গ্রামীণ সিনেমার জনপ্রিয়তায় ভাটা
বাংলাদেশের সিনেমায় একসময় গ্রামীণ জীবনের গল্প মানেই ছিল দর্শকের আবেগ, হাসি-কান্না, প্রেম, বিরহ আর প্রেক্ষাগৃহে উপচে পড়া ভিড়। গ্রামের মেঠোপথ, জমিদারবাড়ি, হাটবাজার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা সামাজিক অবিচারের গল্পে দর্শক খুঁজে পেতেন নিজেদের জীবন ও পরিচিত মানুষের প্রতিচ্ছবি। নব্বই দশকের শেষ ভাগ থেকে দুই হাজার দশকের শুরুর দিকেও গ্রামীণ পটভূমির সিনেমা ছিল ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ধারা। অথচ সময়ের পরিবর্তনে সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে শহুরে জীবন, অ্যাকশন, থ্রিলার ও আধুনিক প্রেমের গল্প। প্রশ্ন উঠেছে, গ্রামীণ গল্প কি দর্শকের কাছে আবেদন হারিয়েছে, নাকি সেই গল্প বলার ধরনই সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সত্তর আশি তো বটে, নব্বই দশকের শেষ দিকে এমনকি দুই হাজার দশকের শুরুতেও গ্রামীণ গল্পের সিনেমা ছিল জনপ্রিয়। এ জনপ্রিয়তার পেছনে ছিল দর্শকের সঙ্গে গল্পের পরিচিতি। ‘ভাত দে’ ‘সুজন সখী’, ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’, পদ্মা নদীর মাঝি, ‘খায়রুন সুন্দরী’, ‘দোলনা’, ‘মাটির ময়না’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘শাস্তি’ কিংবা ‘মনপুরা’সহ বিভিন্ন দশকে নির্মিত আরও অসংখ্য সিনেমায় উঠে এসেছে গ্রামীণ সমাজ, প্রেম, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বৈষম্য ও মানুষের জীবনসংগ্রাম। তবে গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত হলেও সব সিনেমার গল্প এক ধরনের ছিল না, আবার সব গ্রামীণ পটভূমির সব সিনেমাও দর্শক একইভাবে গ্রহণ করেননি। সাফল্যের বিষয়টি ছিল নির্মাতা কীভাবে গল্প উপস্থাপন করছেন, আর পাত্র-পাত্রীরা কীভাবে চরিত্রে নিজেকে খাপ খাইয়ে দর্শকের মনে ঢুকতে পেরেছেন, তার ওপর। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ‘মনপুরা’ দর্শকরা গ্রহণ করেছিল গ্রামীণ পটভূমি ও লোকজ সংগীতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার কারণে। অর্থাৎ নির্মাণ যদি ভিন্ন হয় তাহলে গ্রামীণ গল্পও শহুরে দর্শকের কাছেও সেই গল্প জনপ্রিয় হতে পারে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি, জীবনযাপন ও বিনোদন গ্রহণের অভ্যাসে এসেছে পরিবর্তন। শহরকেন্দ্রিক জীবন এখন মানুষের অভিজ্ঞতার বড় অংশ। কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিশ্ব সিনেমার সহজলভ্যতা দর্শকের প্রত্যাশাকে বদলে দিয়েছে। ফলে গ্রামের পটভূমিতে নির্মিত গল্পে শুধু প্রেম, বিরহ, জমিদার-প্রজা দ্বন্দ্ব কিংবা পারিবারিক ষড়যন্ত্র দেখিয়ে আগের মতো সাড়া পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিনেমা বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ গল্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো গল্প বলার ধরনে নতুনত্বের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ সিনেমার একটি অংশে একই ধরনের চরিত্র, সংলাপ, অতিনাটকীয় অভিনয় এবং পরিচিত কাহিনির পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। দর্শক যখন একই ছকে বারবার গল্প দেখেছেন, তখন আগ্রহ হারানো অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের দর্শক চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, বাস্তবসম্মত সংলাপ এবং বিশ্বাসযোগ্য দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দেন।
এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক আবুল খায়ের বুলবুল বলেন, ‘গ্রামের গল্প মানেই এখনো নায়ক-নায়িকার প্রেম, একজন অত্যাচারী মাতব্বর আর শেষে প্রতিশোধ-এমন ধারণা থেকে বের হতে হবে। গ্রামেও রাজনীতি আছে, অর্থনৈতিক সংকট আছে, তরুণদের স্বপ্ন আছে, প্রযুক্তির প্রভাব আছে। এসব বিষয় নিয়ে নতুন গল্প না বললে শহরের দর্শক কেন আগ্রহী হবেন? শুধু শহরের দর্শকই নয়, গ্রামের দর্শকরাও এখন আর পুরনো গৎবাঁধা গল্প দেখতে চান না।’
গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তনকে পর্দায় তুলে ধরতে না পারাও সংকটের অন্যতম কারণ বলে বলে করে অনেকে। একসময় গ্রামের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানুষের জীবনযাপন ছিল বর্তমান সময়ের চেয়ে আলাদা। এখন গ্রামের তরুণেরা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, অনলাইনভিত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। গ্রাম ও শহরের ব্যবধানও অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। অথচ কিছু সিনেমায় গ্রামকে এখনো এমনভাবে দেখানো হয়, যেন সেখানে সময় থমকে আছে। বাস্তবতার সঙ্গে এ ব্যবধান দর্শকের কাছে গল্পকে কৃত্রিম করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, শহুরে দর্শকের কাছে সিনেমা দেখার বিকল্প বেড়েছে। আগে প্রেক্ষাগৃহ ছিল বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব এবং আন্তর্জাতিক সিনেমা-সিরিজ ঘরে বসেই দেখার সুযোগ রয়েছে। ফলে দর্শক শুধু গল্পের বিষয়বস্তু নয়, নির্মাণের মান, চিত্রগ্রহণ, শব্দ, সম্পাদনা ও অভিনয়েও তুলনা করেন। গ্রামীণ গল্পের সিনেমা যদি নির্মাণশৈলীতে পিছিয়ে থাকে, তবে শুধু আবেগ বা পরিচিত পরিবেশ দিয়ে দর্শককে ধরে রাখা কঠিন।
চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক অনন্য মামুন বলেন, ‘প্রযোজকরা এমন গল্পে বিনিয়োগ করতে চান, যেখানে ব্যবসায়িক সাফল্যের সম্ভাবনা আছে। গ্রামীণ গল্পের সিনেমা চলবে না-এমন ধারণা থেকে অনেকেই ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে এ ধারায় বড় বাজেট, ভালো চিত্রনাট্য ও প্রচারণার ঘাটতি তৈরি হয়। আবার বিনিয়োগ কম হলে সিনেমার মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়েছে।’
গ্রামীণ গল্পের সিনেমা নির্মাণ কমে যাওয়ার পেছনে প্রেক্ষাগৃহের সংকট এবং দর্শক টানার প্রতিযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শহরের মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক দর্শক, তরুণদের বিনোদন পছন্দ এবং ঈদকেন্দ্রিক বড় আয়োজনের বাজারে অ্যাকশন, তারকানির্ভর সিনেমা কিংবা দ্রুতগতির থ্রিলার বেশি আলোচনায় আসতে পারে। অন্যদিকে, গ্রামীণ গল্পের সিনেমা যদি যথাযথ প্রচারণা না পায়, তবে ভালো নির্মাণ সত্ত্বেও শহুরে দর্শকের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়। কারণ, দেশে এখন যে কটি প্রেক্ষাগৃহ ‘বেঁচে’ আছে, তার সবই বলা যায় শহর কিংবা তার আশপাশকেন্দ্রিক।
এরপরও গ্রামীণ গল্পের আবেদন যে পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, তা বলা যায় না। ‘মনপুরা’র সাফল্য তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ‘মাটির ময়না’, ‘হাজার বছর ধরে’ ও ‘শাস্তি’র মতো সিনেমাও গ্রামীণ সমাজকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে। এসব সিনেমা দেখায়, গ্রামের জীবনকে শুধু নস্টালজিয়া বা রোমান্টিক আবহে আটকে না রেখে সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের জটিল সম্পর্ক ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করলে গল্পের শক্তি বাড়ে।
সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মিম বলেন, ‘শহরের দর্শক গ্রামের গল্প বুঝবেন না, এটা ঠিক নয়। ভালোবাসা, বঞ্চনা, স্বপ্ন, প্রতারণা কিংবা পরিবারের টানাপোড়েন সব জায়গার মানুষেরই অভিজ্ঞতা। গল্পটি যদি সত্যিকারের মানুষের কথা বলে, তাহলে গ্রামের পটভূমিও শহরের দর্শকের কাছে আপন হয়ে উঠতে পারে।’
তবে, গ্রামীণ গল্পের সিনেমার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়াকে গ্রামের গল্পের প্রতি দর্শকের অনীহা হিসাবে দেখার চেয়ে নির্মাণশৈলী, বাজারব্যবস্থা ও দর্শকের পরিবর্তিত রুচির সম্মিলিত ফল হিসাবে দেখা যুক্তিযুক্তই বলে মনে করেন চিত্র সমালোচকরা। তাদের মতে, গ্রাম বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই গ্রামের গল্পে নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, নারী-পুরুষের বদলে যাওয়া সম্পর্ক, কৃষির সংকট, অভিবাসন, স্থানীয় ক্ষমতার রাজনীতি কিংবা প্রযুক্তির প্রভাব উঠে এলে তা নতুন মাত্রা পেতে পারে। প্রয়োজন শুধু গ্রামকে পুরোনো দিনের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে নয়, পরিবর্তনশীল জীবন্ত সমাজ হিসাবে দেখা। গ্রামীণ গল্পের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে পটভূমির ওপর যতটা না, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করছে সেই পটভূমিতে মানুষের গল্প কতটা নতুন, বিশ্বাসযোগ্য ও শিল্পসম্মতভাবে বলা হচ্ছে তার ওপর।
