Logo
Logo
×

Advertisement

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

Advertisement

Icon

শিবলী আজাদ

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

Advertisement

রাজনীতির ভাষা আর রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা পরস্পর সম্পর্কিত। পরেরটি প্রথমোক্তের প্রতিফলন, প্রত্যক্ষ ফল। অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমানকালে উভয় ভাষার মানগত অবনমন ঘটেছে। জনসেবার স্পিরিটি আর পলিটিক্যাল রেটোরিক, দুই অর্থেই কথাটি সত্যি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পাবলিক গুড কিংবা ফিলানথ্রোপির স্থান আর নেই। রাজনীতি মানেই এখন হরিলুট, ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণ ও পাচারের প্রতিযোগিতা। বচনগত মানের অর্থেও কথাটি শতভাগ বাস্তবতা। রাজনীতিকদের মুখের ভাষা আজ রুচির দুর্ভিক্ষের সাক্ষী। বস্তির খিস্তিখেউড়ের লেভেলে নেমেছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মুখের ভাষা। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্ভ্রম, সৌহার্দ দূরীভূত হয়েছে অনেক আগেই। জিঘাংসাই আজ সম্পর্কের ভিত্তি। এর প্রভাব পড়েছে মুখের বচনে। মিডিয়ার ভাষা ও পাবলিক ডিস্কোর্সে। নেতা থেকে কর্মী, প্রত্যেকের ভাষা আজ আক্রোশপূর্ণ, খিস্তিসর্বস্ব। শুধু বাংলাদেশেরই নয়, রাজনীতির রেটোরিকের অবনমন ঘটেছে বিশ্বব্যাপী। ইউরোপ-আমেরিকাও বাদ যায়নি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্য খুবই নাজুক। রাজনীতির ময়দানে ভাষার এ অবনমন নতুন বিষয় নয়। হঠাৎ করেই ঘটেনি এ অবনমন। এর পেছনে ঐতিহাসিক-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান। সেটিও আবার ঘটেছেও ধীরে ধীরে, বিবর্তনের সূত্র মেনে। পেছনের কার্যকারণ অনুসন্ধান ছাড়া অবনমনের প্রকৃতি ও ব্যাপ্তির অনুধাবন অসম্ভব। এর হাত থেকে পরিত্রাণ খোঁজার প্রচেষ্টাও বিফল হতে বাধ্য।

ভাষাগত অবনমনের কার্যকারণ অনুসন্ধান করেছেন অনেকেই। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিদ্যার পণ্ডিতকুল নিজের মতো বিশ্লেষণ করেছেন। বাদ যাননি সৃষ্টিশীল লেখক-প্রাবন্ধিকও। প্রাবন্ধিকের মাঝে প্রথমেই স্মরণে আসবে জর্জ অরওয়েলের নাম। ভাষার মান ও অবনমনসংক্রান্ত অন্তর্ভেদী পর্যবেক্ষণ অরওয়েলের মতো আর কেউ করেননি। পলিটিক্স অ্যান্ড দি ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ (১৯৪৬) শীর্ষক দীর্ঘ লেখায় ভাষার অবনমনের পেছনে অরওয়েল মতাদর্শিক অভিসন্ধি লক্ষ করেছেন। অরওয়েল লক্ষ করেছেন তার সমকালের সারস্বত সমাজের ভাষা দিনদিন দুর্বোধ্য ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। হ্যারল্ড লাস্কির মতো সমকালের একাধিক প্রণিধানযোগ্য চিন্তকের লেখা থেকে উদ্ধৃত করে অরওয়েল তার বক্তব্য খোলাসা করেন। ভাষাগত মতিচ্ছন্নতার কারণ উল্লিখিত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক অবস্থান, লিখেছেন অরওয়েল। আর সংবাদপত্র, অরওয়েলের ভাষায়, ছিল ভাষাগত সে অস্বচ্ছতার বাহন। মুখস্থবিদ্যাসর্বস্ব কেতাবি ও কট্টর বামপন্থি মতাদর্শিক চিন্তার প্রাদুর্ভাবে ভাষার স্বেচ্ছাকৃত এ অস্বচ্ছতার প্রতি নির্দেশ করে অরওয়েল যুক্তি দেন যে, চিন্তার দারিদ্র্য আর ভাষার দুর্ভিক্ষ হাত ধরাধরি করে চলে। সত্য লুকোনোর প্রচেষ্টা থেকে আচরণটির উৎপত্তি। বক্তা যখন নিজের মনের কথাটি লুকাতে চান, তখনই ধোঁয়াশাপূর্ণ ভাষার আশ্রয় নেন।

বাংলাদেশের ভাষাগত পরিস্থিতি অবশ্য অতটা অরওয়েলিয়ান নয়, যদিও ক্ষুদ্র কিছু মহলের ক্ষেত্রে অরওয়েলের কথাটি প্রযোজ্য। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আক্ষরিক অর্থেই দুর্বিষহ-রীতিমতো ফ্যাসিবাদী। বস্তুত, বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানের ভাষাকে ফ্যাসিবাদ মানসিকতাসম্পন্ন ভিন্ন অন্য কোনো অভিধায় আখ্যান দুরূহ নয়, অসম্ভব। বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা শতভাগ ফ্যাসিবাদী। বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী রাজনীতিই ফ্যাসিবাদী ভাষার জন্ম দিয়েছে। তা থেকেই এসেছে রাজনৈতিক সমালোচনার ফ্যাসিবাদী ভাষা। সোজা কথায়, বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা ও রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর উপরিতল মাত্র। সমাজকাঠামোর বেইজ স্ট্রাকচার বা অন্তর্গত গড়নের বাহ্যিক প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশি সমাজকাঠামোর চলিষ্ণু ভাঙাগড়ার ফাটল থেকে উঁকি দেওয়া এ ভাষা সামাজিক বিকাশের বিশেষ এক কালপর্বের লক্ষণ। ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আমাদের অনুধাবন করা জরুরি।

দুই.

বাংলাদেশ মূলত, কৃষিভিত্তিক দেশ। গড়নে বাংলাদেশের সমাজ কাঠমো আজও সামন্ততান্ত্রিক। পুরো মাত্রায় ভূমিসংস্কার এদেশে কখনো হয়নি।

বর্গাদারি চাষপ্রথা এখনো কৃষি ব্যবস্থার ডমিন্যান্ট ফর্ম। জমির মূল মালিকানা আজও এবসেন্টি ল্যান্ডলর্ড বা নগরে বসবাসকারী অনুপস্থিত মালিকের হাতে। নগরবাসী ও বেতনভোগী জমির মালিকের চেতনায় কৃষিজ উৎপাদন অতিরিক্ত আয়ের উপায় মাত্র, আয়ের মূল উৎস নয়। কৃষিতে বিনিয়োগের সচেতন কোনো প্রয়াস মালিকের চৈতন্যে তাই আজও অনুপস্থিত। ফলে, পুঁজির ব্যাপক অনুপ্রবেশ কৃষি খাতে এখনো ঘটেনি। সামান্য পুঁজির যে অনুপ্রবেশ আমরা লক্ষ করি, মূলত প্রবাসী শ্রমিকের আয়। বাংলাদেশের কৃষিতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ অনুপ্রবেশ এখনো সুদূরপরাহত। কৃষি উৎপাদনের প্রক্রিয়া ও উপায়গুলো সে কারণে আজও মান্ধাতার আমলের। হালের বলদ, লাঙল ও কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। যান্ত্রিক চাষাবাদ সামান্য মাত্রায় শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু এর ব্যাপ্তি এখনো সীমিত। জমির মালিক ও বর্গাদার চাষির সামাজিক সম্পর্কে প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কের রেশ এখনো দৃশ্যমান। পূর্বতন সম্পর্কের উচ্ছিষ্ট এখনো বিরাজমান।

ওদিকে, গ্রামীণ জনসংখ্যার বিপুল অংশ আক্ষরিক অর্থেই নিরক্ষর কিংবা অর্ধ-শিক্ষিত। ন্যূনতম কারিগরি দক্ষতা কারও নেই। সাধারণ শিক্ষার মানও আবার নিতান্ত নাজুক। কিছু করে খাওয়ার মতো নয়। আর মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা তো পরজীবী ছাড়া কিছুই তৈরি করেনি। ফি বছর জনগোষ্ঠীর বিপুল এক অংশ হাজির হয় নগরে। জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। বিগত পঞ্চাশ বছর ঢাকা ও অন্য শহরগুলো উপচে পড়েছে জীবিকা সন্ধানী এ মানুষের চাপে। সাতচল্লিশ-উত্তর কালপর্বেই এ ধারার শুরু। আজও থামেনি মানুষের ঢল। গ্রামীণ অর্থনীতির অবিকাশ এবং জীবিকার অপ্রতুলতাই মানুষের নগরমুখী এ ঢলের কারণ। অদক্ষ ও অর্ধশিক্ষিত বিপুল এ জনগোষ্ঠীর একাংশ যারা পেরেছে, দালালের হাত ধরে গিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যদেশে। বাকিরা থিতু হয়েছে নগরে। নগরগুলোর জনমিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে তাল মেলাতে পারেনি প্রশাসন। ভেঙে পড়েছে অবকাঠামো। আর নাগরিক সুযোগ সুবিধে। শহরগুলো পরিণত হয়েছে অপরিকল্পিত বৃহৎ বস্তিতে।

ব্রিটিশ যুগ আর পাকিস্তানের প্রথম পর্বেও এ পরিস্থিতি ছিল না। নগরগুলো আকারে ছিল সীমিত। অতি ছোট ও ছিমছাম, গোছানো। নাগরিক পরিবেশের প্রভাব ছিল সর্বত্র। উঠতি মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি ছিল হাই ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধের আদলে গড়া। শ্রম ও রুচির ছিল মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিতে প্রাধান্য। যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে শ্রম ও সাধনার সংযোগে সামাজিক উত্তরণ সম্ভব, ছিল সামাজিক বিশ্বাসের অঙ্গ। মিথ্যা ছিল না কথাটি। বাস্তবতাও ছিল তাই। মেরিটোক্রেসি বা মেধাতন্ত্রের জয়জয়কার তখন। শিক্ষাবর্ষের শেষান্তে সরকারি চাকরি প্রাপ্তি ছিল প্রায় নিশ্চিত। সমাজজুড়ে ছিল নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশ। সবার চোখে সুদিনের স্বপ্ন। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও আইনি শাসন স্বপ্নকে চাঙা রেখেছে। ব্রিটিশ যুগে বেড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও সামজিক নেতৃত্বও একই মূল্যবোধ ধারণ করায় রাজনীতির পরিবেশও ছিল পরিচ্ছন্ন। বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা দাবি করে।

পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান যুগের মূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল মূলত, অভিজাত পরিবারের হাতে। চরিত্রে সামন্তবাদী হলেও অভিজাত পরিবারের সন্তানেরা ছিল উচ্চশিক্ষিত। নাগরিক সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ ও রুচিমান। রাজনৈতিক বলয়ে হঠকারিতা সত্ত্বেও সামজিক আচরণে বিদগ্ধ। ঢাকা, শায়েস্তাবাদ, ধনবাড়ী, দেলদুয়ার ও বগুড়ার নবাব পরিবারের রাজনীতিকরা কিংবা আবুল হাশিম বা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান। কথা ও আচরণে অভিজাত রুচির প্রতিফলন ছিল তাদের সবার। ক্ষমতার লিপ্সা ছিল এদের অনেকের সত্যি। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বও ছিল প্রায় সবার। কিন্তু আর্থিক দুর্নীতির প্রবণতা মুক্ত ছিলেন এককথায় সবাই। অভিজাত ও ধনাঢ্য ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে বৈষয়িক লিপ্সা মুক্ত ছিলেন প্রত্যেকে। রাজনীতি সম্পদের পাহাড় গড়ার হাতিয়ার ছিল না এদের কারোর। মফস্বল কিংবা গ্রামীণ পরিবেশ থেকে আগত নিুবিত্ত শ্রেণির রাজনীতিকদের দলও ছিল অনুরূপ সংস্কৃতির ধারক। শিক্ষা, মূল্যবোধ ও রুচির কারনে সামাজিক আচরণ ও রাজনৈতিক জীবনে ভদ্রতার সীমা মেনে চলতেন কমবেশি সবাই। শামসুল হক, শাহেদ আলী, নুরুল আমীন, আবুল মনসুর আহমদ, তমিজউদ্দীন আহমদ, মোনায়েম খান কিংবা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনীতিতে ছিল যোজন যোজন দূরত্ব ও মতাদর্শিক ফারাক। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন না কেউ।

শেখ মুজিবর রহমানই ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম। প্রতিভাবান সাংগঠনিকের দক্ষতা দেখিয়েছিলেন শেখ মুজিব। নজরও কেড়েছিলেন প্রবীণ নেতৃত্বের। প্রথমে মওলানা ভাসানীর, পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। দ্রুত উঠেও এসেছিলেন শীর্ষ নেতৃত্বে। এতৎসত্ত্বেও কথা ও আচরণে আভিজাত্য বা ভদ্রতার ছিটেফোঁটা ছিল না মুজিবের। দুর্বিনীত ও উদ্ধত চরিত্রের কারণে পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই দুর্নাম কুড়িয়েছিলেন। পেশিশক্তি ও দুর্নীতির মিশ্রণ ঘটেছিল শেখ মুজিবের চরিত্রে এবং তা আরও অনেক আগেই, কলকাতায়। বেকার হোস্টেলে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল বরাবরই বিতর্কিত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অন্যতম কারিগর মিনা পেশোয়ারীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন শেখ মুজিব। পেশিশক্তি প্রয়োগের প্রবণতা মজ্জাগত রোগে পরিণত হয় মুজিবের। প্রবণতাটি কখনো কাটেনি। আওয়ামী মুসলীম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের অপসারণের পেছনে মুজিবের কূটচাল তার সাক্ষী। সাক্ষী পূর্ব পাকিস্তান সংসদের তৎকালীন স্পিকার শাহেদ আলীর ওপর অধিবেশন চলাকালে সংসদ-সদস্য শেখ মুজিবের শারীরিক আক্রমণে। উল্লেখ্য, আক্রমণের প্রত্যক্ষ কারণে শাহেদ আলীর মৃত্যু ঘটে। ঘটনার সময় সংসদে উপস্থিত কমিউনিস্ট পার্টির সংসদ-সদস্য আসহাব উদ্দীনের স্মৃতিকথায় শেখ মুজিবের নারকীয় আচরণের বিবরণ পাওয়া যায়। বিরোধী মতের ওপর শেখ মুজিবের আক্রমণ ও সহিংসতার উদাহরণ অন্যত্রও মেলে। কমিউনিস্ট নেতা অজয় রায় মুকুল সিনেমা হলে ভাসানী ন্যাপের জন্মকালে মিটিংয়ের ওপর শেখ মুজিবের নেতৃত্বে হামলার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

চরিত্রে শেখ মুজিব ছিলেন ইংরেজিতে যাকে বলে ডগ হুইসলার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মৌখিক ও শারীরিক আক্রমণের উসকানিদাতা। বস্তুত, শেখ মুজিবুর রহমানই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে সহিংসতার আমদানি করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের আর্থিক দুর্নীতি ও লুটপাটের কালচারও শেখ মুজিবের হাতে শুরু। ষাটের দশকেই পাকিস্তান দুর্নীতি দমন ব্যুরো শেখ মুজিবের আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করে। মন্ত্রী থাকা কালে মুজিবের বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ ছিল। প্রাথমিক তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য মেলায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করেন। সোহরাওয়ার্দীর জীবদ্দশায় আওয়ামী লীগ আর পুনর্জীবিত হয়নি। তার মৃত্যুর পর শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ পুনর্জীবিত করেন। বদরুদ্দীন উমরের অনেক লেখা ও সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবের আর্থিক দুর্নীতির প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে।

ষাটের দশকে জীবিকার সন্ধানে বাঁধভাঙা ঢলের মতো গ্রামীণ জনপদ থেকে যে অদক্ষ জনগোষ্ঠী নগরে ধেয়ে আসে, তাদের নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। শিক্ষা ও রুচির অভাব ছিল এদের মাঝে প্রকট। নাগরিক জীবনের জাঁতাকলে ফেলে আসা গ্রামীণ জনপদের মানবিক সংস্কৃতির শেষ উপকরণটুকুও নিঃশেষিত হয় এদের দ্রুত। আক্ষরিক অর্থেই তিরোহিত হয় সব ধরনের ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ বোধ। সংস্কৃতির নিরিখে লুম্পন শ্রেণিতে পরিণত হয় ছিন্নমূল ও উদ্বাস্তু এ জনগোষ্ঠী। বুভুক্ষু ও আশাহীন মানুষগুলোকে বঞ্চনা ও বৈষম্যের গল্প শোনানোর পাশাপাশি সোনার বাংলার অতিরঞ্জিত কাহিনির বয়ান তৈরি করে নিজ সমর্থনের বেইস তৈরি করেন শেখ মুজিব। রাজনীতির ময়দানে উত্থান ঘটে ডমিন্যান্ট লুম্পেন শ্রেণি ও লুম্পেন কালচারের। লুম্পেন শ্রেণির ভাষা হয়ে ওঠে রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা।

একাত্তরের পর, লুম্পেন এ জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশ লুটেরা সংস্কৃতির ধারকে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে লুটতরাজে অংশ নেয়। সাধারণ মানুষ ছাড়াও এদের হাতে আক্রান্ত হয় সংখ্যালঘু হিন্দু, আদিবাসী, বিহারি ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। নির্বিচারে চলে জমি-বাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য দখলের প্রতিযোগিতা। গুম-খুন-বলাৎকার তো অনুষঙ্গ হিসাবে ছিলই। সমর্থক লুটেরা এ শ্রেণির স্বার্থরক্ষাই হয়ে ওঠে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের একমাত্র রাজনীতি। বলাবাহুল্য, লুটেরা এ লুম্পেন শ্রেণির সংস্কৃতি ছিল অনভিজাত, কুরুচিকর ও অধস্তন শ্রেণির। এদের রাজনীতির ভাষা ছিল পেশিশক্তি ও ভায়োলেন্সনির্ভর। প্রতিপক্ষের প্রতি এদের বচন ছিল খিস্তিখেউড় সর্বস্ব। পুরো বাহাত্তর-পঁচাত্তর কালপর্বজুড়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে তাণ্ডব চালায় আওয়ামী লীগ নামধারী এ দস্যুর দল। দস্যুতাই ছিল এদের মূল প্রণোদনা। দস্যু সংস্কৃতিই ছিল এদের সাংস্কৃতিক মান। দল হিসাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মান কখনো এ লুম্পেন শ্রেণির কালচারের ঊর্ধ্বে ঊঠতে পারেনি।

তিন.

পঁচাত্তরের আগস্টের পর সাময়িকভাবে পশ্চাদপসরণ করলেও ফের সংগঠিত হয় আওয়ামী লীগ। আশির দশকের প্রারম্ভে পূর্ণ মাত্রায় সংগঠিত হয়ে মাঠে নামে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। ততদিনে অবশ্য ব্যাপক সামাজিক রূপান্তর ঘটেছে সমাজ কাঠামোর মর্মমূলে। রাজনীতির রাশ তখন আর জনসম্পৃক্ত ও মেধাবী রাজনীতিকদের হাতে নেই। রাজনীতি তখন কুক্ষিগত দুই পরিবারের মুষ্ঠিতে। রাজনীতি রূপান্তরিত হয়েছে প্যাট্রন-ক্লায়েন্টের সম্পর্কে। দুই রাজনৈতিক পরিবারের আবর্তে আবার জন্ম নিয়েছে ছোট বড় আরও অসংখ্য পরিবার। স্তরভিত্তিক এ বিন্যাসের সর্বোচ্চ ওপরে অবস্থান প্রধান দুই রাজনৈতিক পরিবারের। দুই পরিবারের উপগ্রহ সেকেন্ড ডিগ্রির পরিবারগুলো। লিগেসি রাজনীতির নামে প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট ও উত্তরাধিকারনির্ভর নতুন সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক বন্দোবস্তর শুরু এ কালপর্বে।

আর্থিক সংস্কারের দরুন আশির দশকে অর্থনীতির যে চাকা সচল হয়, তার বিকাশ ঘটে পরবর্তী দশকজুড়ে। গড়ে ওঠে ধনাঢ্য নতুন এক পুঁজিপতি শ্রেণি। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে মার্কেন্টাইল যুগে গড়ে ওঠা এই পুঁজিপতি শ্রেণিই রাজনীতির ময়দানে অভিজাত শ্রেণিকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। গড়ে তুলেছিল গণতন্ত্রের শক্ত ভিত। বাংলাদেশের ইতিহাস অবশ্য সে পথে হাঁটেনি। নবোত্থিত পুঁজিবাদী শ্রেণি চরিত্রে ছিল লুটেরা। সরকারি অনুগ্রহ প্রাপ্ত ক্লায়েন্ট। আরও সুস্পষ্টভাবে বললে, দুই পরিবারের আশীর্বাদপ্রাপ্ত ল্যাপডগ। দুই পরিবারের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে শিল্পায়ন ও এন্টারপ্রেনারশিপে এরা আগ্রহী হয়নি। উঠতি এ পুঁজিপতি শ্রেণি জড়িয়ে পড়ে লুট আর ঋণখেলাপি সংস্কৃতিতে। ঠিকাদারি, লাইসেন্স, পারমিট আর লুণ্ঠন হয়ে ওঠে বিত্ত আহরণের প্রধান অবলম্বন। কালোবাজারি, চোরাচালান, কর ও শুল্ক ফাঁকি, তহবিল তছরুপ, অর্থ আত্মসাৎ আর অর্থ পাচারের কালচার তো ছিলই। অনৈতিক ও অবৈধ আচরণ এবং লিগাল ভারনাবেলিটির কারণে বিপুল বিত্ত সত্ত্বেও পুঁজিপতি শ্রেণি পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বলয় ভাঙতে পারেনি। নব্য-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় দুই পরিবারের করুণানির্ভর পরগাছা শ্রেণি হয়েই তৃপ্ত থেকেছে।

রাজনীতির বৃত্তে স্বাধীন স্রোত হিসাবে পুঁজিপতি শ্রেণির ভূমিকা রাখার ব্যর্থতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আধা নাগরিক ও আধা সামন্ততান্ত্রিক মাফিয়াতন্ত্রের মিশ্রণ। গণতন্ত্রের নামে পারিবারিক স্বৈরশাসন। সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির বিপরীতে গড়ে উঠেছে জিঘাংসা ও হননের কালচার। হননের উপায় আর শুধু অস্ত্রই নয়, চরিত্রে কালিমা লেপন ও বাচিক আক্রমণও। জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরিত্রও গঠনে ফলে হয়েছে পিকুলিয়ার। পরিবারকেন্দ্রিক ও উত্তরাধিকারী রাজনীতির রাজনৈতিক বন্দোবস্ত সত্ত্বেও বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি নিজ যোগ্যতায় আস্থা রাখতে পারেনি। সক্ষমতার অভাবে সে লেজিটেমেসি খুঁজেছে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছে। আর ক্ষমতা-বিলাসের আর্থিক চাহিদা মেটাতে হাত পেতেছে লুটেরা পুঁজিপতির কাছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ফলে, অবিরত ঘুরপাক খেয়েছে গাড়লস্য এক অপসাংস্কৃতিক বলয়ে। চোস্ত-সাফ রুচি আর ছুরির ফলার মতো ধারলো বুদ্ধির কারোর পক্ষে এ দেশে রাজনীতির ময়দানে নিজ গুনে টিকে থাকা হয়েছে মুশকিল। গণতন্ত্রের নামে তৈরি কাল্ট কালচার। সাধারণ মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন ও আবেগি রাজনীতি গণতন্ত্রকে পরিণত করেছে মরীচিকায়।

কাল্ট কালচারের প্রত্যক্ষ্য আবির্ভাব নব্বই দশকের প্রারম্ভে। গণতান্ত্রিক শাসনের নাম ভাঙিয়ে দুই পরিবারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কালপর্বে। রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রতিষ্ঠার অভীষ্ট হারায় বাংলাদেশ এ সময়। রাজনীতি রূপান্তরিত হয় জিরো সাম গেমে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা সেই জিরো সাম গেমের ফল। বিগত পঁয়ত্রিশ বছর গণতন্ত্রের মুখোশে বাংলাদেশে মূলত, জারি ছিল কাল্ট কালচার। প্রতিপক্ষের ডিলেজিটেমাইজেশন ও দমন হয়ে ওঠে রাজনীতির মুখ্য লক্ষ্য। পারিবারিক শাসনের মুঠি শক্তকরণের লক্ষ্যে সব ধরনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিনাশ ঘটানো হয়। পলিসি ডিবেট নয়, তোষামোদ আর সাইকোফ্যান্সি দখল করে রাজনীতির ডিস্কোর্স। রাজনীতির ভাষার পাশাপাশি রাজনীতিবিদের মুখের ভাষাও হয়ে ওঠে কুরুচিকর ও অশ্লীল। দলপ্রধানের কাছে নিজের উপযোগিতা ধরে রাখার লক্ষ্যেই রাজনীতিকদের অধঃগমনের এ ইঁদুর দৌড়। রাজনীতিকদের দল ভালো করেই জানত, ক্ষমতার এক্সেসের সঙ্গেই তাদের সম্পদ আহরণ ও লুটের সক্ষমতা জড়িত। নেত্রীকে খুশি রাখার লক্ষ্যে সে কারণে মুখ খোলা। বচনে অশ্লীলতার বান ডাকা।

প্রতিপক্ষের প্রতি অশ্লীল ভাষা প্রয়োগে আক্ষরিক অর্থেই নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন শেখ হাসিনা। ঔচিত্যবোধের কোনো ধারণাই শেখ হাসিনা ধারণ করেননি। ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা প্রশাসনিক অবস্থানের নিরিখে কাকে কী বলা যায় বা বলা উচিত নয়, সাধারণ এ কাণ্ডজ্ঞান হাসিনার চরিত্রে ছিল না। শেখ হাসিনার মতো অশ্লীল ও ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলার মতো আর কোনো সরকারপ্রধান বাংলাদেশের ইতিহাসে আসেনি। প্রতিপক্ষকে উপহাস-পরিহাস-খিস্তি, বাপ-মা-জাত-বংশ তুলে গাল, দৈহিক গড়ন ও অঙ্গসৌষ্ঠব নিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিতে কথা একমাত্র শেখ হাসিনাই বলেছেন। মর্জিমাফিক যখন যাকে ধরেছেন, লাগাতর খিস্তি করেছেন। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, বিচারপতি অথবা পেশাজীবী কেউ বাদ যায়নি হাসিনার অশ্লীলতা থেকে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাবির সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কিংবা প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদসহ আরও অনেকে নিগৃহীত হয়েছেন হাসিনার হাতে। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি বিষোদ্গারের মাত্রা লক্ষ করে তো কূটনৈতিক মহল ও বিদেশি মিডিয়াও বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

বেগম খালেদা জিয়ার ওপর শেখ হাসিনার আক্রোশ কাণ্ডজ্ঞানের সব মাত্রা অতিক্রম করেছিল। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অফুরান ধারায় বর্ষিত হয়েছে শেখ হাসিনার কটুবাক্য ও অশ্লীল বাক্যবাণ। নিজের বয়স বা সামাজিক অবস্থান সত্ত্বেও সংযত হয়নি হাসিনার কদর্য মুখ। কপাল ভালো বলতে হবে, হাসিনার বিপরীতে বেগম খালেদা জিয়া কঠোরভাবে সংযত থেকেছেন। উত্তর দেননি, কাদা ছোড়াছুড়িতে নামেননি। খালেদার নীরবতায় তেলে-বেগুনে আরও জ্বলে ওঠেন হাসিনা। খিস্তিখেউড়ে দূষিত করেন আকাশ-বাতাস, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। চরিত্রের বিচারে হাসিনাকে বাপকা বেটি বলাটা অসংগত নয়। হাসিনা ছিলেন তার পিতার মতোই ডগ হুইসলার। হাসিনার অশ্লীল কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গি তার অনুসারী নেতা ও কর্মীও কায়মনোবাক্যে অনুসরণ করে। রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা হয়ে ওঠে কদর্য ও টক্সিক।

অধঃপতনের দৌড়ে অনুগত ও পোষ্য মিডিয়াও যোগ দিতে কার্পণ্য করেনি। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, এ দেশে কখনো স্বাধীন মিডিয়া গড়ে ওঠেনি। এ দেশের মিডিয়া মূলত, পুঁজিপতি শ্রেণির ক্ষমতা প্রয়োগের অস্ত্র। মালিক শ্রেণির লুণ্ঠিত সম্পদ পাহারার অতন্দ্র প্রহরী। প্রধান দুই রাজনৈতিক পরিবারের তল্পিবাহক। মিডিয়া হাউজগুলোও ফলে, দুই পরিবারের প্রক্সির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। খেউড় প্রতিযোগিতা, মিথ্যাচার, হলুদ সাংবাদিকতায় ভেসে যায় মিডিয়া। মিডিয়া হয়ে ওঠে অশ্লীল বচন ও কদর্য আচরণ প্রচারের প্ল্যাটফর্ম। সামাজিক জীবনে নরমালাইজেশন ঘটে খিস্তি সংস্কৃতির। এর ছাপ পড়েছে তরুণ প্রজন্মের মুখের বচন ও লেখার ভাষাতেও। সোশ্যাল মিডিয়া তার সাক্ষী। জেন-জি প্রজন্মের মুখের ভাষা শুনে তাই আঁতকে ওঠার কারণ নেই। জেন-জি প্রজন্ম সেটাই মিমিক করছে, যেটা দেখে ও শুনে সে বড় হয়েছে। যাকে সে স্বাভাবিক জ্ঞান করেছে। ইংরেজিতে একেই বলে, কার্মা ইস বিচ- দ্য রুস্টার হ্যাজ কাম হোম টু রুস্ট।

চার.

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা ও রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা কখনো সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ছিল না। বিদগ্ধ ও নাগরিক রুচির তো নয়ই। পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকের কথা অবশ্য ভিন্ন। পাকিস্তান আমলে দুটি কারণে আজকের তুলনায় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন ও উন্নততর। প্রথমত, রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত রুচির সামন্ত শ্রেণির প্রভাব। বনেদি পরিবারের হাতে ছিল তখন রাজনীতির রশি। রাজনীতির ভাষা ও রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষায় স্বভাবত, সুরুচিসম্পন্ন বনেদি সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষাতেও আদবকায়দার প্রভাব দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের মাত্রা ছিল সীমিত। আজকের মতো রাজনীতির ময়দানে উন্মত্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ক্রাউডের আবির্ভাব ঘটেনি। নেতৃত্ব কর্মীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করত, উলটোটি নয়। সে কারণে পঞ্চাশ-ষাটের দশকেও রাজনীতির ভাষা ছিল সুস্থ ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন। রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষাও ছিল পরিমিত ও মার্জিত।

মধ্য ষাট ও সত্তরের দশকে আওয়ামী লীগের হাতে ঘটে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন। গুন্ডামি হয়ে ওঠে প্রথমে, রাজনীতির অনুষঙ্গ, পরে রাজনীতির ভাষা। রাজনীতির ভাষা ও প্রতিপক্ষের সমালোচনার ধরনও হয়ে ওঠে সহিংস ও আক্রমণাত্মক। পলিটিক্যাল ট্যাগিং ছিল একালে অপরায়ন ও সমালোচনার ভাষা। যাকে তাকে যখন তখন ট্যাগ দেওয়া হয়। মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক, রাজাকার, আলবদর ডাকা হয়। প্রতিপক্ষের জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলার সহিংস হুমকিও শোনা যায়। রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষাও হয়ে ওঠে অপরিমেয় কর্কশ ও রূঢ়। আশির দশক অবধি আধিপত্য ছিল এ মাস্তানি কালচারের। মধ্য আশির দশক থেকে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ফের স্পষ্ট হতে থাকে। রাজনীতি কুক্ষিগত হয় পরিবারতন্ত্রের হাতে। কর্মী বাহিনীও হয়ে ওঠে চরিত্র ও আচরণে উন্মত্ত ও অনিয়ন্ত্রিত। মনস্তাত্ত্বিকভাবে নেতৃত্বও বন্দি হয় কর্মী ও সমর্থকের হাতে। কর্মী ও সমর্থকের মন জোগানো হয়ে দাঁড়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখার উপায়। একদিকে দলের মালিক-কর্তা, অন্যদিকে উগ্র ও অন্ধ কর্মী-সমর্থকের চাপ। স্যান্ডউইচ দশায় প্রভাব হারায় কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

ত্রিশের দশকের গোড়ায় প্রকাশিত দ্য রিভোল্ট অব দ্যা ম্যাসেস (১৯৩০) গ্রন্থে বিশ্ববিশ্রুত স্প্যানিশ দার্শনিক হোসে অর্তেগা গ্যাসেত স্যাটিসফায়েড বা আত্মতৃপ্ত ও কমন কালচার রুচির ধারক ‘ম্যাস-ম্যান’ (Mass Man)-এর উত্থানের কথা বলেছেন। গ্যাসেত কথিত এ ম্যাস-ম্যান বৈশিষ্ট্যে পপুলিস্ট ও নিু সাংস্কৃতিক রুচির ধারক। গ্যাসেতের ভাষ্যে স্পষ্ট যে, আত্মকেন্দ্রিকতা ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ‘ম্যাস-ম্যান’-এর অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে নব্বই দশক ছিল ম্যাস-ম্যান-এর উত্থান পর্বের কাল। উত্থানের প্রভাবজাত রাজনৈতিক কালচার সমাজে এখনো সক্রিয়। সনাতনী প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়াও এ প্রভাবে আক্রান্ত। প্রভাবের স্বাক্ষর মিডিয়া জগতে এখনো দীপ্যমান। রাজনীতির প্রকৃত গণতন্ত্রায়ণ ও প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিত তৈরি ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা ও রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষার আশু পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এককভাবে তা কেউ করতে পারবে না। প্রক্রিয়াটি সামাজিক বিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। ভুলে গেলে চলবে না, রাজনীতির ভাষা ও রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা মূলত, সমাজকাঠামো ও রাজনৈতিক কাঠামোর বাহ্যিক প্রতিফলন। কার্ল মার্ক্স একেই বলেছেন সামাজিক অবকাঠামোর উপরিতল।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম