ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বদলে যাচ্ছে দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি
বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এখন এক বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে শিল্প পুরোপুরি নির্ভর করত ক্যাসেট, সিডি অ্যালবাম, রেডিও এবং টেলিভিশনের ওপর, সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ইউটিউব, ফেসবুক, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক, টিকটকসহ নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এ পরিবর্তন শুধু গান শোনার মাধ্যমকেই নয়, বদলে দিয়েছে শিল্পীদের কাজের ধরন, আয়ের কাঠামো এবং শ্রোতার সঙ্গে সম্পর্কও। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
ছবি: এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গান শুধু শোনার বিষয় নয়, এক যুগেরও বেশি সময় আগে থেকে এটি দেখার বিষয় হয়েও দাঁড়িয়েছে। আর সেটা মিউজিক ভিডিও। শ্রোতারা এখন একটি গান শোনার পাশাপাশি নান্দনিক ভিডিও দেখতেও অভ্যস্ত। এছাড়া বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগীত শোনার ধরনও দ্রুত বদলেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি, যার বড় একটি অংশ নিয়মিত ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান শোনেন। ফলে এখন ক্যাসেট বা সিডির বাজার বিলুপ্তি ঘটেছে বলা যায়। আগে যেখানে একটি গান জনপ্রিয় হতে টিভি বা রেডিওর সাহায্য প্রয়োজন হতো, এখন একটি ইউটিউব ভিডিও বা টিকটক ক্লিপ দিয়েই গান ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে ইউটিউব এখন সবচেয়ে বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বেশিরভাগ মিউজিক লেবেল এখন তাদের আয় মূলত ইউটিউব মনিটাইজেশন, বিজ্ঞাপন এবং ভিউয়ের ওপর নির্ভর করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শীর্ষ মিউজিক লেবেলগুলোর মধ্যে অনেকেই তাদের মোট আয়ের ৭০-৮০ শতাংশই ইউটিউব থেকে অর্জন করে। ইউটিউব চ্যানেলগুলো এখন শুধু গান প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
সংগীত বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘বাংলাদেশে ইউটিউব মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক ধরনের নতুন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করেছে। আগে যেখানে অ্যালবাম বিক্রি ছিল মূল আয়, এখন সেখানে ভিউ এবং বিজ্ঞাপনই মূল ভিত্তি।’
এ ছাড়াও রয়েছেন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের উত্থান। ইউটিউবের পাশাপাশি স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক, অ্যামাজন মিউজিকের মতো আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও ধীরে ধীরে বাংলাদেশি গান জায়গা করে নিচ্ছে। যদিও এখনো এ প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহার ইউটিউবের তুলনায় কম, তবে তরুণ শিল্পীরা এখানে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন। একটি আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ডিজিটাল মিউজিক বাজার দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী কয়েক বছরে এটি কয়েক মিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ভবিষ্যতে সংগীতের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হবে।
গান প্রচারের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ারও ভূমিকাও অনেক। বিশেষ করে ভাইরাল সংস্কৃতি। ফেসবুক, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রাম এখন গান জনপ্রিয় করার বড় মাধ্যম। অনেক গান প্রথমে টিকটকে ছোট ক্লিপ আকারে ভাইরাল হয়, পরে তা ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে পূর্ণাঙ্গ জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে নতুন শিল্পীরা কোনো বড় প্রোডাকশন ছাড়াই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছেন। বিশেষ করে লোকসংগীত, রিমিক্স এবং ফিউশন গানগুলো টিকটকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংগীত গবেষকরা বলছেন, ‘এখন গান শুধু শোনা নয়, দেখা এবং শেয়ার করার বিষয়ও হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া সংগীতের সঙ্গে শ্রোতার সম্পর্ককে আরও ইন্টারঅ্যাকটিভ করে তুলেছে।’
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের এই প্রসার সংগীতশিল্পীদের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। এখন একজন শিল্পী ঘরে বসেই নিজের গান রেকর্ড করে ইউটিউব বা স্পটিফাইয়ে প্রকাশ করতে পারেন। এর ফলে বড় রেকর্ড লেবেলের ওপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে। দেশের অনেক স্বাধীন (ইন্ডিপেনডেন্ট) শিল্পী এখন ইউটিউব চ্যানেল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের শ্রোতাশ্রেণি তৈরি করছেন। বিশেষ করে তরুণ শিল্পীরা ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। তবে এ সুযোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রতি স্ট্রিম থেকে আয় খুবই কম হওয়ায় অনেক শিল্পী নিয়মিত আয় নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন। এছাড়া প্রতিযোগিতাও অনেক বেড়ে গেছে, কারণ প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন গান অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় মিউজিক লেবেল ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্ণধার সংগীতশিল্পী ধ্রুব গুহ বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে গান প্রকাশ সহজ হয়েছে, কিন্তু টিকে থাকা কঠিন হয়ে গেছে। এখন শুধু ভালো গান করলেই হয় না, ভালো মার্কেটিংও জানতে হয়।’
এটা ঠিক যে, বাংলাদেশে অনেক শিল্পী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পেয়েছেন। যেমন, অনেক ব্যান্ড ও একক শিল্পীর গান ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ অতিক্রম করেছে। কিছু গান আবার বিদেশি শ্রোতার কাছেও জনপ্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে ফোক-ফিউশন, আধুনিক পপ এবং রিমিক্স গানগুলো ইউটিউব ও স্পটিফাইয়ে ভালো পারফর্ম করছে। তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা এখন গান তৈরির পাশাপাশি ভিডিও প্রোডাকশন, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এবং ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়েও দক্ষ হয়ে উঠছেন।
ডিজিটাল মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি শুধু শিল্প নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। এখানে রয়েছে ভিডিও প্রোডাকশন টিম, ডিজিটাল মার্কেটার, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার, অডিও ইঞ্জিনিয়ার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর। গবেষণায় দেখা যায়, এই নতুন ইকোসিস্টেম তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল কনটেন্ট প্রোডাকশন এখন জনপ্রিয় ক্যারিয়ার হিসাবে গড়ে উঠছে। সংগীত বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এখন ‘ডিজিটাল ট্রানজিশন ফেজ’-এ রয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে ধ্রুব গুহ বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক সময় পার করছি যেখানে সংগীত শুধু বিনোদন নয়, বরং একটি ডিজিটাল পণ্য।’ তিনি মনে করেন, ‘ভবিষ্যতে ব্লকচেইন, এআই এবং নতুন স্ট্রিমিং প্রযুক্তি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিকে আরও পরিবর্তন করবে।”
তথ্য উপাত্ত ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণপূর্ব এটা বলা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছে। এটি একদিকে শিল্পীদের জন্য স্বাধীনতা ও সুযোগ এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তৈরি করেছে তীব্র প্রতিযোগিতা ও নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে পরিবর্তনের এ ধারায় একটি বিষয় পরিষ্কার, ভবিষ্যতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল, যেখানে প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা এবং দর্শকের অংশগ্রহণ একসঙ্গে মিলেই গড়ে তুলবে সংগীতের নতুন জগৎ।

