শিশুশিল্পী থেকে নায়িকা
কে কোথায় কতটা সফল
Advertisement
সাহিদ আহমেদ
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ছোটবেলায় যার মিষ্টি অভিনয়, চঞ্চল চাহনি কিংবা কান্নায় বুঁদ হয়ে থাকত গোটা দেশ, বড় হয়েও কি তিনি দর্শকের মনে সেই একই জাদু ধরে রাখতে পারেন? রুপালি জগতের এই প্রশ্ন চিরন্তন। ঢাকাই সিনেমার সোনালি যুগ কিংবা নাটক থেকে আজকের ওটিটি, প্রায় ছয় দশক ধরে চলছে শিশুশিল্পী থেকে নায়িকা হওয়ার এই ধারা। ক্যামেরার সামনে যাদের শৈশব কেটেছে, বড় হয়ে তাদের সবার গল্প এক হয়নি। কেউ শিশুশিল্পীর খোলস ভেঙে হয়েছেন শীর্ষ নায়িকা, কেউ বেছে নিয়েছেন সংসার ও প্রবাসজীবন, আবার কেউ হারিয়ে গেছেন আড়ালে। শাবানা, ববিতা, সুচরিতা ও অন্তরার পথ ধরে যাত্রা শুরু, সেই পথেই হেঁটেছেন রুমানা রশিদ ঈশিতা, নুসরাত ইমরোজ তিশা, তারিন জাহান, দিলারা হানিফ পূর্ণিমা ও হুমায়ূন-কন্যা শীলা আহমেদ। পরে এসেছেন পূজা চেরী, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, বিদুষী বর্ণিতা, সাদনিমা বিনতে নোমান ও সাফানা নমনি।
* সোনালি যুগের তারকারা
শাবানা আট বছর বয়সে পরিচালক এহতেশামের ‘নতুন সুর’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসাবে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। তখন তার নাম ছিল রত্না। পরে এহতেশামেরই ‘চকোরী’ (১৯৬৭) সিনেমায় তিনি ‘শাবানা’ নামে প্রথমবার নায়িকা হিসাবে আসেন। এরপর প্রায় তিনশ সিনেমায় অভিনয় করেছেন, নায়িকা হিসাবে জিতেছেন ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। প্রায় আড়াই দশক ধরে তিনি অভিনয় থেকে দূরে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
ববিতা ১৯৬৮ সালে জহির রায়হানের ‘সংসার’ সিনেমায় রাজ্জাক ও সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে শিশুশিল্পী হিসাবে প্রথম অভিনয় করেন। ওই সময় তার বয়স ছিল ১৩ বছর। নাম ছিল ফরিদা আক্তার পপি। যদিও তার পরের বছরই মাত্র ১৪ বছর বয়সে পূর্ণাঙ্গ নায়িকা হিসাবে তিনি আবির্ভূত হন ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায়, জহির রায়হানেরই হাত ধরে। তখন নাম হয় ‘ববিতা’। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এ নায়িকার সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ (২০১৪)। অফিসিয়ালি অভিনয় থেকে এখনো তিনি বিদায় নেননি। অপেক্ষা করছেন ভালো গল্প ও চরিত্রের।
বেবী হেলেন, যাকে সবাই সুচরিতা নামে চেনেন, ১৯৬৯ সালে ‘বাবুল’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে পর্দায় আসেন। ১৯৭২ সালে ‘স্বীকৃতি’ সিনেমায় তিনি নায়িকা হন, আর ১৯৭৭ সালের ‘যাদুর বাঁশী’ তাকে জনপ্রিয়তার চূড়ায় তোলে। ১৯৯৭ সালে ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’-এর জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান। এখন মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন, তবে খুব কম।
অন্তরার আসল নাম পারভীন আক্তার লাকী। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘সিরাজউদ্দৌলা’য় প্রবীর মিত্রের মেয়ের চরিত্রে শিশুশিল্পী হিসাবে তাকে দেখা গেছে। ‘বোনের মতো বোন’ ও ‘বেদের মেয়ে জোসনা’য়ও শিশু চরিত্রে অভিনয় করেন। বড় হয়ে ‘পাগল মন’ সিনেমায় মেহেদীর বিপরীতে নায়িকা হন। তবে তার ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়নি, একসময় তিনি খবরের আড়ালে চলে যান। ২০১৪ সালে তিনি মারা যান। পরিবারের দাবি, তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
* ‘নতুন কুঁড়ি’র প্রজন্ম
বিটিভির প্রতিভা অন্বেষণ অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ থেকে উঠে এসেছেন ঈশিতা, তিশা, তারিনের মতো তারকারা। সাত বছর বয়সে ‘দুজনে’ নাটকে শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন রুমানা রশীদ ঈশিতা। বড় হয়ে টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসাবে কাজ করে দীর্ঘদিন। বর্তমানে স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এখন নিয়মিত অভিনয় করেন না।
নুসরাত ইমরোজ তিশা ১৯৯৫ সালে নতুন কুঁড়ির প্রথম স্থান অধিকার করেন, তখন মূলত গান করতেন। ১৯৯৭ সালে ‘সাতপেড়ে কাব্য’ নাটকে শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেন। পরে হন নাটকের শীর্ষ নায়িকা, একশর বেশি নাটকে কাজ করেছেন। ২০০৯ সালে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ দিয়ে সিনেমায় আসেন। এখন অভিনয়ে আগের চেয়ে কম দেখা যায় তাকে।
১৯৮৫ সালে নতুন কুঁড়িতে প্রথম হয়ে ‘এইসব দিন রাত্রি’ নাটকে শিশু চরিত্রে অভিনয় করেন তারিন জাহান। বড় হয়ে ‘কাঁঠাল বুড়ি’ নাটকে প্রথমবার প্রধান চরিত্রে সামনে আসেন। প্রায় তিন দশক নাটকে কাজ করেছেন। তবে এক সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তিনিও পলাতক।
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে শীলা আহমেদ। ‘বহুব্রীহি’ নাটকে শিশু চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পরিচিতি পান। ১৯৯৪ সালের ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমায় ‘অপলা’ চরিত্রের জন্য পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর সম্মান। নাটক ও সিনেমা মিলিয়ে তার কাজ মাত্র ১০টি। বর্তমানে তিনি অভিনয় থেকে দূরে আছেন।
কিংবদন্তি অভিনেতা বুলবুল আহমেদের মেয়ে তাজরিন ফারহানা ঐন্দ্রিলা আহমেদ শিশুশিল্পী হিসাবেই অভিনয়জীবন শুরু করেছিলেন। তিনি মাত্র দেড় বছর বয়স থেকে অভিনয় ও মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হন। শিশুশিল্পী হিসাবে তিনি প্রথম বিটিভির ‘দোলা’ নাটকে অভিনয় করেন। এরপর বড় হয়ে নাটকের নায়িকা চরিত্রেও তাকে দেখা গেছে বহুবার। গানের জগতেও রয়েছে তার বিচরণ। বর্তমানে অভিনয় থেকে দূরে আছেন তিনি।
* ঢালিউডে পূর্ণিমা, পূজা ও দীঘি
ঢাকাই সিনেমায় জনপ্রিয় নায়িকা দিলারা হানিফ পূর্ণিমাও শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেছেন। তিনি নায়িকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার আগে ‘শত্রু ঘায়েল’ নামের একটি সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালে জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ‘এ জীবন তোমার আমার’ সিনেমায় রিয়াজের বিপরীতে মাত্র ১৪ বছর বয়সে (নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়) তিনি নায়িকা হিসাবে অভিষিক্ত হন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আগের মতো ব্যস্ত না হলেও এখনো তিনি ক্যামেরার সামনে সক্রিয়।
‘ভালোবাসার রং’, ‘তবুও ভালোবাসি’, ‘মোস্ট ওয়েলকাম’ সিনেমায় শিশুশিল্পী ছিলেন পূজা চেরী। ২০১৮ সালে ‘নূর জাহান’ সিনেমায় নায়িকা হিসাবে অভিষেক ঘটে তার। এরপর ‘পোড়ামন ২’, ‘দহন’, ‘শান’, ‘গলুই’ সিনেমায় অভিনয় করে এ প্রজন্মের প্রতিষ্ঠিত নায়িকাদের একজন হয়েছেন। তার সাফল্যের হার মোটামুটি। এখনো ক্যামেরার সামনে সক্রিয় তিনি।
প্রার্থনা ফারদিন দীঘি ২০০৬ সালে ‘কাবুলিওয়ালা’ সিনেমায় প্রথমবার শিশুশিল্পী হিসাবে পর্দায় আসেন। প্রথম সিনেমা দিয়েই পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এরপর ২০০৮ ও ২০১০ সালে ‘এক টাকার বউ’ ও ‘চাচ্চু আমার চাচ্চু’র জন্য শিশুশিল্পী হিসাবে আরও দুটি পুরস্কার পান। ২০২১ সালে ‘তুমি আছ তুমি নেই’ সিনেমায় দিয়ে নায়িকা হিসাবে অভিষেক হলেও এটি সফল হয়নি। পূর্ণাঙ্গ নায়িকা হওয়ার পর দীঘির সাফল্য বলা যায় তলানীতে। এখন তিনি বিজ্ঞাপন ও প্রচারণামূলক কাজে সময় দিচ্ছেন বেশি।
* নতুন প্রজন্মের তিনজন
তিন বছর বয়সে অভিনয়ে হাতেখড়ি হওয়া বিদুষী বর্ণিতা ২০০৯ সালে বিজ্ঞাপনে কাজ শুরু করেন, ‘গেরিলা’ সিনেমায়ও শিশুশিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন। চ্যানেল আইতে প্রচারিত রিয়েলিট শো ‘লাক্স সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায় ২০২৫ সালের আসরে চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। এরপর শিহাব শাহীনের ‘ক্যাফে আমব্রেলা’র ‘নিউলি ম্যারেড’ ওয়েব ফিল্মের মাধ্যমে প্রথমবার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। বর্তমানে একাধিক প্রজেক্টের সঙ্গে জড়িত তিনি।
বর্তমান প্রজন্মের নাটকের অভিনেত্রী সাদনিমা বিনতে নোমান প্রায় দেড় যুগ আগে বিজ্ঞাপনে শিশুশিল্পী হিসাবে কাজ শুরু করেন। বড়বেলায় তার প্রথম অভিনীত নাটক ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য’। ২০২৫ সালের ভালোবাসা দিবসে প্রচারিত এ নাটকে তিনি একটি পার্শ্বচরিত্রে (জুঁই) অভিনয়ের মাধ্যমে ছোট পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন। তবে মূল বা প্রধান চরিত্রে তার অভিনীত প্রথম নাটক হচ্ছে ‘গোল্ডফিশ’, এটি বাংলাভিশনে প্রচার হয়েছিল।
নাটকের আরেক অভিনেত্রী সাফানা নমনি বিজ্ঞাপনের কাজ দিয়ে শিশুশিল্পী হিসাবে যাত্রা শুরু করেন। রায়হান রাফী পরিচালিত ‘পোড়ামন ২’ সিনেমায় চিত্রনায়িকা পূজা চেরীর ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া শৈশবে শাকিব খানের সঙ্গে ‘লাভ ২০১৪’ সিনেমার শুটিংয়েও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি নাটকে নায়িকা হিসাবে অভিনয় করছেন। দীপ্ত টিভির ‘মাশরাফি জুনিয়র’ নাটকে তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেও বেশ প্রশংসিত হন। ‘দানব’ নামে একটি সিনেমায় নায়িকা হিসাবে অভিষেক হওয়ারও কথা রয়েছে তার।
