শারদীয় উৎসবে গানের বাজারেও ভাটা
দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় আয়োজন শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে সিনেমা ও নাট্যাঙ্গনের মতো গানের বাজারেও দেখা গেছে খরা। বড় কোনো শিল্পীর উৎসবকেন্দ্রিক গান নেই। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোরও গান প্রকাশে আগ্রহ কম। তবে এই ক্রান্তিকালের মধ্যেই কিছু স্বাধীন তরুণ শিল্পী শারদীয় উৎসবে গান প্রকাশ করেছেন। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
সাহিদ আহমেদ
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমানে বাংলা সংগীতাঙ্গন ও অডিও বাজার এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ঈদের মতো দুর্গোৎসবের মতো বড় উৎসবে একসময় নতুন গান প্রকাশের যে ব্যাপক উৎসবমুখর আমেজ ও প্রতিযোগিতা দেখা যেত, তা বর্তমানে অনেকাংশে ঝিমিয়ে পড়েছে। এক বা দেড় দশক আগেও শারদীয় উৎসবে প্রযোজনা সংস্থাগুলোর মধ্যে অ্যালবাম প্রকাশের প্রতিযোগিতা লেগেই থাকত। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই উদ্দীপনায় ভাটা পড়েছে। গত কয়েক বছর সংগীতাঙ্গন অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এসে অনেকটাই স্থবির রূপ ধারণ করেছে। যেখানে উৎসব ঘিরে স্টুডিওগুলোতে তুমুল ব্যস্ততা থাকার কথা, সেখানে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। মূলধারার অনেক জনপ্রিয় শিল্পী নতুন গান প্রকাশের চেয়ে স্টেজ শো ও দেশের বাইরে কনসার্ট প্রোগ্রাম করায় ব্যস্ত। তাদের কণ্ঠে নেই কোনো নতুন গান।
দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর বরাবরই গান প্রকাশে নিয়মিত। কোনো বড় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই সম্প্রতি তার কণ্ঠে ‘হৃদয় দিয়েছি তোমারে’ শিরোনামে একটি নতুন গান প্রকাশ হয়েছে। এতে তার সহশিল্পী রুবাইয়াত জাহান। নিয়মিত স্টুডিও রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত থাকা আসিফ আকবর জানান, এটাকেই তার শারদীয় উৎসবের গান হিসাবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া শিগগিরই প্রকাশ পেতে যাচ্ছে তার কণ্ঠে বিখ্যাত দেশাত্মবোধক কাভার গান ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’।
এদিকে উৎসবের গান নয়, আপাতত স্টেজ শো নিয়েই ব্যস্ত দেশের আরেক জনপ্রিয় গায়ক, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হাবিব ওয়াহিদ। সাধারণত উৎসবের মৌসুমে ভক্তদের জন্য নতুন গান প্রকাশের ট্রেন্ড থাকলেও, এ বছর দুর্গোৎসবে বিশেষ কোনো গান প্রকাশ করেননি তিনি। যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ‘বর্তমানে নতুন গান প্রকাশের চেয়ে স্টেজ শো এবং লাইভ পারফরম্যান্স নিয়েই মূলত আমার মূল ব্যস্ত সময় কাটছে।’ তবে আগের তুলনায় স্টেজ শো’র সংখ্যা কমেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে নিজের সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি গানকেও শারদীয় উৎসবের গান হিসাবে শ্রোতাদের জন্য উপহার বলে জানিয়েছেন সংগীতশিল্পী কাজী শুভ। অডিও বাজারে একক অ্যালবামের প্রবণতা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও দেশের শীর্ষস্থানীয় অডিও ভিডিও প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশন (ডিএমএস) থেকে ৯টি নতুন গান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ একক অ্যালবাম ডিজিটালি প্রকাশ করেছেন এ সংগীতশিল্পী। প্রয়াত পাগল হাসানের সুরে ‘ভুল কইরাছি ভালোবাসিয়া’ এবং দ্বৈত গান ‘মিশে আছো’ ও ‘বউ বানাইয়া আনবো ঘরে’ গানগুলো বেশ সাড়া ফেলেছে। কাজী শুভ জানান, ‘আগে দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবগুলোতে গান প্রকাশের যে প্রতিযোগিতা বা হিড়িক দেখা যেত, তা এখন আর নেই। অধিকাংশ শিল্পীই এখন একটি করে সিঙ্গেল ট্র্যাক প্রকাশের দিকে ঝুঁকছেন।’ একইসঙ্গে স্টেজ শোয়ের ব্যস্ততা নিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাইভ শোর আয়োজন চূড়ান্ত হওয়ার পথে থাকলেও বিশেষ একটি শ্রেণির বাধা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত আয়োজকরা আর এগোতে পারেননি।’
উৎসবের বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ বদলালেও পূজার ভক্তিগানের চিরায়ত ঐতিহ্য ধরে রাখতে একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী ড. অরূপ রতন চৌধুরী প্রকাশ করেছেন নতুন ভক্তিগান ‘জয় মা দুর্গা’। ‘সংগীতা’র ব্যানারে প্রকাশিত এ গানটি ভক্তদের মাঝে আধ্যাত্মিক আবহ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সালমা তার নতুন গান নিয়ে জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে একটি গান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ হয়েছে। সালমান বলেন, ‘দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে এবার আমরা বিশ্ব রঙ-এর সঙ্গে একটি বিশেষ কাজ করেছি। তবে এখন তো আর আগের মতো পূজায় একক অ্যালবাম প্রকাশের চল নেই; তাই গানটি মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই রিলিজ করা হয়েছে। পূজার বিশেষ উপহার হিসাবেই গানটির কাজ সম্পন্ন করা হয়।’
উপরের উল্লিখিত কয়েকজন ছাড়া এবারের পূজায় দেশের আর কোনো শিল্পীকে নতুন গান নিয়ে হাজির হতে দেখা যায়নি। জনপ্রিয় শিল্পী দিলশাদ নাহার কণা দুই মাসেরও বেশি সময় ছিলেন আমেকিায়। সেখানে করেছেন স্টেজ শো। তাই ইচ্ছা থাকলেও শারদীয় উৎসবে নতুন গান নিয়ে হাজির হতে পারেননি বলে জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তির কারণে তিনি আপাতত বিশ্রামে রয়েছেন এবং এ মুহূর্তে তার নতুন কোনো গান আসছে না। কণার পাশাপাশি একই সময়ে আমেরিকায় ছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ইমরান মাহমুদুলও। তিনিও সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। দুর্গোৎসবে বিশেষ কোনো গান না আসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, টানা সফর শেষে আপাতত কিছুদিন বিশ্রামে কাটিয়ে আগামী মাস থেকে পুনরায় নতুন গান ও সংগীতের কাজ শুরু করবেন।
তবে এবারের পূজার দেশের স্বাধীন শিল্পীরা নিজেদের মতো করে কিছু গান নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের সামনে হাজির হয়েছেন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর গান প্রকাশের পুরোনো হিড়িক থেমে গেলেও, তরুণ ও ফ্রিল্যান্সার শিল্পীরা পূজার আনন্দ থমকে যেতে দেননি। ইউটিউব, ফেসবুক ও নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা সরাসরি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন। ফ্রিল্যান্সার ডিজিটাল চ্যানেলগুলোতে দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে দেবীর বন্দনা গান প্রকাশ হচ্ছে। তরুণ লোকশিল্পীরা স্থানীয় ঐতিহ্য বজায় রেখে নতুন ঝুমুর ও লোকআঙ্গিকের গান উপহার দিচ্ছেন, যা প্রান্তিক পর্যায়ের পূজামণ্ডপগুলোতে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। মূলত এই নবীন শিল্পীদের সৃষ্টিশীল উদ্যোগই আজ তৃণমূল পর্যায়ে পূজার গানকে টিকিয়ে রেখেছে।
কেন বড় উৎসবগুলোতে নতুন গান প্রকাশ হচ্ছে না? বিশেষজ্ঞদের মতে, অডিও বাজারের এই পথ পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু এখন অডিও গান থেকে সরে নাটক, ওয়েব কনটেন্ট এবং মিউজিক ভিডিওর দিকে ঝুঁকে পড়া। শ্রোতারা এখন শুধু গান শোনার জায়গায় ‘দৃশ্য’ বা ভিজ্যুয়াল দেখতে পছন্দ করছেন। ফলে শুধু অডিও অ্যালবাম তৈরির অর্থনৈতিক ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বর্তমানে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই ঈদের বাইরে তেমন গান প্রকাশ করছে না অথবা নাটক নির্মাণে মনোযোগী হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্টেজ শো বাতিল হওয়া এবং অনিশ্চয়তা শিল্পী ও মিউজিশিয়ানদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে। সংগীতাঙ্গনের এই বাণিজ্যিক সংকট নিয়ে কথা বলেছেন লেজারভিশনের কর্ণধার এবং মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইবি) সভাপতি এ কে এম আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গান থেকে বাণিজ্যিক আয় বা রেভিনিউ এখন একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে।’ একের পর এক নতুন গানে বিনিয়োগের পরও কাক্সিক্ষত আয় না হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে তিনি জানান, সংগীতাঙ্গনের এই আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়ার তাগিদে বাধ্য হয়ে নাটকে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
