Logo
Logo
×

Advertisement

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

Advertisement

Icon

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

Advertisement

প্রতিটি সমাজেই বুদ্ধিজীবীরা সমাজের গর্ব। বুদ্ধিজীবীরা যে আলোকবর্তিকা বহন করেন, চিন্তাচেতনায় অনুন্নত সমাজের অনগ্রসর গোষ্ঠীগুলো সেই আলোর পথ ধরেই সামনে এগিয়ে যায়। বুদ্ধিজীবীরা পথভ্রষ্ট হলে, আত্মবিকৃত হলে, আত্মসম্মানবোধে দরিদ্র হলে, আত্মপরিচয় বিস্মৃত হলে এবং সর্বোপরি হীনম্মন্যতাবোধে জর্জরিত হলে সমাজের জন্য নেমে আসে মহাবিপর্যয়। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা (সম্ভবত তাদের বিরাট অংশ) যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তাতে এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, আমরা সত্যসত্যই এক মহাবিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। ২ ফেব্রুয়ারি ভোরের কাগজে প্রকাশিত অভিমত কলামে মো. মইনুল ইসলাম রচিত ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ও কিছু প্রশ্ন’ শীর্ষক প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজের এক বিরাট অংশ ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক ধ্যানধারণায় আকীর্ণ হয়ে আছেন-এ প্রবন্ধটি তারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি লিখেছেন, ‘আদর্শের জন্য ত্যাগ এবং উচ্চ মানবিক অর্জনের জন্য যে সাধনা বাঙালি হিন্দু সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা করে, তারই ফসল দুই নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অমর্ত্য সেন।’ সংখ্যায় বেশি হয়েও আমরা বাঙালি মুসলমানরা, কেন একজন রবিঠাকুর বা অমর্ত্য সেন সৃষ্টি করতে পারলাম না। সে প্রশ্ন সাম্প্রদায়িক মুসলমানসহ আপামর বাঙালি মুসলমান সমাজের কাছে রইল। আমার ক্ষুদ্র ধারণায়, মুসলমানের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে তাদের সংকীর্ণ চিন্তা-চেতনা ও আদর্শবোধ। সাধারণভাবে বিরাট এবং মহত্বের অন্বেষা এবং বিশেষভাবে ত্যাগ আদর্শের প্রেরণা তাদের সংস্কৃতিতে প্রাধান্য পায়নি। পায়নি বলেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে রবিঠাকুর বা অমর্ত্য সেন সৃষ্টি হয়নি।’ তেমনই রাজনীতিতে জ্যোতি বসুরও সৃষ্টি হয়নি। কলমের এক আঁচড়ে এমন ধরনের গুরুগম্ভীর প্রশ্নের সমাধান বাতলে দেওয়ার সাহস চমক সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু সমস্যার গভীরে যেতে মোটেও সাহায্য করে না।

কয়েক কোটি জনসমষ্টিতে দুজনের নোবেল প্রাইজ অর্জন স্ফুলিঙ্গের মতো ক্ষণিক আলোর ঝলকানি সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু নিরন্তর আলোর প্রভা জাগাতে পারে না। ব্যাপক গণশিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে একটি আলোকিত সমাজের উদ্ভব, ‘কৃষি ও শিল্পে উৎপাদনের উৎকর্ষ অর্জন, জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত ব্যবহারে সমাজজীবনে গতিময়তার উদ্বোধনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে নিরন্তর আলোক সঞ্চারের চাবিকাঠি। পাশ্চাত্য শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী হওয়া সত্ত্বেও এসব ক্ষেত্রে বাঙালি-হিন্দু সমাজের সাফল্য কতটা উল্লেখযোগ্য? হ্যাঁ, বাংলাদেশের একজন বাঙালি মুসলমান বোদ্ধা যদি নোবেল প্রাইজ পেতেন, তাহলে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের পরিচয়টা অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠত। এ কারণে নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির যে একটা গুরুত্ব রয়েছে, তা অনস্বীকার্য। রবিঠাকুর, অমর্ত্য সেন ও জ্যোতি বসুরা যত না বাঙালি তারও চেয়ে অনেক বেশি ভারতীয়।

তাদের সাফল্য বাঙালি হিন্দুর সাফল্য হিসাবে বিচার না করে ভারতের সাফল্য হিসাবেই বিচার করা শ্রেয়। অমর্ত্য সেনতো ‘নিজেকে সমগ্র মর্তের সন্তান’ হিসাবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। তার এ অনুভূতির পেছনে যথার্থ কারণ রয়েছে। ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ডের মতো জ্ঞানদীপ্ত পরিবেশ না পেলে অমর্ত্য অমর্ত্য হতেন কি না, সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। তারই সমসাময়িক অধ্যাপক সুখময় চক্রবর্তী প্রতিভায় তার অতি কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও অমর্ত্যরে এক-দশমাংশ সাফল্যের দাবিদার হতে পারেননি। তার কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি তার কর্মজীবনের অধিকাংশই অতিবাহিত করেছেন ভারতে। ভারতে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিঃসন্দেহে পাশ্চাত্যের গ্রেট ব্রিটেন বা আমেরিকার সমতুল্য নয়। এ প্রসঙ্গে হয়তো রবিঠাকুরের কথা আসবে। সাহিত্যের মতো সৃজনশীল ক্ষেত্রে প্রতিভাগুণে যে সাফল্য অর্জন করা যায়, অর্থনীতির মতো বিজ্ঞানধর্মী শাস্ত্রে উপযুক্ত পরিবেশের অনুপস্থিতিতে তা করা সম্ভব নয়। এ কারণেই হয়তো ভারতীয় পরিবেশে সুখময় নোবেল লরেট হওয়ার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি। তাই পাশ্চাত্যের কাছে অমর্ত্যরে ঋণের বোঝাটা বেশ ভারী। জ্যোতি বসু প্রসঙ্গ এসেছে, কিন্তু জ্যোতি বসুর সাফল্যের ভিতটি নির্মাণ করে রেখে গিয়েছিলেন বাঙালি মুসলমানেরই সন্তান কমরেড মুজফফর আহমদ। মুসলমানের সন্তান হওয়ার কারণেই কি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মুজফফর আহমদের সাফল্যের কথা ভুলে থাকতে চেয়েছেন? আমার মতে, বাঙালি মুসলমানদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব একটি পৃথক, স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের সৃষ্টি। ঐতিহাসিক কারণে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানরা কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও রাষ্ট্র চেতনার ক্ষেত্রে তারা যে পিছিয়ে পড়েননি, তার প্রমাণ আজকের বাংলাদেশ। পক্ষান্তরে, বাঙালি হিন্দুরা চেতনার রাজ্যে সর্বতোভাবেই ভারতীয় তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের রাষ্ট্রচিন্তার দুর্বলতায়। সুতরাং বাঙালি হিন্দুদের যতটা না বাঙালি হিসাবে দেখা উচিত, তার চেয়েও বেশি করে দেখা উচিত ভারতীয় হিসাবে। লক্ষ করা গেছে, ’৪৭-এ ব্রিটিশ-ভারতভাগের সময় বাঙালি হিন্দুরা সোহরাওয়ার্দী ও শরৎবসুর স্বাধীন-সার্বভৌম বঙ্গদেশ প্রস্তাবনার প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল। বলা যায়, বাঙালি হিন্দুদের হিন্দুত্ব বাঙালিত্বের চেয়ে সব সময়ই প্রবল থেকেছে। এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের ‘সংকীর্ণ চিন্তাচেতনা ও আদর্শবোধ’-এর জন্য দায়ী করা কতটা যৌক্তিক হবে?

একদিকে শিক্ষা-দীক্ষায় বাঙালি হিন্দুর অগ্রগতি এবং অন্যদিকে বাঙালি মুসলমানদের অনগ্রসরতা কি ঐতিহাসিক কারণে সম্ভব হয়েছিল তা অনুধাবন করা সহজ হবে, যদি আমরা ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু ভদ্রলোকদের মানস উপলব্ধি করতে পারি। হিন্দু ভদ্র সমাজেরই এক প্রতিনিধি তারাকৃষ্ণ হালদার চমৎকার স্বপ্নদর্শন গ্রন্থের রাজভক্তিবিষয়ক প্রবন্ধে ১৮৬৬ সালে লিখেছেন-

‘পূর্বকালে যখন এই দেশ হিন্দু জাতির শাসনাধীন ছিল, তখন রাজগণের পক্ষপাতিতা দোষে জাতিবিশেষ অপর সব জাতির ওপর সম্পূর্ণ প্রভুত্ব করিতেন, ওইসব জাতিকে স্বর্গ বা নরকগামীকরণের কর্তা ছিলেন। ... যখন এ রাজ্য যবনদিগের হস্তে ছিল, তখন তাহারা হিন্দুবর্গকে নাস্তিক ও অধার্মিকের শেষ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছিলেন। স্বজাতি প্রজাবর্গের প্রতি যাবতীয় বিষয়েই অনুগ্রহ হিন্দু প্রজাদিগের প্রতি সর্বতোভাবেই নিগ্রহ করিতেন। ... ব্রিটিশ জাতির রাজনিয়মাবলীতে এসব দোষের লেশও নাই, তাহারা আপন জাতীয় ধর্মোপদেষ্টাকে এবং এদেশস্থ ডোম প্রভৃতি যৎপরনাস্তি নীচ ব্যক্তিকে বিচারকালে সমান দেখেন।... ঐ জাতির পক্ষপাতশূন্যতা গুণের অধিক প্রশংসা কি করিব?’

এক কথায় মুসলিম শাসনের অবসানে হিন্দু সমাজের যে জীর্ণ অধঃপতিত অবস্থা, তার কারণই মুসলমান শাসন।

১৮৭৬-এ ভোলানাথ চক্রবর্তী নামে একজন বক্তৃতা দিচ্ছেন-

‘যেদিন যবনের উষ্ণীষ বঙ্গরাজ্যে প্রবেশ করে, সেইদিন হইতে এদেশে দুর্ভাগ্য ও অবনতির সূত্রপাত হয়। নিষ্ঠুর যবনশাসনে এদেশ ক্রমশ উৎসন্ন হইয়া যায়। যেমন এক প্রবল বাত্যা আসিয়া বন উপবন ভগ্ন ও হতশ্রী করে, সেইরূপ নৃশংস দুরাচার যবনজাতি আসিয়া আমাদের জন্মভূমি বঙ্গভূমির সমুদয় সুখসৌভাগ্য বিনষ্ট করিয়াছিল। অজস্র অত্যাচারস্রোত সহ্য করিয়া নিরন্তর নিপীড়িত হইয়া বঙ্গ সন্তানেরা নিতান্ত নির্বীর্য ও হীনসাহস হইয়া পড়ে। ধর্ম বিকৃতভাব ধারণ করে। স্ত্রী শিক্ষা একেবারে রহিত হয়। যবনাক্রমণ নিবারণ জন্য স্ত্রী জাতিকে নিভৃত নির্জন গৃহে রুদ্ধ করিয়া রাখা হইতে লাগিল। এক সময় দেশের দুরবস্থা ঘটিয়াছিল যে, ধনীর ধন, মানির মান ও সতীর সতীত্ব সমূহ বিপদের কারণ হইয়া উঠিয়াছিল।’

এসব কথার ব্যাখ্যা কী? আদিতে জাতির ইতিহাস ছিল গৌরবের আলোয় উজ্জ্বল-ধন, বল, বিদ্যা, ধর্ম-সবদিক দিয়েই চরম উৎকর্ষে পৌঁছেছিল সে। এখানে জাতি বলতে কখনো বাঙালি, কখনো হিন্দু, কখনো আর্য, কখনো ভারতবর্ষীয়। যে কোনো একটা বলা যেতে পারত, কিন্তু যুক্তির কাঠামোটা একই। এরপর এলো জাতির অবক্ষয়ের যুগ। অবক্ষয়ের কারণ মুসলমান শাসন অর্থাৎ জাতির পরাধীনতা।

ইতিহাসের এ মূল্যায়নই হিন্দু সমাজকে ইংরেজ রাজানুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করল। তাই বলা হলো ‘সকল বিষয়েরই সীমা আছে। যখন মুসলমানদিগের অত্যাচার নিতান্ত অসহ্য হইয়া উঠিল, তখন জগদীশ্বর তাহা হইতে পরিত্রাণের উপায় বিধান করিলেন।... যেদিন এদেশে ব্রিটিশ পতাকা প্রথম উড্ডীন হয়, সেদিন হইতেই এদেশের পুনঃসৌভাগ্যের সূত্রপাত হইয়াছে। বলুন দেখি, যদি এ পর্যন্ত যবনাধিকার অব্যাহত থাকিত, তবে আজ দেশের কী দশা ঘটিত? অতএব, একথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতে হইবে যে, পরমেশ্বর মঙ্গলের জন্য ইংরেজ জাতিকে এদেশে আনয়ন করিয়াছেন। ব্রিটিশ অধিকারে যবনদিগের অত্যাচার নিবারিত হইয়াছে।... যবনশাসনের সহিত ব্রিটিশ শাসনের তুলনায়ই হইতে পারে না। অন্ধকার ও আলোকে যত অন্তর, দুঃখ ও সুখে যত প্রভেদ, যবন শাসন ও ব্রিটিশ শাসনে তদপেক্ষাও অধিক প্রভেদ প্রতীয়মাণ হয়।’

সুতরাং একথা কি করে অস্বীকার করা যাবে, হিন্দু সমাজের যেসব বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত সাফল্যে এ দেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী যে হীনম্মন্যতাবোধে নতজানু হয়ে কারণে-অকারণে কলকাতার মুখাপেক্ষী হন, তার পেছনে রয়েছে মানস গঠনের ইতিহাস উপলব্ধিতে ব্যর্থতা। এসব বুদ্ধিজীবীর অনেকেই হয়তো জ্ঞানে-গুণে মহিমান্বিত। বার্নাড শ’ সম্পর্কে লেনিন বলেছিলেন, “He is a great soul. Alas! he has fallen among the fabians.” আমাদের দেশে কতিপয় বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে বলা যায়, Alas! they have fallen among the Dadas of Calculta. তবে তাদেরকে বার্নাড শ-এর মতো great soul বলা যাবে কি না. তা পাঠকই বিচার করবেন। পুনশ্চ : প্রবন্ধটির রচনাকাল ফেব্রুয়ারি ২০০২, ওই সময় বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পাননি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম