আমাদের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের গুরুত্ব
Advertisement
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) খাতের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৭ জুনকে ‘আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করে। প্রতিবছর এ দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে উদ্যাপন করা হয়। বাংলাদেশের এসএমই খাত উন্নয়নের শীর্ষ সংগঠন হিসাবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন (এসএমই ফাউন্ডেশন) মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহায়তায় প্রতিবছর এ দিবস উদ্যাপন হয়ে থাকে। প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় ২৭ জুন ২০২২ তারিখেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এসএমই ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস ২০২২’ উদ্যাপন করা হচ্ছে। ‘আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস’-এর কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্ব না থাকলেও এ দিবসের অর্থনৈতিক তাৎপর্য অনেক। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও টেকসই শিল্পায়নের জন্য ‘আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান (এমএসএমই) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। স্বল্প পুঁজিতে, স্বল্প সময়ে অধিকসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের অনন্য প্রতিষ্ঠান হলো এমএসএমই।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ৩৭.০৭ শতাংশ, যেখানে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৮ শতাংশ। অধিক জনসংখ্যা এবং সীমিত সম্পদের দেশ হিসাবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এমএসএমই একটি শ্রমনিবিড় ও স্বল্প পুঁজিনির্ভর খাত। উৎপাদন সময়কাল স্বল্প হওয়ায় জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এমএসএমই অবদান অনেক। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও এমএসএমই খাতের বিকাশ ও উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বস্তুত বাংলাদেশকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে এসএমই অনুঘটকের ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশে কুটিরশিল্পসহ প্রায় ৭৮ লাখ মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এমএসএমই) শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ খাত দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ৭০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে। এসএমই খাতে প্রায় ২.১ কোটি জনবল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মরত আছে। এ খাতের বিকাশের মাধ্যমে ত্বরান্বিত হবে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের মাধ্যমে উন্নত বাংলাদেশ গঠন।
দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সুরক্ষার মাধ্যমে সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬-এ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে শিল্প উন্নয়নের প্রধান মাধ্যম হিসাবে ঘোষণা করেছে। দেশের ও বৈশ্বিক বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা দলিল যেমন: জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ২০২৬ সাল নাগাদ সফলভাবে এলডিসি উত্তরণ, এসডিজি ২০৩১ এবং রূপকল্প ২০৪১-এ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে এসএমই খাতের উন্নয়ন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সরকার এ খাতকে গতিশীল করার জন্য বিভিন্ন সময়ে সাযুজ্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করেছে। বর্তমান এসএমই খাতকে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে এসএমই নীতিমালা-২০১৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬ সংশোধনপূর্বক আরও এসএমইবান্ধব করার লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় শিল্পনীতি-২০২২ প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এসএমই নীতিমালা-২০১৯-এ এসএমই সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিবিধান এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজীকরণের মাধ্যমে এসএমই খাতে সবার জন্য সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক গৃহীতব্য কর্মকৌশলগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন রূপকল্পগুলো বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে ২০২৪-এর মধ্যে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান বিদ্যমান ৩২ শতাংশে উন্নীতকরণ এসএমই নীতিমালা ২০১৯-এর মূল লক্ষ্য।
করোনা পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দ্বিতীয় দফায় ১৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় এসএমই ফাউন্ডেশনের ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তাদের অনুকূলে ইতোমধ্যে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এসএমই খাতের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে, যাতে এসএমইরা সহজে ঋণ পেতে পারেন, সে লক্ষ্যে গাইডলাইন প্রস্তুতপূর্বক বিতরণ করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক গঠিত জেলা এসএমই ঋণ বিতরণ মনিটরিং কমিটির নিয়মিতভাবে সভা আয়োজনে সহযোগিতা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এসএমইদের আইসিটির অধিকতর ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য অনলাইন প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে এসএমই পণ্যের বাজার সংযোগ ও সম্প্রসারণ এবং চলমান রাখার লক্ষ্যে জাতীয় এসএমই মেলা, তিনটি আঞ্চলিক এসএমই পণ্য মেলা এবং হেরিটেজ হ্যান্ডলুম ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এসএমই ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ২০ জন সম্ভাবনাময় এসএমই উদ্যোক্তাকে নেপালের ‘নেপাল চেম্বার এক্সপো’তে পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া টিএফও কানাডা-এর অর্থায়নে এসএমই ফাউন্ডেশনের সার্বিক সহযোগিতায় ১৪ জন সফল নারী উদ্যোক্তাকে ‘নিউইয়র্কে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড শো’তে অংশগ্রহণের জন্য বাছাই করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ফাউন্ডেশনের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসাবে ১৫০টি দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন করা হয়েছে। জুন ২০২১-এ প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দর্শন’ শীর্ষক ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এসএমই ডেভেলপমেন্ট একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হিসাবে গণ্য হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এমএসএমই খাতের উন্নয়ন বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে এসডিজি-২০৩০ ও ভিশন ২০৪১-এর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কারণ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও টেকসই শিল্পায়নের মূল চাবিকাঠি এমএসএমই খাত। একমাত্র এমএসএমই খাতের উন্নয়ন হলেই কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্যবিমোচন সম্ভব। তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য জনগণকে সচেতন করতে হবে। ‘আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস-২০২২’ উদযাপনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা উন্নয়নে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ : উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (সাবেক অতিরিক্ত সচিব), এসএমই ফাউন্ডেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়
