Logo
Logo
×

Advertisement

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

Advertisement

Icon

মোহাম্মদ আজম

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

Advertisement

মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা শিখাগোষ্ঠীর উত্থান এবং দশকব্যাপী তৎপরতা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রায় তুলনাহীন ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এবং শহর হিসাবে ঢাকার নতুন উত্থানের প্রেক্ষাপটে বিশ শতকের বিশের দশকে মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে অভাবনীয় উদ্দীপনা সঞ্চারিত হয়েছিল, এ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড তার পরিষ্কার সাক্ষ্য বহন করে। প্রাথমিকভাবে একে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হিসাবেই বিবেচনা করতে হবে, যেখানে বাৎসরিক সম্মেলন, পত্রিকা প্রকাশ এবং অনুষঙ্গী সাংগঠনিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে আয়োজক-উদ্যোক্তারা বিপুল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু এ দলের দৃষ্টি ও ভঙ্গিতে পূর্ব বাংলার বিশেষত মুসলমান সমাজ এতটাই জোরালোভাবে হাজির ছিল যে, এটা প্রায় ‘জাতীয়’ ঘটনা হয়ে উঠেছিল। দেশের অপরাপর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, রাজনীতি-সচেতন জনগোষ্ঠী এবং সাধারণভাবে শিক্ষিত সমাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। যারা বিরোধ সূত্রে যুক্ত হয়েছিলেন, তাদের এর প্রভাবসীমার আওতাধীন হিসাবেই গণ্য করতে হবে। সেদিক থেকে বলা যাবে, তরুণ ও তরুণতরদের এ আয়োজন পরম সার্থকতা অর্জন করেছিল।

সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি বিশেষত হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুমুখী টানাপোড়েন তখনকার বাংলা অঞ্চলে এক গুরুতর সংকট হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। মুসলমান সমাজের মধ্যে প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ এবং সংস্কারকে আহত না করে কল্যাণ চিন্তার ধারাও ছিল অতি প্রবল। এমন আবহের মধ্যে মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে অসাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গির পরিচয় দিয়েছিল, তা বিশেষভাবে মূল্যবান। অন্যদিকে, প্রচলিত মূল্যবোধ ও সংস্কারকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আহত করার ঝুঁকিও নিয়েছিল এ দল। তারা যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নামে নিজেদের পরিচয় দিতেন, আর পরবর্তী প্রজন্মও সে পরিচয়কে নিঃসংশয়ে মেনে নিয়েছেন, তার অন্যতম প্রধান কারণ এই বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস।

সময়টাকে তার যথাবিহিত পটভূমিতে স্থাপন করতে পারলে অবশ্য বোঝা যাবে, মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্মকাণ্ড, দৃষ্টিভঙ্গি ও চৈতন্য যুগধর্মকে আলিঙ্গন করেই বিকশিত হয়েছিল। জনগোষ্ঠী হিসাবে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত তখন বিকাশের পথ ধরেছিল। তাকে প্রগতির পথ বলা যায় কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকতেও পারে; কিন্তু পশ্চিমায়ন, আধুনিকায়ন ও নগরায়ণের ভিত্তিতে মধ্যবিত্তের বিকাশ সাব্যস্ত করার যে প্রায় বিশ্বজনীন পন্থা স্বীকৃত, তার নিরিখে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। ১৮৯০-এর দশক থেকে ইংরেজি শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশের শুরু সাব্যস্ত করলে এবং বিশ শতকের গোড়া থেকে মুসলমান লেখক-সম্পাদক ও সমাজ-সংস্কারকদের তৎপরতা পরীক্ষা করলে শিখাগোষ্ঠীর আবির্ভাবকে সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার বিশেষ বাধা থাকবে না। আরেকটি তথ্যও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। উনিশ শতকের শেষাংশে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং উঠতি মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে খুব সংগত কারণে একধরনের প্রীতির সম্পর্ক ছিল। চাকরি ও ক্ষমতা প্রশ্নে মুসলমান সমাজ তখনো হিন্দু সমাজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেনি। এ প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে বাতাবরণ অন্তত তিন-চার দশক কার্যকর ছিল, তার চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল প্রকাশ আমরা দেখি কাজী নজরুল ইসলামের রচনায়।

রাজনীতিতে সিআর দাশ এবং সুভাষ বসু এ ধারারই উত্তরাধিকার। মুসলিম সাহিত্য সমাজকে এ পটভূমিতে স্থাপন করে দেখলে তার অসাম্প্রদায়িক উদার মানবিক অবস্থানের ভালো কিনারা করা যাবে। তাতে ওই অবস্থানের মূল্য বা মহিমা কমবে না; কিন্তু বিশ্লেষণমূলক পাঠের পরিসর বাড়বে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের উত্থান ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নজরুলের আবির্ভাবের গভীর সংযোগ আছে। প্রত্যক্ষ সম্পর্কের কথা কেউ কেউ লিখেছেন; তবে এর ঐতিহাসিক-সামাজিক তাৎপর্য বিষয়ে আলোচনা হয়নি বললেই চলে। নজরুল সৃষ্টিশীলভাবে মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির একেবারে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে কাজ করার যে দুর্দান্ত সাহস ও সাফল্য দেখিয়েছেন, তা ওই সমাজের যে কারও জন্যই ছিল এক বিরাট ছাড়পত্র। অন্যদিকে গোটা মুসলমান সমাজকে বিচিত্র কায়দায় তিনি যেভাবে সম্বোধন করেছেন, আর একাত্ম করার সাফল্য দেখিয়েছেন, তাও অনাগত চর্চাকারীদের জন্য পথনির্দেশ করেছিল। রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি সুসংস্কৃতির উচ্চকিত ঘোষণার ব্যাপারেও তার সাফল্য শিখাগোষ্ঠীর উদ্যোগ-আয়োজনকে সন্দেহাতীতভাবে প্রভাবিত করেছিল।

এ প্রভাবের ব্যাপারটা ওই গোষ্ঠীর সদস্যরা সম্ভবত যথাবিহিত কায়দায় উপলব্ধি করতে পারেননি। তাদের কেউ কেউ নজরুলের বন্ধু ছিলেন; অন্য অনেকেই ছিলেন গভীর অনুরাগী। কিন্তু বন্ধুত্ব ও অনুরাগ এক বস্তু, আর দার্শনিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্যে পাঠ করার কাজটা আরেক। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সদস্যরা যেমন নজরুলের এই কার্যকর পূর্বসূরিতার ব্যাপারে প্রায় উদাসীন ছিলেন, পরবর্তীকালের বিশ্লেষকরাও এ ব্যাপারে প্রায় সমরূপ ঔদাসীন্যের পরিচয় দিয়েছেন। তার অন্যতম প্রধান কারণ, যে উদারনৈতিক মানবতাবাদ শিখাগোষ্ঠীর প্রায় ব্যতিক্রমহীন অবলম্বন, তার সঙ্গে নজরুলের দূরত্ব এবং উনিশ-বিশ শতকের কলকাতায় বিকশিত সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সাযুজ্য। ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডে উদারনীতিবাদের প্রকাশ হিসাবে ‘সংস্কৃতি’ ধারণাটির যে প্রবল বিকাশ, মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তা পদ্ধতি ও তৎপরতায় তার প্রত্যক্ষ অনুরণন দেখি। মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, শিখাগোষ্ঠীর সফল প্রাবন্ধিকদের একটা বড় অংশ সংস্কৃতিকেই তাদের চিন্তার প্রধান বুনিয়াদ হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তবে তাদের আত্তীকরণ ও স্বীকরণের কাজটা যতটা ইংরেজি ভাষা মারফত ঘটেছিল, তারচেয়ে অনেক বেশি ঘটেছিল কলকাতায় চর্চিত বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বর্ণাঢ্য চিন্তাধারা থেকে। এ চিন্তার সর্বোত্তম প্রকাশক হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাদের গভীর ও সর্বস্বীকৃত আত্মীয়তা। ফলে রবীন্দ্রবলয়ের মধ্যে শিখাগোষ্ঠী যেমন নিজেদের স্বরূপ চিনতে পেরেছিলেন, তেমনি উত্তরকালের বিশ্লেষকরাও তার মধ্যেই এ গোষ্ঠীকে দেখার ও বিশ্লেষণের আরাম খুঁজে পেয়েছিলেন।

নজরুলের সঙ্গে অবশ্য শিখাগোষ্ঠীর ভাবগত বৈপরীত্য আরও অনেক বেশি। নজরুল ঘোষিতভাবে বিপ্লবী এবং আমূল পরিবর্তনের পয়গম্বর। বিপরীতে শিখাগোষ্ঠী প্রায় সর্বাংশে ঘোষিতভাবে বিপ্লববিরোধী। যদি রাজনৈতিকতাকে কর্মকাণ্ড ও কর্মসূচির একটা প্রধান ভিত্তি হিসাবে দেখি, তাহলে বলা যাবে, নজরুল সর্বতো রাজনৈতিক; আর শিখাগোষ্ঠী ওই অর্থে অরাজনৈতিক। নিজেদের অবস্থানের ব্যাপারে তারা খুবই স্বচ্ছ ছিলেন, আর দার্শনিক অবস্থানের দিক থেকেই সে অবস্থানকে বরাবর উচ্চকিত রেখে গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

কথাটা সংস্কৃতিবিষয়ক ধারণার ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ সত্য। শিখাগোষ্ঠীর সমকালীন অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতি প্রশ্নে সম্পূর্ণ ভিন্নতর অবস্থানে নিজেদের সক্রিয় রেখেছেন। এর মধ্যে আবুল মনসুর আহমদ প্রকাশিত মতামতের দিক থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও স্বতন্ত্র। তবে এ ধারার আরও বহুজনের নাম করা যাবে। এই দুই তরফে চিন্তা ও কর্মসূচির ঐক্য যে হবে না, তা তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু মুসলিম সাহিত্য সমাজের পক্ষ থেকে বলা দরকার, নিজেদের অবস্থান ও পদ্ধতির দিক থেকে তারা কেবল স্বচ্ছই ছিলেন না, নিজেদের রচনা ও মতামতে পদ্ধতিগত নিষ্ঠাও তারা সর্বক্ষেত্রে বজায় রেখেছেন।

আজ শতবর্ষ পরে মুসলিম সাহিত্য সমাজের কৃতি ও কীর্তি প্রসঙ্গে মূল্যায়ন করতে গেলে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসাবে এ গোষ্ঠীর প্রাবন্ধিক ও চিন্তকদের ব্যক্তিগত কৃতিত্বের সমষ্টিকেই উল্লেখ করতে হবে। অপ্রধান বহুজনকে বাদ দিলেও এ গোষ্ঠীর প্রধান লেখক থাকবেন অন্তত ছয়জন, যারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিক-গবেষকের কাতারে পড়বেন। ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যে এ ধরনের কিছু আগে তো ঘটেইনি, এমনকি পরেও একসঙ্গে গোষ্ঠী হিসাবে আবির্ভূত এতজন গুরুত্বপূর্ণ লেখকের অভিজ্ঞতা আমাদের হয়নি। এরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন-কী রচনারীতি, কী চিন্তাপদ্ধতি ও সিদ্ধান্ত-সবদিক থেকেই তারা নিজেদের স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। শতবর্ষ-পরবর্তী পাঠক-বিশ্লেষকদের তরফে বলা যায়, তারা উৎপাদন করেছেন বিপুল পরিমাণ কার্যকর টেক্সট, যার সঙ্গে পর্যালোচনামূলক সম্পৃক্তির দেদার সুযোগ আমাদের আছে।

এর বাইরে শিখাগোষ্ঠীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব ‘স্বজাতি’র প্রতি নিষ্ঠা। এ স্বজাতি বাঙালি মুসলমান। ধর্ম-নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করার পরিবর্তে তারা যে বেছে নিলেন বাঙালি মুসলমান জনসমাজ, তার বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণও আছে। তাৎপর্য এই যে, যে মধ্যবিত্ত বলয়ে তাদের অবস্থান, সেখান থেকে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার জন্য একই পাল্লায় কাজ করার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু কারণটাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকের কলকাতায় সৃষ্টিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে হিন্দু-মুসলমান একীভূত চর্চার কোনো পরিসর বা ঐতিহ্য ছিল না। অন্য বিচিত্র কারণের মধ্যে এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ইতিহাসতত্ত্ব, যেখানে মুসলমান শাসন ও সমাজকে ‘বিদেশি’ আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়েছিল। ফলে এ দুই সমাজের মধ্যে ফারাক এত প্রবল ছিল যে, তুলনামূলক অবিকশিত মুসলমান সমাজের পক্ষে সামগ্রিকভাবে বাঙালি সমাজকে সম্বোধন করার উপায় ছিল না।

তারা অবশ্য এর মধ্যেই উদারনীতিবাদী এবং সম্প্রীতির মনোভাব নিয়ে কাজ করেছেন। তাতে কিছু সীমাবদ্ধতাও তৈরি হয়েছে। অনেক সময়ই তাদের কাছে আদর্শ হিসাবে বড় হয়ে উঠেছিল কলকাতায় ইতোমধ্যে জমে ওঠা সংস্কৃতি ও জীবনাচার। এমনিতেই উদারনীতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে যে আদর্শবাদিতা ও আরোপণমূলকতা থাকে, তা শিখাগোষ্ঠীর চিন্তকদের মধ্যে স্বভাবতই ছিল। তার ওপর প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের আদর্শ উদাহরণ চোখের সামনে থাকায় এবং তাতে মনোযোগ থাকায় মুসলমান সমাজকে তাদের পক্ষে অনেক সময় সমাজের অভ্যন্তর গতিবিধি অনুযায়ী দেখা সম্ভব হয়নি। চিন্তাপদ্ধতি ও জোরারোপের ধরনের কারণে সমাজের সঙ্গে কখনো কখনো দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ গত একশ বছর ধরেই বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রবলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। চিন্তা ও রচনাশৈলীর দিক থেকে এদের প্রভাববলয়ে থাকা পরবর্তী প্রজন্মগুলোর লেখকসংখ্যাও যথেষ্ট। তবে যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরবর্তী বিশ্লেষকরা এ গোষ্ঠীর তৎপরতা ও রচনার পর্যালোচনা করেছেন, তাতে বেশ কতকটা পুনরাবৃত্তি ও সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। বস্তুত, প্রধান দুটি বর্গে আমরা এসব বিচার ও মূল্যায়নকে বিন্যস্ত করতে পারি। দুটিই অবশ্য পরস্পরের পরিপূরক। প্রথমটি হলো, বৃহত্তর অর্থে বাঙালি মুসলমান সমাজের আধুনিকায়নের দিক; আর দ্বিতীয়টিকে বলতে পারি, ওই আধুনিকায়নের অভিমুখে খাপ খায় না এমন পক্ষগুলোর সঙ্গে তাদের বিরোধের দিক। দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নাই। তবে এ প্রবণতার ফলে দুটি বড় ক্ষতিও হয়েছে। একদিকে পদ্ধতিগত পর্যালোচনার বদলে শিখাগোষ্ঠীর চর্চাকে আদর্শ ধরে নিয়ে কাজ করার ফলে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে প্রচুর; অন্যদিকে আরও বিপুল ক্ষেত্রে তাদের রচনা ও তৎপরতার বিচার-বিশ্লেষণ যেভাবে আমাদের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে আলোকিত করতে পারত, সে সুযোগ অনেকটাই অব্যবহৃত থেকে গেছে।

যদি উদার, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ইত্যাদির বিশেষ সংজ্ঞায়ন না করে কাউকে এসব বর্গে আঁটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থাকে, তাহলে ভালো-মন্দের একটা বৈপরীত্যেরই পুনরুৎপাদন চলতে থাকে। যে পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে তারা কাজ করেছিলেন, তার সঙ্গে সময় ও স্থানের দিক থেকে সম্পৃক্ত না হয়ে যদি একটা আদর্শ চর্চা কল্পনা করা হয়, তাহলে কোনো ঘটনা বা চর্চা আবশ্যিকভাবে পরিপ্রেক্ষিত থেকে আলগা হয়ে প্রত্নবস্তুতে পরিণত হবে এবং বর্তমানের সঙ্গেও তার প্রয়োজনীয় মোলাকাত-মোকাবিলার পরিসর সংকীর্ণ হবে। শিখাগোষ্ঠী পাঠের ক্ষেত্রে বস্তুত এ ঘটনাই ঘটেছে। গল্পকে তার পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে তাজা রেখে জীবন্ত সংলাপ রচনার কাজ খুব একটা হয়নি। একই কারণে অসাধারণ এসব প্রাবন্ধিকের চিন্তার পদ্ধতি ও জ্ঞানতত্ত্ব নিয়েও বিশেষ গভীর কোনো আলাপ-আলোচনা চোখে পড়ে না। শিখাগোষ্ঠী উল্লেখিত হন চারপাশের সব যাপিত জীবনের সঙ্গে সম্পর্করহিত এক আদর্শ চর্চা হিসাবে।

সে এতটাই যে, মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে যে সেকালের নবীন-প্রবীণ বিপুল পরিমাণ মানুষ যুক্ত ছিলেন, যাদের সমাজ, ধর্ম ও সমাজ-সংস্কার বিষয়ে পরিপূরক ও প্রতিস্পর্ধী নানা ধারণা ছিল, সে কথা প্রায় অনুল্লেখিতই থেকে যায়। বড় হয়ে ওঠে বিরোধিতার প্রসঙ্গ। বিরোধিতা অবশ্যই ছিল। তবে নতুন উদ্যোগ-আয়োজনকে যে কোনো স্থান-কালেই এ পরিমাণ বিরোধ মোকাবিলা করতে হয়। বস্তুত, উনিশ শতকের কলকাতায় বিরোধের মাত্রা ও গুণ এরচেয়ে অনেক বেশি ছিল। মূলত আদর্শবাদিতা, আধুনিকতা ও প্রগতির গল্প আরোপণের কারণেই বিরোধগুলো এতটা পর্যালোচনাহীন নিন্দার শিকার হয়েছে।

মোদ্দা কথা, এক অসামান্য তৎপরতা এবং এত অসামান্য টেক্সটের উপস্থিতি পরবর্তী জনসমাজের জন্য যে পরিমাণ সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে পারত, বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও একাডেমিক সমাজ তার প্রায় কিছুই ব্যবহার করতে পারেনি। তবে এ আশা অন্যায় হবে না যে, নিজেদের অতীতকে ভালো-মন্দের বৈপরীত্যে মিথ করে না তুলে সম্পৃক্ততামূলক পর্যালোচনার মধ্যদিয়ে পঠন-পাঠনের একটা তাগিদ শিখাগোষ্ঠীর শতবর্ষ উপলক্ষ্যে অনেকে উপলব্ধি করবেন। সেরকম হলেই আমাদের বর্তমান জীবনে এ অসামান্য ঘটনা সার্থক হয়ে উঠবে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতা

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সংরক্ষণের বাস্তবতা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

রাজনীতির ভাষা, রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম