শারদীয় উৎসবে নেই বড় সিনেমা
বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় উৎসবগুলোকে ঘিরে বিনোদনকেন্দ্রিক যে আমেজ তৈরি হয়, তার একটি বড় অংশজুড়ে থাকে সিনেমা। বিশেষ করে মুসলিমদের দুটি ধর্মীয় উৎসব-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে ঘিরে ঢাকাই সিনেমার বিগ বাজেট, তারকাবহুল প্রযোজনা ও প্রেক্ষাগৃহের কোটি টাকার ব্যবসার মূল বাজারটি আবর্তিত হয়। তবে সমপরিমাণ সরকারি ছুটি ও আমেজ থাকা সত্ত্বেও শারদীয় দুর্গোৎসবে প্রেক্ষাগৃহে বিগ বাজেটের কোনো সিনেমা কিংবা শীর্ষ তারকাদের উপস্থিতি না থাকা এক স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা নিয়েই বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
সাহিদ আহমেদ
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কদিন পরই সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় আয়োজন শারদীয় দুর্গোৎসব। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের সিনেমাঙ্গনেও শুরু হয়েছে পূজার আমেজ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের দুর্গাপূজায় ‘সাবা’, ‘স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’ এবং ‘উদীয়মান সূর্য’ নামে তিনটি সিনেমা মুক্তি পেলেও ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা কাঙ্ক্ষিত দর্শক টানতে সেগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, চলতি বছরের দুর্গাপূজায়ও প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির তালিকায় রয়েছে তিনটি দেশীয় সিনেমা-রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্য ঘটনা নিয়ে নির্মিত ‘চিরকুট’ (অভিনয়ে শ্যামল মাওলা ও আজিজুন মীম), পারিবারিক ও অ্যাকশননির্ভর ‘স্নেহের বন্ধন’ (অভিনয়ে জয় চৌধুরী ও মৌ খান) এবং পোশাকখাতের ঝুট ব্যবসানির্ভর ‘কাট-পিস’ (অভিনয়ে সিফাত আমিন শুভ ও নানজীবা তোরসা)। এসব সিনেমায় নেই কোনো বড় তারকা। নির্মাতাদের দাবি অনুযায়ী শুধু গল্প ও নির্মাণের ওপর ভর করেই এগুলো মুক্তি পাচ্ছে। যেখানে ঈদে কোটি টাকার বাণিজ্য ও তারার মেলা বসে, সেখানে দুর্গোৎসবে কেন বড় বাজেটের কোনো সিনেমা থাকে না-এ প্রশ্ন আসাটা অস্বাভাবিক নয়।
গত ১০ বছরের পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঈদ উৎসবই ছিল ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে বড় ও লাভজনক ব্যবসায়িক মৌসুম। ঈদের বাজারটি মূলত শাকিব খানের মতো তারকা ও একাধিক নির্মাতার একক আধিপত্যে থেকেছে। ২০১৬ সালে শাকিব খান ও শ্রাবন্তী অভিনীত ‘শিকারি’ সিনেমা দিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়, তা ২০১৭ সালের ‘নবাব’ ও ‘রাজনীতি’, ২০১৮ সালের ‘পোড়ামন-২, ২০২২ সালের ‘পরাণ’ ও ‘দিন-দ্য ডে’, ২০২৩ সালে ‘প্রিয়তমা’ ও ‘সুড়ঙ্গ’, ২০২৪ সালে ‘তুফান’, ২০২৫ সালে ‘বরবাদ’, ‘জংলি’ ‘তাণ্ডব’, ‘ইনসাফ’ দিয়ে আরও বেগবান হয়।
এমনকি চলতি বছর রোজা এবং কুরবানির ঈদেও ‘দম’, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এবং ‘রাক্ষস’-এর মতো বড় সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। যদিও এ বছর ঈদে পর্যাপ্ত দর্শকখরা দেখা দেয় এবং শাকিব খানের মতো তারকার ‘প্রিন্স’ নামে একটি সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়লেও বড় বাজেটের মূল প্রযোজনা ও তারকাদের উপস্থিতি ঈদকেন্দ্রিকই থেকে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের মতো দীর্ঘ সরকারি ছুটির আমেজ থাকলেও দুর্গাপূজায় বড় বাজেট কিংবা বড় তারকার সিনেমা না আসার পেছনে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিকাঠামোগত একাধিক সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। সিনেমা ব্যবসার প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রেক্ষাগৃহের দর্শক। ঈদে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি দেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষ একযোগে প্রেক্ষাগৃহে যান, যা সিনেমাশিল্পকে একটি ‘বিশেষ বাজার’ এনে দেয়। অন্যদিকে, দুর্গা উৎসবের আমেজ মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে বেশি সীমাবদ্ধ থাকে, যারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। বড় বাজেটের কোনো সিনেমার কোটি কোটি টাকার মূলধন ও মুনাফা তুলে আনতে যে বিশাল দর্শক সমাগম প্রয়োজন, তা শুধু এই নির্দিষ্ট বা ‘বিশেষায়িত বাজার’ থেকে তুলে আনা অসম্ভব।
অন্যদিকে ঈদ এবং পূজার উৎসব উদ্যাপনের সামাজিক সংস্কৃতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঈদের দিনে নামাজ ও শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে দুপুরের পর কিংবা পরে ছুটির দিনগুলোয়ও প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখা কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের একটি প্রধান সামাজিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুর্গাপূজার ছুটির ৫ দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন, পূজা অঞ্জলি, আরতি এবং নানাবিধ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকার ঘরে ৩ ঘণ্টা সময় কাটানোর চেয়ে উৎসবের আলোকোজ্জ্বল আমেজে মণ্ডপে সময় কাটানোকেই তারা অগ্রাধিকার দেন। এটা অবশ্য বাংলাদেশের চিত্র। ভারতে আবার এ প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সেখানে পূজা উৎসবেও বড় বাজেটের এবং বড় তারকার সিনেমা আসে। সেগুলো দর্শকরাও উৎসাহ নিয়ে দেখেন।
বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহের তীব্র সংকট ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত বাধা। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজারের মতো সচল প্রেক্ষাগৃহ থাকলেও দুই দশকের অব্যাহত লোকসান ও দর্শকখরার মুখে তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিয়মিত সচল প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা মাত্র ৪৮টি (সিঙ্গেল স্ক্রিন ও মাল্টিপ্লেক্স মিলে)। অবাক বিষয় হচ্ছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়িসহ ২৫টি জেলায় কোনো প্রেক্ষাগৃহ চালু নেই।
সাধারণ সময়ে নিয়মিত সচল প্রেক্ষাগৃহ থেকে ঈদ উৎসবে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০ থেকে ১৪০টিতে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশে বড় বাজেটের কোনো সিনেমা লাভজনক করতে হলে একযোগে ১০০টির বেশি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা জরুরি। কিন্তু পূজায় সাধারণ দর্শক কম আসায় এবং বন্ধ থাককা প্রেক্ষাগৃহ চালু না থাকায় নিয়মিত সচল থাকা প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা ঝুঁকি নিতে চান না এবং প্রযোজকরাও লগ্নি হারানো থেকে বাঁচতে পূজায় বড় সিনেমা মুক্তি এড়িয়ে যান। এ ছাড়া পূজার ছুটিতে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ নাটক, টেলিফিল্ম ও ওয়েব সিরিজ প্রচার করে দর্শককে ছোটপর্দায় যুক্ত রাখে। ফলে দর্শকদের একটি বড় অংশ ছোট স্ক্রিনেই বুঁদ হয়ে থাকেন।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, উপযুক্ত গল্প ও সুনির্মিত সিনেমা হলে পূজার মৌসুমেও দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে ফেরেন। যেমন-২০১৮ সালে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘দেবী’ সিনেমাটি দুর্গাপূজার পরপরই মুক্তি পেয়ে বেশ সাড়া ফেলেছিল। এ ছাড়া ২০২১ সালের ‘পদ্মপুরাণ’, ২০২২ সালের ‘অপারেশন সুন্দরবন’ দুর্গাপূজার সময়েই মুক্তি পেয়ে ভালো ব্যবসা করে। অর্থাৎ, দর্শকের ভালোলাগার মতো বিষয়বস্তু ও নির্মাণ থাকলে যে কোনো উৎসবেই প্রেক্ষাগৃহবিমুখ দর্শকদের ফেরানো সম্ভব। সর্বোপরি, ঈদের বাজার যদি হয় কোটি টাকার বড় প্রযোজনা ও নিশ্চিত গণবাজার, তবে দুর্গাপূজা হলো বিশেষ গল্পভিত্তিক সিনেমার একটি সম্ভাবনাময় বিশেষ বাজার। এটা ঠিক যে, ঢালিউডের শীর্ষ তারকারা নিজেদের স্টারডম ও আর্থিক নিরাপত্তার তাগিদেই ঈদের নিরাপদ বাজারকে অগ্রাধিকার দেন। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রেক্ষাগৃহ সচল, জেলাগুলোতে নতুন আধুনিক স্ক্রিন নির্মাণ এবং বিষয়ভিত্তিক মানসম্পন্ন সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটিকেও সিনেমা বাণিজ্যের অন্যতম লাভজনক মৌসুমে রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
