তারকার শূন্যতা প্রকট
ফাঁকা মঞ্চে দেশের বিনোদন অঙ্গন
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় পর্দায় দেখা যেত সব পরিচিত মুখ। নাটক, সিনেমা, গান কিংবা টেলিভিশন অনুষ্ঠান-সবখানেই তারকাদের ব্যস্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিনোদন অঙ্গনের একটি বড় অংশের শিল্পী ও সংগঠককে হঠাৎ করেই আড়ালে যেতে দেখা যায়। কারও বিরুদ্ধে ছিল জুলাই আন্দোলনবিরোধী অভিযোগ, কেউ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগের কারণে নীরব ছিলেন, আবার কেউ কেউ পালিয়ে গেছেন দেশ থেকে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই শূন্যতা পুরোপুরি কাটেনি। বরং নতুন বাস্তবতায় একদিকে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সমর্থক বেশ কিছু শিল্পী আবারও নিয়মিত হচ্ছেন, অন্যদিকে অনেক পরিচিত মুখ এখনো দেশের বাইরে কিংবা আগের মতো দৃশ্যমান নন।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চলচ্চিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল পরিচিত কয়েকজন শিল্পীর হঠাৎ জনসম্মুখ থেকে সরে যাওয়া। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির তৎকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত মনোয়ার হোসেন ডিপজল, নিপুণ আক্তার ও জায়েদ খান-তিনজনই রাজনৈতিক পালাবদলের পর জনপরিসরে অনেকটা পিছিয়ে যান। চিত্রনায়ক ফেরদৌস ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। ৫ আগস্ট পরবর্তী তিনিও পালিয়ে যান দেশ থেকে। জানা গেছে, প্রথমে ভারত, পরে সেখান থেকে আমেরিকায় চলে যান এ অভিনেতা। এখনো তাকে কোনো দেশেই প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। আওয়ামী সমর্থক আরেক অভিনেতা রিয়াজও চলে যান আড়ালে। তিনি অবশ্য দেশেই আছেন। কিছুদিন আগে হাইকোর্টে জামিনও চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা পাননি। এরকম আড়ালে থাকার তালিকায় অনেক শিল্পীরই নাম রয়েছে।
এরপর সময়ের সঙ্গে অনেকের অবস্থান বদলেছে। কেউ দেশে থেকে আবার কাজ শুরু করেছেন, কেউ বিদেশে থেকে নতুন করে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করছেন। জায়েদ খান দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং সেখানে স্টেজ শো ও উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং সেখানে থেকেই সরকার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে চিত্রনায়ক সাইমন সাদিকও আমেরিকায় অবস্থান করে ফেসবুকে নিয়মিত সরকার ও দেশবিরোধী মন্তব্য করেন। আবার দেশে থেকে চঞ্চল চৌধুরী, আরেফিন শুভ, নুসরাত ফারিয়া, আজিজুল হাকিমদের মতো আওয়ামী সমর্থকরাও কাজে নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।
দেশের বাইরে থাকা শিল্পীর তালিকা অবশ্য শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কাজের সংকট, আয় কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাও অনেকের বিদেশমুখী হওয়ার কারণ হিসাবে উঠে এসেছে। এ তালিকায় রয়েছেন-আফরোজা বানু, লুৎফন নাহার লতা, শিরিন বকুল, তৌকীর আহমেদ, বিপাশা হায়াত, মৌসুমী, টনি ডায়েস, প্রিয়া ডায়েস, তমালিকা কর্মকার, হিল্লোল, নওশীন, রিয়া চৌধুরী, স্বাধীন খসরু, রিচি সোলায়মান, শ্রাবন্তী, বিপ্লব (প্রমিথিউস), দিনাত জাহান মুন্নী, কাজী মারুফ, শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি, অগ্নীলা, আমব্রিন, শাবনূর, তামান্না, মোনালিসা, রোমানা, ইবরার টিপু, জেকে মজলিশ, লিটু আনাম, অমিত হাসান, ইমন, সোনিয়া হোসেন, রেশমী মির্জাসহ আরও অনেক তারকাশিল্পী।
এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ আমলে বিনোদন অঙ্গনের একাধিক তারকা প্রকাশ্যে দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কেউ ছিলেন সংসদ সদস্য, কেউ বিভিন্ন সরকারি বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে, আবার কেউ দলীয় কর্মসূচিতে সরাসরি উপস্থিত থেকেছেন। ফলে সরকার পতনের পর তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হওয়া এবং কাজের জায়গায় অস্বস্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। তবে রাজনৈতিক সমর্থন বা অতীতের দলীয় সম্পৃক্ততা নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়-এ পার্থক্যটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও হয়ে উঠেছে নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্র। বিদেশে থাকা কয়েকজন শিল্পীর পোস্ট নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে, আবার কারও বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বা জুলাই আন্দোলনবিরোধী প্রচারের অভিযোগ উঠেছে। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো বক্তব্যকে ‘দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র’ হিসাবে চিহ্নিত করার আগে তার বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট, সত্যতা এবং আইনি অবস্থান যাচাই করা যেমন জরুরি, তেমনি বর্তমানে যারা দেশের বাইরে অবস্থান করে সরকার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছেন, এটা অবশ্যই অপরাধের শামিল বলেই আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য অন্য জায়গায়-তারকারা কোথায়? উত্তরটি শুধু রাজনীতিতে খুঁজলে ভুল হবে। ২০২৫ সালেই নাট্যাঙ্গনের সংকট নিয়ে একাধিক শিল্পী ও নির্মাতা কাজের অভাবের কথা বলেছেন। অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ জানিয়েছিলেন, ১১ মাস তিনি কোনো কাজ পাননি। একই সময়ে নির্মাতা ও শিল্পীদের কেউ কেউ বলেছিলেন, ঈদের পরের মৌসুমি মন্দা, বর্ষায় আউটডোর শুটিং কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এবার সংকট দীর্ঘ হয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বিনিয়োগ সংকট, কম বাজেট, স্পনসর কমে যাওয়া এবং প্রধান অভিনয়শিল্পীদের অন্য মাধ্যমে চলে যাওয়া-সব মিলিয়ে টেলিভিশন ও ইউটিউব নাটকের বাজার চাপের মধ্যে রয়েছে। বড় তারকাদের কেউ সিনেমা বা ওটিটিতে চলে গেছেন, কেউ দেশের বাইরে, আবার কেউ নিয়মিত নাটকে ফিরছেন না। ফলে ছোট পর্দায় পরিচিত মুখের সংকটও তৈরি হয়েছে।
সিনেমার চিত্রও খুব উজ্জ্বল নয়। ২০২৫ সালে প্রায় অর্ধশত সিনেমা মুক্তি পেলেও ব্যবসায়িক সাফল্য মূলত কয়েকটি বড় ঈদকেন্দ্রিক সিনেমার মধ্যে সীমিত ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দর্শক সংকট ও প্রেক্ষাগৃহের দুরবস্থার পাশাপাশি শিল্পীদের দেশের বাইরে চলে যাওয়াও এ খাতের সংকটকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
এদিকে টেলিভিশন ধারাবাহিকেও তারকা সংকট স্পষ্ট। একসময় সারা বছর ধারাবাহিকে ব্যস্ত থাকা অনেক অভিনয়শিল্পী এখন ধারাবাহিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে শুধু শিল্পী নয়, দর্শকও টেলিভিশন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
এ বাস্তবতায় বর্তমানের নতুন রাজনৈতিক পর্বে বিনোদন অঙ্গনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আস্থা ও কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনা। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো বদলেছে, কিন্তু বিনোদন শিল্পের মৌলিক সমস্যাগুলো-বিনিয়োগের অভাব, প্রেক্ষাগৃহ সংকট, কম বাজেট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, তারকাদের অন্য মাধ্যমে সরে যাওয়া এবং দর্শক হারানো-রয়ে গেছে।
ফলে আজকের বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তারকা শূন্যতা। একসময় যাদের ঘিরে নাটক, সিনেমা কিংবা অনুষ্ঠানের বাজার তৈরি হতো, তাদের অনেকেই নেই; যারা আছেন, তাদেরও বড় অংশ আগের মতো নিয়মিত নন। নতুন মুখ আসছে, নতুন ওটিটি কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, মঞ্চও সক্রিয়-কিন্তু সেই সর্বব্যাপী তারকা-সংস্কৃতি এখনো ফিরে আসেনি।
রাজনীতি বদলেছে, সরকার বদলেছে; কিন্তু বিনোদন শিল্পের পুনর্গঠন এখনো অসম্পূর্ণ। আড়ালে চলে যাওয়া শিল্পীরা কে কখন ফিরবেন, বিদেশে থাকা তারকারা আদৌ ফিরবেন কি না, আর নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা পুরোনো তারকা-শূন্যতা কতটা পূরণ করতে পারবেন-এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো ঠিক করবে, বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গন আবার কবে তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে।
