Logo
Logo
×

Advertisement

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

Advertisement

Icon

মজিদ মাহমুদ

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

Advertisement

কিছুদিন আগে রণবীর সিং ও দীপিকা পাড়ুকোন তাদের সন্তানের নাম ‘দোয়া’ রাখায় নেটমাধ্যমে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, সেটি আপাতদৃষ্টিতে একটি নামকেন্দ্রিক আবেগি বিতর্ক বলে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এটি আমাদের সংস্কৃতি কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে প্রভাবিত হয়-সেই বড় প্রশ্নগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করে। ‘দোয়া’ একটি আরবি শব্দ; কেউ কেউ এটিকে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সীমালঙ্ঘন হিসাবে দেখেছেন। অথচ ইতিহাস বলে, নামকরণ সব সময় ধর্মীয় সংস্কৃতির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামাজিক প্রবণতার বিষয়ও হতে পারে।

বাংলা সমাজে আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত-সব ভাষা থেকেই নাম গ্রহণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ দেশে বহু মুসলিম মেয়ের নাম ফুল, প্রকৃতি কিংবা বিমূর্ত ধারণা থেকে নেওয়া। এ ঘটনাটি আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় যে, সংস্কৃতি কখনো একক, স্থির বা সম্পূর্ণ ‘নিজস্ব’ কোনো সত্তা নয়; বরং এটি দীর্ঘ ইতিহাস, ক্ষমতার সম্পর্ক, অভিবাসন, শাসনব্যবস্থা এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক ঝুম্পা লাহিড়ির মেয়ের নাম ‘নূর’-বিষয়টি তখনই শুধু আলোচনায় আসে, যখন আধিপত্যবাদের ভয় ও অতিরিক্ত সংরক্ষণের দাবি সামনে চলে আসে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই এ বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট। এ ভূখণ্ডের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে পাল যুগের বৌদ্ধ প্রভাব, সেন যুগের ব্রাহ্মণ্য রাজদরবারি সংস্কৃতি, সুলতানি ও মুঘল আমলের ইসলামি ও ফারসি প্রভাব, ঔপনিবেশিক শাসন এবং আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতায়। অর্থাৎ বহু সংস্কৃতির সংমিশ্রণ আদিকাল থেকেই আমাদের ইতিহাসের অংশ। তবু প্রশ্ন ওঠে-এ বহুত্বের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আমরা আজ ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন হই? আবার একইসঙ্গে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়েও কেন এত কথা বলার প্রয়োজন হয়?

ইতিহাস দেখায়, বাংলার সংস্কৃতি সবসময় বাইরের প্রভাব গ্রহণ করেছে। পাল যুগে বৌদ্ধ দর্শনের বিস্তার, সেন যুগে সংস্কৃত রাজদরবারি ঐতিহ্য, সুলতানি আমলে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের নতুন উন্মেষ-সবই এসেছে সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে। আলাওল, মাগন ঠাকুর, আবদুল হাকিম, পরগাল খাঁ বা ছুটি খাঁদের সাহিত্যচর্চা প্রমাণ করে, বাইরের ভাষা ও ভাবধারা গ্রহণ করেও স্থানীয় সংস্কৃতি দুর্বল হয় না; বরং তা শক্তিশালীও হতে পারে। কারণ একটি সমাজে সমস্যা শুধু ‘বাইরের প্রভাব’ থেকেই জন্ম নেয় না। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন সেই প্রভাব আসে ক্ষমতার অসম সম্পর্কের মাধ্যমে-যেখানে একটি সংস্কৃতিকে অন্যটির তুলনায় স্বাভাবিক, উন্নত বা আধুনিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। এ কথা খুবই প্রমাণযোগ্যভাবে সত্য তুর্কি-সুলতানি আমলের পর থেকে পূর্ববঙ্গীয় সংস্কৃতি চর্চায় ধারাবাহিকভাবে একটি নির্দিষ্ট চরিত্র গড়ে ওঠে।

আজকের বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বোঝার জন্য আলাদা করে কোনো তাত্ত্বিক গ্রন্থ পড়ার প্রয়োজন নেই; প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। বিশেষ করে নগরজীবনে আঞ্চলিক মিডিয়া ও বিনোদনশিল্পের প্রভাব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। উদাহরণ হিসাবে দেখা যায়-ঢাকার বহু মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্ধ্যায় টেলিভিশন খুললে বছরের পর বছর ধরে অন্য দেশের সিরিয়াল, রিয়েলিটি শো বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নিয়মিত দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রবীণ সদস্য থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরীরা একই সিরিয়ালের চরিত্র, সংলাপ ও পোশাক নিয়ে আলোচনা করে। এতে সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন স্থানীয় নাটক বা সিরিয়ালকে ‘মানসম্মত নয়’ বলে বাতিল করা হয়, আর বাইরের কনটেন্টকেই স্বাভাবিক মানদণ্ড হিসাবে ধরা হয়।

এ প্রভাব আরও গভীরভাবে দৃশ্যমান হয় ডিজিটাল মাধ্যমে। ইউটিউব, ফেসবুক রিলস কিংবা ইনস্টাগ্রাম শর্ট ভিডিওতে বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ নিয়মিত আঞ্চলিক জনপ্রিয় গান, সংলাপ বা কৌতুক ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করছে। অনেক সময় বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার উচ্চারণ অনুকরণ করা হয়, কারণ সেটিকে বেশি স্মার্ট বা সমসাময়িক মনে করা হয়। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এমন ধারণা তৈরি হয় যে, শুদ্ধ বাংলা বলা বা স্থানীয় উচ্চারণ ব্যবহার করা নাকি গ্রাম্য কিংবা সেকেলে। এখানে আগ্রাসন কোনো জোরপূর্বক চাপ নয়; আগ্রাসন হলো রুচি ও আত্মমূল্যবোধের ধীর, নীরব পরিবর্তন।

ভাষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ইংরেজি শেখা আজকের বিশ্বে নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়-এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন চাকরি, সামাজিক মর্যাদা, ভদ্রতা বা আধুনিকতার একমাত্র চিহ্ন হিসাবে ইংরেজিকে দাঁড় করানো হয়। অনেক শহুরে পরিবারে শিশুদের বাংলা বই পড়ানোর চেয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করানোই প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ফলে বাংলা ভাষা আবেগ ও পরিচয়ের জায়গায় টিকে থাকলেও, ক্ষমতা ও সুযোগের বণ্টনে পিছিয়ে পড়ে। এটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি নরম কিন্তু গভীর রূপ-যেখানে ভাষার মধ্য দিয়েই শ্রেণিভেদ পুনরুৎপাদিত হয়।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন আমরা কী দেখব, কী শুনব, কোন গান বা ভিডিও জনপ্রিয় হবে-এসব অনেকাংশেই নির্ধারণ করে অদৃশ্য অ্যালগরিদম। যদি বাংলাভাষার মানসম্মত কনটেন্ট কম তৈরি হয়, অথবা তৈরি হলেও পর্যাপ্ত প্রচার ও দৃশ্যমানতা না পায়, তাহলে তরুণেরা স্বাভাবিকভাবেই বেশি দৃশ্যমান বাইরের কনটেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এখানে আগ্রাসনের রূপ হলো মনোযোগের দখল-যেদিকে আমাদের চোখ যায়, বাজার ও সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে সেদিকেই এগোয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা জরুরি : সব বাইরের প্রভাব কি আগ্রাসন? উত্তর হলো-না। তরুণদের সব পছন্দকে শুধু আধিপত্যের ফল হিসাবে ব্যাখ্যা করাও ভুল। অনেক সময় তারা সত্যিই ভালো কনটেন্ট, নতুন ভাবনা কিংবা উন্নত কারিগরি মানের দিকে আকৃষ্ট হয়। বাজারও সবসময় সংস্কৃতির শত্রু নয়; বাজার সুযোগও তৈরি করতে পারে। সমস্যা হয় তখনই, যখন স্থানীয় সংস্কৃতির জন্য সমান সুযোগ, সমান বিনিয়োগ এবং সমান দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা হয় না। কিংবা বাইরের সংস্কৃতি বাজার দখলে এতটাই সজাগ ও সক্রিয় থাকে-যেখানে দেশীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে আনতে চায় না; আর যখন চায় তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।

এ জায়গায়ই সংরক্ষণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংরক্ষণ মানে পরিবর্তন ঠেকানো নয়, কিংবা অতীতকে জাদুঘরে বন্দি করে রাখা নয়। সংরক্ষণ মানে হলো-যে স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধ একটি সমাজে দীর্ঘদিন জীবিত, সেগুলোকে নতুন বাস্তবতায় অর্থবহভাবে টিকিয়ে রাখা। পয়লা বৈশাখ তার একটি ভালো উদাহরণ। এটি কোনো একক ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎস থেকে আসেনি; নানা ঐতিহাসিক ধারা মিলিয়েই এটি গড়ে উঠেছে। তবু এটি আজও একটি জীবন্ত উৎসব। কিন্তু প্রতিবছর এ উৎসব পালনের বিতর্ক আমরা এড়াতে পারি না।

বাস্তবসম্মত সমাধানও তাই বাস্তব জায়গা থেকেই আসতে হবে। রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উৎসব আয়োজন নয়; স্থানীয় চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত, শিশুসাহিত্য, অ্যানিমেশন এবং ডিজিটাল কনটেন্টে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে শুধু পরীক্ষার বিষয় হিসাবে নয়, চিন্তা ও সৃজনশীলতার ভাষা হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলা কনটেন্টের দৃশ্যমানতা বাড়াতে স্থানীয় আর্কাইভ, উন্মুক্ত ডিজিটাল গ্রন্থাগার এবং বাংলাভিত্তিক অনুসন্ধান ব্যবস্থায় বিনিয়োগ জরুরি।

অনুবাদও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আদি ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল অনেকাংশেই অনুবাদনির্ভর। আধুনিক কালের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও অনুবাদ একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অনুবাদ মানে শুধু শব্দ বদল নয়; এটি ভাবনার যাতায়াত। একদিকে বিশ্বজ্ঞান বাংলায় এনে সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছানো, অন্যদিকে বাংলা সাহিত্য ও চিন্তাকে বিশ্বের ভাষায় তুলে ধরা-এ দুই পথেই আমরা শুধু ভোক্তা না থেকে অংশীদার হতে পারি।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংস্কৃতি কোনো একরৈখিক পরিচয়ের ফল নয়। লোকজ ও নগর, ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ, আদিবাসী ও প্রবাসী অভিজ্ঞতা-সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা। সংরক্ষণ মানে এই বহুমুখীন সংশ্লেষ মুছে ফেলা নয়; বরং বৈচিত্র্যকে সম্মান দিয়ে এমন একটি আত্মবিশ্বাসী সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যা বাইরের প্রভাবের সঙ্গে সমান অবস্থানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো-সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল, কিন্তু সব পরিবর্তন স্বাভাবিক নয়। যখন রুচি, ভাষা ও স্বপ্নের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে অন্যের হাতে চলে যায়, তখন সেটিই হয়ে ওঠে আধিপত্য। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত বাইরের প্রভাব বন্ধ করা নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেদের সংস্কৃতিকে এমনভাবে শক্তিশালী করা, যাতে আমরা সেই প্রভাবের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারি। ভাষা আন্দোলনের শিক্ষাও এখানেই-ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রশ্ন। ডিজিটাল যুগে এ লড়াই আরও জটিল, তবে সম্ভাবনাও ততটাই বড়। সংরক্ষণ তাই নস্টালজিয়া নয়; সংরক্ষণ হলো সচেতন বিনিয়োগ, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে একটি জীবন্ত, বহুমত জাতির সংস্কৃতি নির্মাণের প্রক্রিয়া।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম