Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

এফডিসি কি আবারও সিনেমার কেন্দ্র হতে পারবে

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন-বিএফডিসি, বিনোদন অঙ্গনে পরিচিত ‘এফডিসি’ নামে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠান একসময় ছিল ঢাকাই সিনেমার প্রাণকেন্দ্র। শুটিং ফ্লোরে ক্যামেরা, লাইট আর অ্যাকশনের ব্যস্ততা, তারকাদের আনাগোনা, সেট নির্মাণ থেকে সম্পাদনা-সিনেমা নির্মাণের নানা আয়োজন মিলিয়ে এফডিসি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফিল্ম সেন্টার’। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সিনেমা নির্মাণের ধরন, এসেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, গড়ে উঠেছে বেসরকারি স্টুডিও। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি এখন নানা সংকটে। প্রশ্ন উঠেছে, এফডিসি কি আবারও বাংলাদেশের সিনেমার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হতে পারবে? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

Advertisement

Icon

আনন্দনগর প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একসময় এফডিসির ফ্লোরগুলোতে একসঙ্গে একাধিক সিনেমার শুটিং চলত। শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো প্রাঙ্গণ। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এফডিসির কয়েকটি শুটিং ফ্লোরের ছাদ ও দেওয়াল ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও মেকআপ রুমের সরঞ্জাম অব্যবহৃত পড়ে আছে। এরমধ্যে আবার তিনটি ফ্লোর ভেঙে শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় শুটিংয়ের জায়গাও আগের তুলনায় অনেকে কমেছে। বর্তমানে কার্যকর ফ্লোর রয়েছে পাঁচটি; এর মধ্যে ছয় নম্বর ফ্লোর ব্যবহৃত হচ্ছে স্টোর হিসাবে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেখানে প্রায় ২০টি সিনেমার শুটিং হয়েছে। তাও আবার মাত্র অল্প কিছু অংশের। এখন সিনেমার প্রায় পুরোটারই শুটিং হয় বাইরে।

এফডিসির বর্তমান অবকাঠামোর এ দুরবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি। ক্যামেরা, শব্দ ধারণ, সম্পাদনা ও পোস্ট-প্রোডাকশনের যন্ত্রপাতি নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় নির্মাতাদের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির জন্য নতুন কোনো যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। কয়েকটি ক্যামেরা অচল, সাউন্ড মিক্সিংয়ের যন্ত্রপাতি ও সম্পাদনা-সুবিধাও সমস্যাগ্রস্ত। ফলে উন্নত প্রযুক্তিতে কাজ করতে আগ্রহী নির্মাতাদের বাইরে থেকে যন্ত্রপাতি ভাড়া করতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে নির্মাতাদের কাছে এফডিসির চেয়ে বেসরকারি স্টুডিও অনেক সময় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ঢাকার বিভিন্ন শুটিং হাউস ও স্টুডিওতে তুলনামূলক কম খরচে ফ্লোর, আলো, ক্যামেরা এবং অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে কর্তৃপক্ষ এফডিসির ফ্লোর ও যন্ত্রপাতির ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তাতে খুব বেশি একটা সাড়া মেলেনি। নির্মাণসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শুধু ভাড়া কমালেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ কারিগরি জনবল নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সেদিকে নজর খুব একটা নেই বললেই চলে।

তরুণ নির্মাতারা বলছেন, এফডিসিকে কার্যকর করে তোলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেক নতুন নির্মাতা নিজেদের প্রযোজনাতেই কাজ শুরু করতে আগ্রহী। কিন্তু সেখানে বাজেট থাকে স্বল্প। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে এফডিসি যদি সাশ্রয়ী ভাড়ায় শুটিং, সম্পাদনা, শব্দ সংযোজন ও অন্যান্য কারিগরি সুবিধা দিতে পারে, তাহলে স্বাধীন ও পরীক্ষামূলক সিনেমা নির্মাণের সুযোগ বাড়বে বলেই তাদের বিশ্বাস। প্রসঙ্গক্রমে নির্মাতা রায়হান রাফী নতুনদের মেধা বিকাশের সুযোগ করে দিয়ে এফডিসির ভূমিকার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ভালো সিনেমা নির্মাণে শুধু বড় বাজেট নয়, সৃজনশীলতা ও দক্ষ নির্মাণও জরুরি। সেই সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার মতো সুযোগ এফডিসিকে তৈরি করে দিতে হবে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

এফডিসির এমন রুগণ দশার কারণে এখানে সিনেমা নির্মাণের হার এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। বরং অনেকে এখন গুলশানের নিকেতনকেই এফডিসির বিকল্প ভাবতে শুরু করেছেন। কারণ, সেখানে বেশকিছু অত্যাধুনিক স্টুডিও রয়েছে। রয়েছে তরুণ ও মেধাবী নির্মাতাদের আনাগোনা। তবে এফডিসির সম্ভাবনা অবশ্য একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এর নিজস্ব জমি, শুটিংয়ের জায়গা, কারিগরি অবকাঠামো এবং সিনেমা নির্মাণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নগরীতে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। যদিও তার আনুষ্ঠানিক কোনো রূপরেখা সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি তখন। সিনেমাসংশ্লিষ্টদের অভিমত, সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা তৈরি এবং তা বাস্তবায়িত হলে শুটিং থেকে শুরু করে সম্পাদনা, ডাবিং ও পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ একই জায়গায় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি।

এ ক্ষেত্রে চলমান এফডিসিতে নির্মাণাধীন শপিং কমপ্লেক্স প্রকল্পটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল নাগাদ প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র প্রায় ৫০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজের দীর্ঘসূত্রতা শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বিলম্বিত করছে না, প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাকেও পিছিয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান ফ্লোর ও যন্ত্রপাতি সচল রাখার উদ্যোগ না নিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনও আসবে না বলে বিজ্ঞদের অভিমত।

শুধু এফডিসি নয়, সরকারি অনুদানও ঢাকাই সিনেমাশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছর নতুন সরকারের সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছিলেন, আগামী অর্থবছরে সিনেমায় অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলো টিকিয়ে রাখা ও আধুনিকায়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগের কথাও তিনি বলেছিলেন। যদিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে তার বিদায়ের পর এ কার্যক্রমটি কতটা এগিয়েছে, তার স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এটা ঠিক যে, অনুদানের অর্থ সময়মতো ছাড়, স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্মাণকাজ শেষ করার কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে নতুন নির্মাতারা উপকৃত হবেন। তবে অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি সেগুলো দর্শকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করতে হবে।

সিনেমাসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শুধু এফডিসিকে আধুনিকায়ন করলেই হবে না, প্রতিষ্ঠানটির হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে হলে জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের এফডিসিমুখী করতে হবে। তাদের অংশগ্রহণও এফডিসিকে ঘিরে নতুন আগ্রহ তৈরি করতে পারে। পরিচিত শিল্পীদের উপস্থিতিতে এখানে নিয়মিত সিনেমা, বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য দৃশ্যধারণের আয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহার বাড়বে। তবে তারকাদের উপস্থিতি কিংবা স্মৃতিনির্ভর আবেগ দিয়ে একে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন পরিবেশ, যেখানে শিল্পী ও কলাকুশলীরা নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে পারবেন। শিল্পীদের মতামত গ্রহণ করে সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন ঘটানোও জরুরি।

এফডিসির ভবিষ্যৎ তাই শুধু একটি পুরোনো প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের সিনেমা নির্মাণব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য ও প্রতিযোগিতামূলক করার প্রশ্ন। বেসরকারি স্টুডিওর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এফডিসিকে সেবার মান, ব্যয় ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ নির্মাতাদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ, আধুনিক পোস্ট-প্রোডাকশন সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং সিনেমাবিষয়ক গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকারি অনুদান, উন্নত অবকাঠামো ও প্রেক্ষাগৃহ আধুনিকায়নের উদ্যোগকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে পারলে সিনেমার পুরো ব্যবস্থাই উপকৃত হবে।

এটা ঠিক, এফডিসির হারানো ব্যস্ততা ফিরিয়ে আনা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। ঐতিহ্য তার শক্তি, আর আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা হতে পারে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার। শেষ পর্যন্ত শুধু এফডিসি আবার সিনেমার কেন্দ্র হবে কি না, প্রশ্ন তা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটি সময়ের দাবি বুঝে নিজেকে বদলাতে পারবে কি না, এটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন ঘটলেই হয়তো একদিন আবারও এফডিসি ভরে উঠবে লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের শব্দে, আর তার সঙ্গে ফিরবে বাংলাদেশের সিনেমার নতুন সম্ভাবনা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

এফডিসি কি আবারও সিনেমার কেন্দ্র হতে পারবে

এফডিসি কি আবারও সিনেমার কেন্দ্র হতে পারবে

নেটফ্লিক্সে ছাঁটাইয়ের শঙ্কা চাকরি হারাতে পারেন ৮০০ কর্মী

চাকরি হারাতে পারেন ৮০০ কর্মী

একক নাটকের পর ধারাবাহিকেও প্রশংসিত তটিনী

একক নাটকের পর ধারাবাহিকেও প্রশংসিত তটিনী

ফের একসঙ্গে তারা

ফের একসঙ্গে তারা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম