Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

ব্যান্ডের গানে নারী শিল্পীদের সংগ্রাম

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের উত্থান শুরু গত শতকের ষাটের দশকে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পপ গান ধীরে ধীরে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে পৌঁছেছে আজকের অবস্থানে। তবে এই সমৃদ্ধ ইতিহাসে নারীদের সুরের লড়াই ছিল স্রোতের বিপরীতে হাঁটার মতো। ব্যান্ড মিউজিকে নারীদের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকার হার পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। আশির দশকে রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সময়ে চট্টগ্রামের কিছু উদ্যমী নারী মিলে প্রথমবার একটি পূর্ণাঙ্গ নারী ব্যান্ড দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। যার নাম ‘ব্লু বার্ড’। সেই শুরু। এরপর দেশে আরও অনেক নারী ব্যান্ড দল তৈরি হয়েছে। এরমধ্যে কেউ টিকে আছে, আবার কেউ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

Advertisement

Icon

সাহিদ আহমেদ

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

ব্যান্ডে নারীদের যাত্রা শুরু সেই ষাটের দশকে। ওই সময় চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করে পারিবারিক ঘরানার অর্কেষ্ট্রা দল বা জিংগা শিল্পীগোষ্ঠী। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে ‘থ্রি হক সিস্টার্স’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন হয়। যাকে নারীদের প্রথম ব্যান্ড হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ব্যান্ডটিতে তিন বোনের অংশগ্রহণ ছিল। বড়বোন সুলতানা হক ব্যান্ডটির ভোকাল ও রিদম গিটারিস্ট, ছোটবোন রোকসানা হক পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতেন। তবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ততা ও পারিবারিক সহযোগিতা না থাকার কারণে তারা বেশিদূর যেতে পারেননি। থেমে যায় থ্রি হক সিস্টার্স-এর পথচলা।

তবে পূর্ণাঙ্গ নারী ব্যান্ডের গল্প শুরু আশির দশকে। ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করে ‘ব্লু-বার্ড’, যার ৯ জন সদস্যই নারী। এটিকে দেশের নারীদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড বলা হয়। ১৯৯৫ সালে প্রকাশ হয় তাদের একমাত্র অ্যালবাম ‘সৈকতে একদিন’। একটি মাত্র অ্যালবাম সফলতার মুখ দেখলেও পারিবারিক চাপ ও জীবনের তাগিদে অনেকে দলে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। ব্যান্ডটির মূল সদস্যরা প্রত্যেকেই নিজেদের পেশা ও সংসারে ব্যস্ত থাকলেও প্রত্যেকের সঙ্গে দীর্ঘ ৪ দশকের পথচলায় যোগাযোগ রয়েছে। অনিয়মিত হলেও ব্লু-বার্ড টিকে আছে। সম্প্রতি ইউটিউব ও তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক একাউন্টে ‘আবার দেখা হলে’ শিরোনামে গান প্রকাশ করা হয়।

নব্বই-এর দশকে রাজধানীতেও নারীদের ব্যান্ড তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে নিশিতা, রিমি, কান্তা ও রুবানা গড়েন মেয়েদের ব্যান্ড ‘সিলেস্টিয়াল’। তাদের একটি অডিও ক্যাসেট বাজারে আসে, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তারা ব্যান্ডসংগীত থেকে হারিয়ে যান। কেন থেমে গেল দলটি, তা নিয়ে খুব বেশি খোঁজ পাওয়া যায়নি। সদস্যরা এখন কে কোথায়, সে তথ্যও পাওয়া যায়নি।

১৯৯৮ সালে ‘বাংলা’ ব্যান্ডের ভোকাল হিসাবে গান শুরু করেন আনুশেহ আনাদিল। ‘তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা’ গানটি তখন তুমুল জনপ্রিয় হয়। ব্যান্ড ভাঙনের পর ২০১২ সালে আনুশেহ তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রাই’ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব নতুন ব্যান্ড ‘বাহক’ গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে তিনি তার চেনা ঘরানার গানগুলো পরিবেশন করা চালিয়ে যান।

২০০১ সালে খুলনা থেকে যাত্রা শুরু করে লালন ব্যান্ড, যার প্রধান ভোকাল নিগার সুলতানা সুমী। শুরুতে তারা লালনের গান ব্যান্ডের সুরে গাইতেন, পরে যোগ হয় মৌলিক গান। ২০০৭ সালে প্রথম অ্যালবাম ‘বি-প্রতীপ’ প্রকাশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এরপর বহু চড়াই-উতরাই পার করেছে দলটি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৪ সালের মার্চে, যখন ১৭ বছরের সঙ্গী, দলনেতা ও ড্রামার থেইন হান মং তিতি ব্যান্ড ছাড়ার ঘোষণা দেন। তার অনুপস্থিতিতে ব্যান্ডের কার্যক্রম প্রায় বন্ধই ছিল। তবে কয়েক মাস পর তিনি ফিরে আসেন। তার ফেরার পর প্রকাশিত লাইনআপেও সুমি লিড ভোকাল, আর তিতি ড্রামসে। এভাবে দুই দশকের বেশি সময় ধরে সুমি লালনের মুখপাত্র হয়ে আছেন।

বর্তমানে দেশের আরেক জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘চিরকুট’, যার প্রধান ভোকাল নারী। তিনি শারমিন সুলতানা সুমি। তার পথচলা আবার ভিন্নরকম। শিক্ষার্থী থাকাকালীন ২০০২ সালে তিনি গড়েন ফিউশন রক ব্যান্ড চিরকুট। নামটিও তার দেওয়া। তিনি শুধু প্রধান কণ্ঠশিল্পীই নন, দলের বেশিরভাগ গানের কথা ও সুর তার। ‘জাদুর শহর’সহ আরও অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকারও তিনি। ২৪ বছরের পা দেওয়া ব্যান্ডটির পাঁচ সদস্যের লাইনআপে এখনো তিনিই একমাত্র নারী। ব্যান্ডের বাইরে সিনেমার গানেও তার জায়গা তৈরি হয়েছে। আয়নাবাজি’র ‘দুনিয়া’, ‘ডুব’র ‘আহারে জীবন’ আর ‘ভয়ংকর সুন্দর’র ‘এই শহরের কাকটাও জেনে গেছে’ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। টেলিভিশন সিনেমার ‘কানামাছি’ আর হাবিব ও ন্যান্সির ‘ধীরে ধীরে’ গানের কথাও তার লেখা। প্রথম বাংলাদেশি শিল্পী হিসাবে আন্তর্জাতিক মিউজিক সামিটেও অংশ নেন। দীর্ঘদিনের সফল ক্যারিয়ারে পরেও গানের পাশাপাশি তিনি একটি বিজ্ঞাপন এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী।

দেশের আরেক কণ্ঠশিল্পী দিলশাদ নাহার কনার শুরুটাও ‘অ্যাঞ্জেলস ফোর’ নামক ব্যান্ডের মাধ্যমেই। কনার সঙ্গে দলে ছিলেন নাফিসা, রুমানা ও তিশা। তারা একটি অ্যালবামও বের করেন। নিজেদের বোঝাপড়া কমে যাওয়ায় দলটি ভেঙে যায়। অন্যরা গান থেকে ছিটকে গেলেও কনা একক শিল্পী হিসাবে পথচলা শুরু করেন। এখনো নিয়মিত প্লেব্যাক, জিঙ্গেল ও মঞ্চ অনুষ্ঠান করছেন। করছেন দেশ-বিদেশে স্টেজ শো। তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি নিজের একক একটি পারফর্মিং গানের দল গঠন করেছেন, যার নাম দিয়েছেন ‘কে লিংক’।

ব্যান্ডসংগীতের নারী কণ্ঠের কথা উঠলে মেহরিন মাহমুদ, মিলা ও তিশমার নামও আসে। রকধারার গান আর মঞ্চের দাপটে তাদের ব্যান্ড শিল্পী ভাবা অস্বাভাবিক নয়। অথচ মিলা ও তিশমা কোনো ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন না। একক শিল্পী হিসাবেই তারা রকধারার গানে জায়গা করে নিয়েছেন। অন্যদিকে মেহেরীন বাংলাদেশের আধুনিক পপ-ফিউশন ধারার অন্যতম একজন অগ্রদূত। তিনি মূলত একজন একক শিল্পী হলেও লাইভ কনসার্ট, স্টেজ পারফরম্যান্স এবং টিভি শোর জন্য তার নিজস্ব একটি পারফর্মিং ব্যান্ড রয়েছে, যার নাম ‘আনাড়ি’।

এ ছাড়াও পড়শী একক অ্যালবামের সাফল্যের পর ২০১২ সালে যন্ত্রশিল্পীদের নিয়ে গড়েন ‘বর্ণমালা’। যদিও সেটার ধারাবাহিকতা এখন আর নেই।

এ প্রজন্মের আরেকটি ব্যান্ড ‘লেইসফিতা’ একটি রিয়েলিটি শোয়ের চার বিজয়ীকে নিয়ে গঠিত। এটি বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার অল-ফিমেল (নারী) ব্যান্ড। তারা হলেন সুনন্দা শারমীন, অন্তরা রহমান, ফেরদৌসী মৌমিতা ও মুস্তারিন আহমেদ শীতল। তাদের প্রথম একক গান ‘স্বপ্ন এখন আমার হাতে’ গানটির সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছিল হৃদয় খান। গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও, কোভিড-১৯ মহামারির নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যান্ডটির কার্যক্রম ও কনসার্ট স্থগিত হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে আর নিয়মিতভাবে চালু হয়নি।

এদিকে নতুন প্রজন্মে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে এফ মাইনর, এটি নৃগোষ্ঠীর নারীদের প্রথম ব্যান্ড। নৃগোষ্ঠীর পুরুষ শিল্পীদের একাধিক ব্যান্ড আগে থেকেই ছিল, কিন্তু নারীদের দল এটাই প্রথম। ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এ দল এখন ৫ সদস্যের। এদের মধ্যে চারজন গারো ও একজন মারমা সম্প্রদায়ের। প্রধান ভোকালিস্ট পিংকি চিরান; তার সঙ্গে সাইড ভোকালিস্ট নাদিয়া রিছিল, যিনি গিটার ও উকুলেলেও বাজান। লিড গিটারে আছেন গ্লোরিয়া মান্ডা, কিবোর্ডে একিউ মারমা, আর ড্রামসে দিবা চিছাম। দলের প্রথম মৌলিক গান ‘জংলা ফুল’।

তবে দেশের ব্যান্ড মিউজিকে নারীদের স্বল্পমাত্রায় উপস্থিতি থাকলেও এ মাধ্যটি এখনো নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি বলেই সংশ্লিষ্টদের অভিমত। কেন, সেটা বলতেও নারাজ অনেকে।

ব্যান্ড সংগীতে নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ব্যান্ডগুলোর গঠনের পর হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ মনে করা হয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবার ও নিরাপত্তাজনিত বাধা, নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগের অভাব এবং পেশাগত অবকাঠামোর দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে নারী শিল্পীদের ব্যান্ড সংগীতকে পেশা হিসাবে নেওয়ার বিষয়টি পরিবার ও সমাজ সহজভাবে নেয় না। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, নিয়মিত শো, প্রযোজনা ও প্রচারের সুযোগ কম থাকায় অনেক প্রতিভাবান নারী ব্যান্ড শুরু হওয়ার পরও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে না বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ব্যান্ডের গানে নারী শিল্পীদের সংগ্রাম

ব্যান্ডের গানে নারী শিল্পীদের সংগ্রাম

মেরিলিন মনরোর উত্তরসূরি সিডনি সুইনি!

মেরিলিন মনরোর উত্তরসূরি সিডনি সুইনি!

কনকচাঁপার সহশিল্পী ছিলেন সালমান শাহ

কনকচাঁপার সহশিল্পী ছিলেন সালমান শাহ

টুকরো খবর ‘দ্য মিরর’ নিয়ে ব্যস্ত লাবনী

‘দ্য মিরর’ নিয়ে ব্যস্ত লাবনী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম