সোশ্যালমিডিয়া থেকে মেইনস্ট্রিমে অভিনয়ে কতটা সফল তারা
Advertisement
সাহিদ আহমেদ
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় অভিনয়ে আসতে হলে অডিশনের লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হতো, থিয়েটারে বছরের পর বছর ঘাম ঝরাতে হতো। এখন অনেকের শুরু হয় হাতের মুঠোফোনের পর্দা থেকে। ১৫ সেকেন্ডের একটি টিকটক ভিডিও, ইউটিউবের একটি শর্টস বা ফেসবুক রিলস হঠাৎ ভাইরাল হয়ে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই ইনবক্সে আসে নাটকের প্রস্তাব, বিজ্ঞাপনের ডাক, কখনো সিনেমার অফারও। এখনকার পরিচালক ও প্রযোজকরা শুধু অভিনয়ের দক্ষতা দেখেন না, দেখেন কার ফলোয়ার কত, কার ভিডিওতে ভিউ কেমন। প্রশ্ন হলো, এই জনপ্রিয়তা কি প্রতিভার প্রমাণ, নাকি বাণিজ্যিক হিসাবের নতুন সমীকরণ?
* দরজা খুলে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অভিনয়ের নতুন প্রবেশদ্বার। অনেক পারফর্মাররাই সেখান থেকে উঠে এসেছেন। এরমধ্যে সালমান মুক্তাদিরকে বলা হয় ইউটিউবের পথপ্রদর্শক। তিনি ইউটিউবে ভিডিও বানানো শুরু করেন ২০১২ সালে। তার কর্মজীবনের শুরুতে মূলত মজার শর্ট ফিল্ম, প্যারোডি ভিডিও, গান এবং সমাজের প্রচলিত নানা অসংগতি বা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মজার ভিডিও দিয়ে ভাইরাল হওয়ার পর তিনি টিভি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান। ওই সময়ে সালমান বলেছেন, ইউটিউব-ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ায় পরিচালক নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহর কাছে তার ভিডিও খুব ভালো লাগে এবং ফেসবুক আইডিতে নক দিয়ে নাটকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। সালমান শুরুতে সেটা প্রথমে প্রত্যাখ্যানও করেছিলেন। কারণ তখন তিনি ইউটিউবের জন্য কনটেন্ট বানানো নিয়েই বেশ ব্যস্ত ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত বান্নাহর নাটকে কাজ করেছিলেন সালমান মুক্তাদির। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী টিকটকে তার ৬ লাখ ৬৯ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। ইউটিউবে ফলোয়ার সংখ্যা ১০ লাখ ৬৯ হাজার। ফেসবুকে ফলোয়ার রয়েছে ৪৮ লাখ এবং ইনস্টাগ্রামেও রয়েছে ১৮ লাখেরও অধিক। এরপর সালমান মুক্তাদিরের পথ ধরে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সামিরা খান মাহি, আরোহী মিম, প্রত্যই হিরণ, সুমাইয়া রিমু, শায়লা সাথী, মিরাজ খান, অনামিকা ঐশীসহ আরও অনেকে। তারাও পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে মেইনস্ট্রিমে উঠে আসেন। কাজ শুরু করে অভিনয়ে।
* তাদের কেন নিয়েছেন নির্মাতারা
বিনোদন পাড়ায় ভিউ বাণিজ্যের খবর প্রতিনিয়তই শোনা যায়। পরিচালকরা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফলোয়ার দেখে কাস্টিং কল করেন। এদিকে, সাধারণ দর্শকদের কাছেও তাদের তুমুল চাহিদা থাকার কারণে পরিচালক-প্রযোজকদের কাছেও গুরুত্ব পায় তারা। দর্শক চাহিদা যত বেশি তত আয়ের সুযোগ বাড়ার কারণে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোও তাদেরকে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ দেখায়।
* মেইনস্ট্রিমে এসে কতটা সাফল্য পেয়েছেন
▶ সামিরা খান মাহি : টিকটকে ৫৬ লাখের বেশি ফলোয়ার নিয়ে তিনি টিকটক প্ল্যাটফর্মে অন্যতম শীর্ষ তারকা হিসাবে পরিচিতি পান। ফেসবুকে ৩২ লাখ ও ইনস্টাগ্রামে রয়েছে তার ১৩ লাখ ফলোয়ার। সোশ্যাল মিডিয়ার এই আকাশচুম্বী ভিউ ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নাট্যজগতে প্রবেশ করেন। যদিও মাহি এ বিষয়ের বক্তব্যে বলেন, আমি টিকটক শুরুর আগে মডেলিংয়ে যুক্ত ছিলাম। কোভিড মহামারির সময় টিকটক শুরু করি। অবশ্য তার জনপ্রিয়তা আসেই টিকটক থেকেই। এখন অবদি আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই জনপ্রিয়তা ধরে রেখে অভিনয় করছেন।
▶ আরোহী মিম : টিকটকে ৮৩ লাখ ও ইনস্টাগ্রামে ১২ লাখ ফলোয়ার এবং ফেসবুকে রিইলস ও শর্ট ভিডিওর মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। হালকা পাতলা গড়নের এ সুন্দরী বর্তমানে টিকটক থেকে অভিনয়ে এসে একের পর এক নাটকে প্রধান চরিত্রে কাজ করছেন।
▶ প্রত্যয় হিরণ : ইউটিউবে ‘আজাইরা লিমিটেড’ চ্যানেলে ফানি ও রোস্টিং ভিডিও বানিয়ে কোটি কোটি ভিউ অর্জন করেন। টিকটকে তার ৫ লাখ ফলোয়ার। ফেসবুকে ১৫ লাখ, ইন্সটাগ্রামে ৫ লাখের অধিক এবং ইউটিউবে ৪০ লাখের অধিক ফলোয়ার রয়েছে। প্রত্যয় হিরণ এবং তার দুই সহকর্মী রায়হান ও হামিদকে ভিডিও এবং নাটকে অনলাইন জুয়ার প্রচারণার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, ইউটিউব ড্রামা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
▶ সুমাইয়া রিমু : টিকটকে তার ১৯ লাখ ফলোয়ার থাকলেও বর্তমানে তার একাউন্টটি ব্যান অবস্থায় রয়েছে। ফেসবুকে একাধিক পেজ থাকায় তার সঠিক ফলোয়ার নিশ্চিত করা যায়নি। ইউটিউবেও রয়েছে তার আড়াই লাখের বেশি ফলোয়ার। তবে তিনি ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সমালোচিত। বিভিন্ন ধারাবাহিক নাটকে দেখা যায় তাকে। তবে একক নাটকে তার সাফল্য এখনো সেভাবে চোখে পড়েনি।
▶ শায়লা সাথী : ইউটিউব চ্যানেল ‘প্রাংক কিং’ অভিনয়ের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হলেও টিকটকে ২৮ লাখ ফলোয়ার, ইউটিউবে প্রায় ৭ লাখ এবং ইন্সটাগ্রামে ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি অনুসারী রয়েছে তার। তিনিও নিয়মিত প্রধান চরিত্রে নাটক, মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করছেন। তবে সাফল্য মোটামুটি।
▶ মিরাজ খান : টিকটকে ২৫ লাখ ফলোয়ার রয়েছে তার। এ ছাড়াও ইউটিউবে ৭ লাখের অধিক এবং ইনস্টাগ্রামেও রয়েছে প্রায় ৩ লাখ অনুসারী। তিনিও এখন নিয়মিত নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন।
▶ অনামিকা ঐশী : টিকটকের পরিচিত মুখ বরিশালের ঐশী। ফেসবুকে রয়েছে তার ৭ লাখের অধিক ফলোয়ার। টিকটকের রয়েছে তার ৭৭ লাখ ফলোয়ার। ফেসবুকে ৭ লাখের অধিক। ইনস্টাগ্রামে প্রায় ৫ লাখ। ইউটিউবেও প্রায় ৭০ হাজারের কাছাকাছি অনুসারী রয়েছে। তিনি টিকটকের জনপ্রিয়তার কারণে সিনেমায়ও চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। তাকে বেশ কিছু নাটকেও দেখা গেছে। ছোট ক্যারিয়ারে গায়ক আলভির সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর টিকটকার ও মডেল রাসেল খানের সঙ্গে ঘর বেঁধেছেন এ টিকটকার অভিনেত্রী। বর্তমানে তাকে কোনো কাজেই দেখা যাচ্ছে না।
* সাফল্যের ধারবাহিকতা নেই কেন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেলেও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মেইনস্ট্রিমে কাজের সুযোগ পাওয়া এসব ইনফ্লুয়েন্সাররা অভিনয়ে এসে যেন খেই হারিয়ে ফেলছেন। ব্যক্তি জীবন, অশালীন পোশাক, ব্যক্তিত্ব ও ধৈর্য এবং অভিনয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারাই যেন তাদেরকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার বলছেন, ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে যে অভিনয় চলে, ৩০ বা ৪০ মিনিটের নাটকে তা টেকে না। এ বিষয়ে লেখক ও সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট আপেল আকবর বলেন, ‘টিকটকটা মূলত আমাদের দেশে করোনা মহামারির সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। যুবসমাজ অলস সময় কাটাতে টিকটকে রেগুলার হয়। এখান থেকে অনেক সাধারণ চেহারাও পরিচিত চেহারা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে, কয়েক সেকেন্ডের এ অঙ্গভঙ্গি আদতে টিভির পর্দায় টেকে না। আর সিনেমায় তো ভাবাই যায় না। এরপরেও অনেকে মেইনস্ট্রিমে এসে কাজ করছেন। একটি ক্যারেক্টারকে লম্বা সময় ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার যে ক্যাপাবিলিটি, সেটা তাদের নাই। তবে, অনেকে মিউজিক ভিডিওতে ভালো কাজ করছেন। তারা ছোট ছোট মোমেন্টের জন্য ঠিক আছে। মেইনস্ট্রিমে তাদের কেউই স্থায়ী হতে পারেননি। আর যদি সম্ভাবনার কথা বলেন, তাহলে বলব, টিভি ও বড় পর্দায় তাদের সম্ভাবনা নেই। কারণ, বড় ফ্রেমে টিকতে হলে লাগবে ব্যক্তিত্ব ও ধৈর্য। যা আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তাদের মধ্যে পাইনি।’
* তাদের ভবিষ্যৎ কি
বিশ্লেষকদের মতে, সস্তা বিনোদন বা ভাইরাল সংস্কৃতিকে পুঁজি করে যখন নাটক বা সিনেমা নির্মিত হয়, তখন সামগ্রিক ইন্ডাস্ট্রির মান পড়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমের এ জোয়ার সহজে থামবে, এমন লক্ষণ নেই। দর্শক যেখানে, প্রযোজকরাও সেখানে। তাই ভিউ-ফলোয়ারের হিসাব আরও কিছুদিন কাস্টিংয়ের টেবিলে থাকবে বলেই ধারণা সংশ্লিষ্টদের। তবে শেষ পর্যন্তু টিকে থাকার প্রশ্নে ভাইরাল হওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হতে পারে অভিনয়ের সামর্থ্য। ফোনের পর্দায় এক রাতে তারকা হওয়া যায়, কিন্তু বড় পর্দায় জায়গা ধরে রাখতে লাগে অন্য কিছু।
