গান হিট হওয়ার নেপথ্যে কারা
Advertisement
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি গান প্রকাশের পর শ্রোতার মুখে মুখে ফিরতে শুরু করলে আলোটা সাধারণত পড়ে গায়ক-গায়িকার ওপর। সেটি হয়ে যায় ‘ওমুক শিল্পীর’ গান! অথচ সেই গানের জন্মের শুরু থেকে শ্রোতার কানে পৌঁছানো পর্যন্ত কাজ করেন আরও অনেক মানুষ। কেউ লেখেন কথা, কেউ সুর দেন, কেউ শব্দের ভেতর তৈরি করেন আবহ, কেউ গানের প্রতিটি স্তরকে নিখুঁত করেন মিক্স ও মাস্টারিংয়ে। এরপর ভিডিও নির্মাণ ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারণা গানটিকে পৌঁছে দেয় আরও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে। তাই একটি হিট গানের গল্প আসলে একক শিল্পীর নয়-এটি একটি পুরো দলের গল্প।
* গীতিকার : গানের প্রথম কারিগর
গানের জন্ম অনেক সময় শুরু হয় একটি শব্দ, একটি লাইন কিংবা একটি অনুভূতি থেকে। সেই অনুভূতিকে শ্রোতার ভাষায় রূপ দেন গীতিকার। প্রেম, বিরহ, আনন্দ, প্রতিবাদ কিংবা নস্টালজিয়া-যে বিষয়ই হোক, গানের কথাই শ্রোতার সঙ্গে প্রথম আবেগের সেতু তৈরি করে।
এ প্রসঙ্গে গীতিকার জাহিদ আকবর বলেন, ‘একটি ভালো গানের কথা শুধু সুন্দর হলেই হয় না, সেটি শ্রোতার নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যেতে হয়। একটি লাইন যখন শ্রোতা নিজের গল্প বলে মনে করেন, তখনই সেটি মনে জায়গা করে নেয়।’
বর্তমান সময়ে গানের কথায় সহজ ভাষা, কথ্য শব্দ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য ছোট বাক্যের গুরুত্বও বেড়েছে। ফলে গীতিকারকে একদিকে সৃজনশীল, অন্যদিকে সময় ও শ্রোতার রুচি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হচ্ছে।
* সুরকার : লিরিক্স নিয়ে খেলা করেন
শুধু ভালো কথা থাকলেই গান শ্রোতাপ্রিয় হয় না। সেই কথার সঙ্গে সুরের সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গীতিকারের লেখা শব্দকে সুরের মাধ্যমে আবেগ ও স্মরণযোগ্যতার মাত্রা দেন সুরকার।
অনেক জনপ্রিয় গানের সুর করেছেন জনপ্রিয় গায়ক মোহাম্মদ মিলন। গানের সুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কথার ভেতরে যে আবেগ থাকে, সুরের মাধ্যমে সেটাকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে হয়। অনেক সময় খুব সাধারণ একটি লাইনও সঠিক সুর পেলে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে।’
অর্থাৎ, একটি গানের সুর কতটা সহজে মনে থাকে, শ্রোতা কত দ্রুত গুনগুন করতে পারেন-এসব বিষয়ও গানের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
* সংগীত পরিচালক : সবকিছুকে এক সুতোয় বাঁধেন যিনি
গানের কথা ও সুর প্রস্তুত হওয়ার পর শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ-সংগীতায়োজন। কোন বাদ্যযন্ত্র কোথায় থাকবে, কোথায় শব্দ কমবে বা বাড়বে, গানের শুরুটা কেমন হবে, কোরাস কীভাবে বিস্তৃত হবে-এসব সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সংগীত পরিচালক।
সংগীত পরিচালক তরিক আল ইসলাম রনি বলেন, ‘একটি গানকে শুধু অনেক বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সাজালেই ভালো অ্যারেঞ্জমেন্ট হয় না। গানের মূল অনুভূতিকে সামনে রেখে কোন শব্দটি কতটা জায়গা পাবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্ট্রিংস, গিটার, পিয়ানো, পারকাশন, সিন্থেসাইজার কিংবা ইলেকট্রনিক সাউন্ড-সবকিছুর ভারসাম্য তৈরি করা সংগীত পরিচালকের অন্যতম কাজ।’
* গায়ক-গায়িকা : যাদের কণ্ঠে আসে চূড়ান্ত অনুভূতি
সব প্রস্তুতির পর গানটি শ্রোতার কাছে পৌঁছায় শিল্পীর কণ্ঠে। গায়ক বা গায়িকা গানের কথা ও সুরকে নিজের ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করেন। একই গান ভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে ভিন্ন আবেগ তৈরি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কাজী শুভ বলেন, ‘একজন শিল্পীর কাজ শুধু সঠিক সুরে গান গাওয়া নয়। গানের কথাটা বুঝে সেটার অনুভূতি কণ্ঠে প্রকাশ করতে হয়। শ্রোতা যেন মনে করেন শিল্পী তার নিজের কথাই বলছেন-সেই জায়গাটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
অর্থাৎ কণ্ঠের টেক্সচার, উচ্চারণ, আবেগ, গায়কির ধরন এবং রেকর্ডিংয়ের সময় শিল্পীর পারফরম্যান্স-সব মিলিয়ে তৈরি হয় গানের চূড়ান্ত কণ্ঠ।
* মিক্সিং : আলাদা শব্দকে এক গানে পরিণত করা
রেকর্ডিং শেষ হলেও গান তখনও শ্রোতার জন্য প্রস্তুত নয়। বিভিন্ন কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র ও সাউন্ড ট্র্যাককে ভারসাম্যের মধ্যে আনেন মিক্সিং ইঞ্জিনিয়ার। কোন ইন্সট্রুমেন্ট কতটা জোরে শোনা যাবে, কোন শব্দ সামনে থাকবে, কোনটি পেছনে-এসব সূক্ষ্ম কাজের মধ্য দিয়েই গানের শ্রুতিমাধুর্য তৈরি হয়।
মিক্সিং ইঞ্জিনিয়ার আমজাদ হোসেন বাপ্পি বলেন, ‘একটি গানে অনেকগুলো ট্র্যাক থাকে। সেগুলোকে এমনভাবে সাজাতে হয়, যাতে শ্রোতার কাছে সবকিছু পরিষ্কার শোনা, আবার কোনো একটি উপাদান অন্যটিকে ঢেকে না ফেলে।’
ভালো মিক্সিংয়ের ফলে গানের কণ্ঠ, সুর ও বাদ্যযন্ত্র আলাদা হয়েও একসঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ শব্দজগৎ তৈরি করে।
* মাস্টারিং : প্রকাশের আগে শেষ কারিগরি ধাপ
মিক্সিংয়ের পর মাস্টারিং। এটি গানের শেষ পর্যায়ের অডিও প্রক্রিয়াকরণ। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গানটি যাতে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে শোনা যায়, তার জন্য শব্দের সামগ্রিক ভারসাম্য, লেভেল ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় ঠিক করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাস্টারিংকে অনেকেই শুধু শব্দ বাড়িয়ে দেওয়ার কাজ মনে করেন। আসলে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। গানের সামগ্রিক চরিত্র ঠিক রেখে এটিকে প্রকাশের উপযোগী করে তোলাই মূল লক্ষ্য।
* ভিডিও নির্মাতা : গানকে দৃশ্যের ভাষা দেন
বর্তমান সময়ে একটি গান শুধু শোনা হয় না, দেখা হয়। মিউজিক ভিডিও তাই গানের পরিচিতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিচালক গানের গল্প, আবহ ও শিল্পীর উপস্থিতিকে দৃশ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন।
এ প্রসঙ্গে ভিডিও নির্মাতা মাহিন আওলাদ বলেন, ‘গানটির নিজস্ব একটা আবহ থাকে। ভিডিওর কাজ হলো সেই আবহকে দৃশ্যের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা। তবে ভিডিও যেন গানের মূল অনুভূতিকে ছাপিয়ে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়।’
লোকেশন, চিত্রগ্রহণ, পোশাক, আলো, সম্পাদনা ও পোস্ট-প্রোডাকশনের সমন্বয়ে তৈরি হয় সেই ভিজ্যুয়াল পরিচয়, যা অনেক সময় গানটিকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়।
* সোশ্যাল মিডিয়া টিম : শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার লড়াই
একটি গান তৈরি হওয়ার পর তার প্রচারণাও এখন আলাদা একটি শিল্প। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গানটির প্রচার পরিকল্পনা করে সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল মার্কেটিং টিম। ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ আরেফিন নেওয়াজ বলেন, ভালো গান তৈরি হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সঠিক শ্রোতার কাছে গানটি পৌঁছানোও জরুরি। টিজার, শর্ট ভিডিও, গানের বিশেষ অংশ কিংবা শিল্পীর কনটেন্ট-সবকিছুর একটি পরিকল্পিত ব্যবহার দরকার। বিশেষ করে গানের একটি ‘হুক লাইন’ বা স্মরণীয় অংশ যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি নতুন শ্রোতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কৃত্রিমভাবে জনপ্রিয়তা দেখানোর বদলে প্রকৃত শ্রোতার প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
একটি গান হিট হওয়ার পেছনে তাই শুধু একটি কণ্ঠ নয়, কাজ করে বহু মানুষের সম্মিলিত দক্ষতা। গীতিকার গল্প লেখেন, সুরকার সেই গল্পে সুর বসান, সংগীত পরিচালক তৈরি করেন শব্দের কাঠামো, শিল্পী তাতে প্রাণ দেন। মিক্সিং ও মাস্টারিং গানটিকে শ্রুতিমাধুর্যপূর্ণ করে, ভিডিও নির্মাতা তাকে দৃশ্যমান করেন, আর ডিজিটাল টিম পৌঁছে দেয় শ্রোতার হাতের মুঠোয়। শ্রোতা যখন শুধু শিল্পীর নাম মনে রাখেন, তখন পর্দার আড়ালে থাকা এ মানুষগুলোর অবদান অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। অথচ একটি জনপ্রিয় গানের আসল জন্মকথা লিখতে গেলে কণ্ঠের পাশাপাশি তাদের প্রত্যেকের নামই বলতে হয়।
