূচক নিম্নগামী হওয়ার একটি কারণ হিসাবে বিবেচিত হবে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

[email protected]

Advertisement

ডায়রিয়া

Advertisement

আরও পড়ুন

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

শহরমুখী জনস্রোত থামানোর নতুন রূপরেখা

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কেমন প্রতিরক্ষানীতি চাই

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম