সিনেমার বাজেট বনাম আয়ের বাস্তবতা
প্রযোজকের হাতে আসে কত টাকা
ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায়ই শোনা যায়, একটি সিনেমা কয়েক কোটি টাকা ব্যবসা করেছে। হাল সময়ে এই সংখ্যাটা ৫ কোটি থেকে ৪০ কোটিতে গিয়েও ঠেকেছে! এসব খবর ইন্ডাস্ট্রির জন্য নিঃসন্দেহে বড় এবং শুনতে বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু এই ৫ কিংবা ৪০ কোটি টাকার কতটা প্রযোজকের? কতটা গেছে প্রেক্ষাগৃহের মালিকের কাছে, কতটা পরিবেশকের, আর কতটা কেটে গেছে কর, প্রচারণা ও অন্যান্য খরচে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-প্রযোজকের ঘরে শেষ পর্যন্ত কত টাকা ফিরেছে? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিনেমার পোস্টার, ট্রেলার কিংবা গণমাধ্যমের বরাতে প্রায়ই শোনা যায় ‘কোটি টাকার ব্যবসা’র কথা। কিন্তু সিনেমার অর্থনীতির আসল গল্পটি শুরু হয় সেই সংখ্যার পরই। কারণ বক্স অফিসের মোট বিক্রি আর প্রযোজকের আয় এক নয়। একটি সিনেমার টাকা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত যে অঙ্কটি প্রযোজকের হাতে ফেরে, সেটিই প্রকৃত হিসাব।
বাংলাদেশের সিনেমায় এই হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিনেমার বাজেট, প্রেক্ষাগৃহের টিকিট বিক্রি, প্রযোজক-প্রদর্শকের ভাগ, পরিবেশকের কমিশন কিংবা ডিজিটাল স্বত্ব বিক্রির তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই এক জায়গায় পাওয়া যায় না। ফলে কোনো সিনেমা লাভ করেছে, নাকি লোকসান দিয়েছে-তা বোঝার জন্য দর্শককে অনেক সময় বিচ্ছিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
* টাকা খরচের যাত্রা যেভাবে শুরু
একটি সিনেমার অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ক্যামেরা চালুর আগেই। গল্প, চিত্রনাট্য, শিল্পী নির্বাচন, লোকেশন, শুটিং পরিকল্পনা-প্রতিটি ধাপেই অর্থ ব্যয় হয়।
ধরা যাক, ৫০ লাখ টাকা বাজেটের একটি সিনেমা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে ৩ লাখ টাকা প্রি-প্রোডাকশন, ১৬ লাখ শিল্পী ও কলাকুশলী, ১৮ লাখ শুটিং, ৭ লাখ পোস্ট-প্রোডাকশন এবং ৩ লাখ অন্যান্য খাতে ব্যয় হলো। বাকি ৩ লাখ টাকা প্রচারণা ও মুক্তির প্রস্তুতিতে গেল। অর্থাৎ ‘৫০ লাখ টাকার সিনেমা’ বললেও পুরো ৫০ লাখ টাকা ক্যামেরার সামনে ব্যয় হচ্ছে না। গল্প থেকে মুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচের আলাদা গন্তব্য রয়েছে।
বাজেট বাড়লে এই চিত্র আরও বড় হয়। ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার সিনেমায় শিল্পীর পারিশ্রমিক, শুটিংয়ের দিনসংখ্যা, লোকেশন, সেট, পোস্ট-প্রোডাকশন ও প্রচারণার খরচ বাড়তে পারে। আর ৩ কোটি টাকার বড় বাজেটের সিনেমায় তারকা, অ্যাকশন, বড় সেট, ভিএফএক্স কিংবা বিদেশি লোকেশন যুক্ত হলে নির্মাণ ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
* প্রেক্ষাগৃহেই কি পুঁজি ফেরে?
এখানেই আসে সিনেমা ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব-প্রেক্ষাগৃহ। ধরা যাক, একটি সিনেমার টিকিট বিক্রি থেকে মোট ২ কোটি টাকা এল। এই ২ কোটি টাকা কিন্তু প্রযোজকের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে না। চুক্তি অনুযায়ী প্রদর্শক, পরিবেশক ও প্রযোজকের মধ্যে অর্থ ভাগ হতে পারে। এর সঙ্গে কর বা অন্যান্য কর্তনও থাকতে পারে। এ কারণে সিনেমা ব্যবসায় ‘গ্রস বক্স অফিস’ এবং ‘প্রযোজকের প্রকৃত আয়’ আলাদা করে দেখা জরুরি।
ধরা যাক, উদাহরণ হিসাবে মোট টিকিট বিক্রির ৪৫ শতাংশ প্রযোজক-পরিবেশক অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হলো। ২ কোটি টাকার বিক্রিতে সেই অংশ হবে ৯০ লাখ টাকা। আবার পরিবেশকের কমিশন বা সংশ্লিষ্ট ব্যয় থাকলে প্রযোজকের হাতে থাকা অর্থ আরও কমতে পারে। অর্থাৎ সংবাদে যদি লেখা হয়, ‘সিনেমাটি ২ কোটি টাকা আয় করেছে’, তখন প্রশ্নটি হওয়া উচিত-২ কোটি টাকা গ্রস বিক্রি, নাকি প্রযোজকের হাতে আসা ২ কোটি?
দুটিকে এক করে দেখলে পুরো অর্থনৈতিক চিত্রই বদলে যায়।
* ছোট বাজেট, বড় ঝুঁকি
এবার একটি কাল্পনিক হিসাব দেখা যাক।
৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে একটি সিনেমা তৈরি হলো। সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মোট ৮০ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি করল। উদাহরণ হিসাবে ৪৫ শতাংশ প্রযোজক-পরিবেশক অংশ ধরলে তাদের কাছে আসবে ৩৬ লাখ টাকা। সিনেমাটির ওটিটি, টেলিভিশন ও অন্যান্য স্বত্ব থেকে আরও ২৫ লাখ টাকা পাওয়া গেল।
তাহলে মোট ফেরত-প্রেক্ষাগৃহ থেকে থেকে ৩৬ লাখ + অন্যান্য অধিকার থেকে ২৫ লাখ = ৬১ লাখ টাকা।
মোট বিনিয়োগ ৫০ লাখ টাকা হলে কাগজে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১১ লাখ টাকা।
কিন্তু এই হিসাবের মধ্যেও চুক্তিভেদে পরিবেশকের কমিশন, অতিরিক্ত প্রচারণা, মুক্তির ব্যয় বা অন্যান্য কর্তন থাকলে প্রকৃত লাভ কমে যেতে পারে।
* আয় বাড়লেও ঝুঁকিও বাড়ে
মাঝারি বাজেটের একটি সিনেমার উদাহরণ ধরা যাক ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এখানে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নির্মাণে এবং ১৫ লাখ টাকা প্রচারণা ও মুক্তিতে ব্যয় হলো। সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহ থেকে মোট ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি করল। একই উদাহরণে ৪৫ শতাংশ প্রযোজক-পরিবেশক অংশ ধরলে আসে ১ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ওটিটি, টেলিভিশন ও বিদেশি অধিকার স্বত্ব এলো আরও ৭০ লাখ টাকা। তাহলে, মোট ফেরত দাঁড়াল প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে উদ্বৃত্ত প্রায় ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আবারও ধরে নিতে হবে, এটি কেবল মডেল হিসাব।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট-সিনেমার ব্যবসা শুধু প্রেক্ষাগৃহের টিকিটের ওপর নির্ভর করলে বিনিয়োগ ফেরানো কঠিন হতে পারে। অন্যান্য স্বত্ব তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
* বড় ব্যবসা মানেই বড় লাভ নয় সবচেয়ে বড় ভুলটি হয় এখানে। ধরা যাক, একটি সিনেমায় মোট বিনিয়োগ ৩ কোটি টাকা। সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে ৪ কোটি টাকার টিকিট বিক্রি করল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এক কোটি টাকা লাভ হয়েছে। কিন্তু উদাহরণ হিসাবে ৪৫ শতাংশ প্রযোজক-পরিবেশক অংশ ধরলে ৪ কোটি টাকার মধ্যে তাদের অংশ হবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ওটিটি, টেলিভিশন ও বিদেশি স্বত্ব থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এলো। মোট ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ হলো ২০ লাখ টাকা।
* প্রেক্ষাগৃহের হলের বাইরে এখন আরও বাজার
একসময় সিনেমার অর্থনীতি মূলত প্রেক্ষাগৃহকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। এখন সিনেমার দ্বিতীয় জীবন শুরু হয় প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হওয়ার পর। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, টেলিভিশন সম্প্রচার, বিদেশি পরিবেশনা, ডিজিটাল স্বত্ব-সবই একটি সিনেমার সম্ভাব্য আয়ের উৎস।
ধরা যাক, একটি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহ থেকে প্রত্যাশিত আয় করতে পারেনি। কিন্তু তার ওটিটি স্বত্ব ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। আবার কোনো সিনেমা দেশে মাঝারি ব্যবসা করলেও বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বাজারে ভালো আয় করতে পারে।
ফলে সিনেমার সাফল্য বিচার করতে শুধু প্রথম সপ্তাহের টিকিট বিক্রির দিকে তাকালে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
* তাহলে লাভ-ক্ষতির আসল হিসাব কী
একটি সিনেমার অর্থনৈতিক ফলাফল বোঝার সহজ সূত্র হতে পারে-প্রেক্ষাগৃহ থেকে পাওয়া অর্থের সঙ্গে ওটিটি, টিভি ও বিদেশি স্বত্ব এবং অন্যান্য আয়ের যোগফল থেকে মোট বিনিয়োগ এবং অতিরিক্ত প্রদর্শন ও পরিবেশনা ব্যয় বাদ দিলে হাতে যে অর্থ থাকে সেটাই প্রযোজকের নিট আয়। এখানে ‘মোট টিকিট বিক্রি’ শুধু একটি ধাপ।
* সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-স্বচ্ছতা কোথায়
বাংলাদেশের সিনেমার অর্থনীতি নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে এ প্রশ্নটিই। একটি সিনেমা কত টাকা খরচ করল, কত টাকার টিকিট বিক্রি হলো এবং প্রযোজকের হাতে শেষ পর্যন্ত কত টাকা গেল-এই তিনটি সংখ্যাকে একসঙ্গে পাওয়া কঠিন।
ফলে ‘হিট’, ‘সুপারহিট’ কিংবা ‘কোটি টাকার ব্যবসা’-এ ধরনের শব্দের আড়ালে প্রকৃত আর্থিক ফলাফল অনেক সময় অস্পষ্ট থেকে যায়।
একটি কার্যকর বক্স অফিস ব্যবস্থায় অন্তত সিনেমাভিত্তিক মোট টিকিট বিক্রি, প্রদর্শিত শো, টিকিটের সংখ্যা, মোট বিক্রি, কর্তন এবং প্রযোজকের প্রাপ্য অর্থের হিসাব আলাদা করা প্রয়োজন।
কারণ দর্শক যখন একটি টিকিট কেনেন, সেই টাকার যাত্রা সেখানেই শেষ হয় না। টিকিটের টাকা যায় প্রেক্ষাগৃহের হিসাবে। সেখান থেকে চুক্তি অনুযায়ী ভাগ যায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে। পরিবেশনার খরচ হয়। এরপর সিনেমার অন্যান্য স্বত্ব বিক্রি হলে সেখান থেকেও টাকা আসে।
অর্থাৎ একটি সিনেমার অর্থনৈতিক যাত্রা আসলে এমন-
গল্প → চিত্রনাট্য → শিল্পী ও কলাকুশলী → শুটিং → পোস্ট-প্রোডাকশন → প্রচারণা → প্রেক্ষাগৃহ → ওটিটি → টেলিভিশন → বিদেশি বাজার।
এ দীর্ঘ যাত্রার শেষে যে টাকা প্রযোজকের ঘরে ফেরে, সেটিই সিনেমাটির প্রকৃত অর্থনৈতিক ফলাফল বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা।
সুতরাং কোনো সিনেমার পোস্টারে যদি লেখা থাকে-‘৩ কোটি টাকার ব্যবসা’, প্রশ্নটি শুধু ‘কত আয় করেছে?’ এমন হওয়া উচিত নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত-কত টাকা খরচ হয়েছিল? কত টাকা টিকিট বিক্রি হয়েছে? সেই টাকার কতটা কার কাছে গেছে? আর সব হিসাব শেষে প্রযোজকের ঘরে আসলে কত টাকা ফিরেছে?
