হারানো সাফল্য ফিরে পাননি তারা
দেশের বিনোদন অঙ্গনের গত ৫০-৬০ বছরের ইতিহাসে এমন কয়েকজন কিংবদন্তি ও শীর্ষ তারকা এসেছেন, যারা জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ক্যারিয়ারে বিরতি টেনেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক দায়িত্ব, প্রবাস জীবন কিংবা কেউবা নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন মানসম্মত কাজের আশায়-কারণ যাই হোক না কেন, তাদের এই প্রস্থান ভক্তদের মনে বড় শূন্যতা তৈরি করে। পরে অনেকে পর্দায় ফিরে নতুন করে সফলতার গল্প লিখেছেন। আবার অনেকে ফিরবেন বলেও ফেরেননি। তবুও রয়েছেন ভক্তদের হৃদয়ে। তা নিয়েই বিস্তারিত থাকছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
সাহিদ আহমেদ
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিনেমা কিংবা নাটকে একসময় তারকাদের নামই ছিল বড় বিজ্ঞাপন। সিনেমার পোস্টারে নাম কিংবা ছবি দেখলেই দর্শক প্রেক্ষাগৃহে ভিড় জমাতেন। টিভি সেটের সামনে বসে থাকতেন প্রিয় তারকাকে দেখার জন্য। অথচ সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত মুখ আর পর্দায় দেখা যায় না। প্রতিনিয়ত নতুনরা আসছেন, তবু দর্শক যেন অপেক্ষায় থাকেন প্রিয় তারকার জন্য।
অভিনয় থেকে বিরতি নিয়ে আবারও ফিরে আসার তালিকায় শুরুতেই আসে ঢাকাই সিনেমার একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা রোজিনার নাম। সত্তরের দশকের শেষদিকে এফ কবীর পরিচালিত ‘রাজমহল’ সিনেমা দিয়ে যাত্রা শুরু তার। এরপর ক্যারিয়ারে পেয়েছেন ব্যাপক সাফল্য। ঝুলিতে আছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। অভিনয় ছেড়ে একসময় বেছে নেন প্রবাস জীবন। দীর্ঘদিন পর ২০২৩ সালে ‘ফিরে দেখা’ সিনেমা দিয়ে আবারও ফেরেন। এতে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাও করেন তিনি। তবে তার ফেরার পরিণতি আগের সাফল্যকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। এখন তাকে রিয়েলিটি শো, অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান, ফ্যাশন শো ও আধুনিক ফটোশুটে দেখা যায়।
রোমান্টিক ও পারিবারিক সিনেমায় শাবনূরের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৯৩ সালে ‘চাঁদনী রাতে’ দিয়ে শুরু। সেটি ব্যবসা সফল না হলেও পরের বছর সালমান শাহের সঙ্গে জুটি বেঁধে তুমুল জনপ্রিয়তা পান। ক্যারিয়ারের চাকা সচল থাকতেই তিনি পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। এখন সেখানেই স্থায়ী হয়েছেন। অভিনয়ে পড়েছে দীর্ঘ বিরতি। মাঝে অবশ্য ২০১৮ সালে ‘পাগল মানুষ’ নামে একটি সিনেমা দিয়ে পর্দায় ফিরেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থতার গ্লানি বইতে হয়েছে তাকে। হারানো সাফল্য আর ফিরে পাননি। ২০২৪ সালে ‘রঙ্গনা’ দিয়ে ফেরার ঘোষণা এলেও সিনেমাটির কাজই শেষ হয়নি।
একসময় ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকাদের অন্যতম ছিলেন সাদিকা পারভীন পপি। ইন্ডাস্ট্রির পলিটিক্সের কারণে তিনিও একসময় অনিয়মিত হয়ে পড়েন সিনেমায়। মাঝে ফেরার চেষ্টা করেছেন। শুটিংও করেছেন একাধিক সিনেমার। কিন্তু কোভিড মহামারি তার সেই চেষ্টা থামিয়ে দিয়েছে। এরপর আড়াল চলে যান এ নায়িকা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ্যে এসে জানান, তিনি বিয়ে করেছেন এবং তার একটি সন্তান রয়েছে। বর্তমানে তার অভিনীত অসমাপ্ত সিনেমা হিসাবে পড়ে আছে ‘ভালোবাসার প্রজাপতি’ ও ‘কাঠগড়ায় শরৎচন্দ্র’। যদিও পপি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি আর সিনেমায় ফিরবেন না। কিন্তু ফিরলেও হারানো আসন আর ফিরে পাবেন না, এটা নিশ্চিত বলা যায়।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে সিনেমায় জনপ্রিয়তা পান পূর্ণিমা। ১৯৯৮ সালে জাকির হোসেন রাজুর ‘এ জীবন তোমার আমার’ সিনেমায় নায়িকা হিসাবে আবির্ভূত হন। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই সৌন্দর্য ও সাবলীল অভিনয়ে তারকাখ্যাতি পান। তুমুল জনপ্রিয়তার মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবন ও সংসারের ব্যস্ততায় সিনেমায় অনিয়মিত হয়ে পড়েন। ২০১৯ সালে ‘গাঙচিল’ নামে একটি সিনেমা দিয়ে আবারও ফেরেন। কিন্তু এটি আর মুক্তি পায়নি। সর্বশেষ তার অভিনীত ২০২২ সালে ছটকু আহমেদ পরিচালিত ‘আহারে জীবন’ নামে একটি সিনেমা মুক্তি পায়। কিন্তু এ সিনেমার ফ্লপ তকমা পূর্ণিমাকেও ব্যর্থতার স্বাদ দিয়েছে। ফিরে পাননি আর হারানো সাফল্য। এখন বিভিন্ন টিভি শোতে দেখা গেলেও পর্দায় উপস্থিতি সীমিত।
টিভি পর্দায় এক পরিচিত নাম অপি করিম। শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় শুরু করা এ অভিনেত্রী ১৯৯৮ সালে বিটিভির ‘সবুজ গ্রাম’ নামে একটি নাটক নায়িকা হিসাবে পথচলা শুরু করেন। এর পরের ইতিহাস শুধুই সাফল্যের। নাটকের পাশাপাশি সিনেমায়ও দেখিয়েছেন কারিশমা। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এ অভিনেত্রীকে মাঝে মাঝে দেখা যায় বিরতিতে। তবে যতবারই কামব্যাক করেছেন, শুরুর দিকের ক্রেজ তিনি আর ফিরে পাননি। যদিও এখনো তাকে মাঝে মধ্যে পর্দায় দেখা যায়।
নব্বইয়ের দশক থেকে টেলিভিশন নাটকে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছেন মাহফুজ আহমেদ। নাটক দিয়েই তার ক্যারিয়ার শুরু। পেয়েছেন তুমুল জনপ্রিয়তা। এরপর নাম লিখিয়েছেন সিনেমায়। এ মাধ্যমে অবশ্য নাটকের মতো দর্শকসাফল্য পাননি। তবে ঝুলিতে দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মাঝে ছিল তার দীর্ঘ বিরতি। ফিরেছেন ‘প্রহেলিকা’ নামে একটি সিনেমা দিয়ে। কিন্তু সাফল্য আর ধরা দেয়নি। প্রহেলিকার পর ওটিটিতে ব্যস্ত থাকার পাশাপাশি সম্প্রতি ধারাবাহিক নাটক ‘মাগো তোমার জন্য’ পরিচালনা করেছেন।
একসময় ছোটপর্দার নিয়মিত মুখ ছিলেন রিচি সোলায়মান। তবে ক্যারিয়ারে মধ্যগগনে বিয়ে করে হন আমেরিকা প্রবাসী। অবস্থান করেন বছর দুয়েক। এরপর স্বামীর মনোমালিন্যের কারণে ফেরেন দেশে। আবারও শুরু করেন অভিনয়। কিন্তু আগের মতো আর জনপ্রিয়তা ফিরে পাননি। এখন অবশ্য স্বামীর সঙ্গে তার সুখের সংসার। কিন্তু অভিনয়ে সুখ নেই। তাই জড়িয়েছেন নির্মাণের সঙ্গে। আমেরিকা থেকে যখনই দেশে ফেরেন টুকটাক অভিনয় ও নির্মাণে দেখা যায় তাকে।
নাটকের একসময়ের জনপ্রিয় ও ব্যস্ত অভিনেত্রী রুমানা রশীদ ঈশিতা তার অভিনয় ক্যারিয়ারে একাধিকবার বিরতি নিয়েছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি ২০১৪ সাল থেকে টানা চার বছর অভিনয় ও মিডিয়া জগৎ থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলেন। এরপর ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে নির্মাতা রেদওয়ান রনির ‘পাতা ঝরার দিন’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে আবার পর্দায় ফিরে আসেন। এ নাটকে তিনি কলকাতার কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে অভিনয় করে বেশ প্রশংসা পান। তবে আগের মতো অভিনয় ক্যারিয়ার আর দাঁড় করাতে পারেননি।
নাটকের একসময়ের শীর্ষ অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমু। তিনিও ব্যস্ত থাকাকালীনই ব্যক্তিগত কারণে বিরতিতে যান। দীর্ঘদিনের বিরতি কাটিয়ে মোস্তফা কামাল রাজের নতুন একটি ধারাবাহিক নাটক দিয়ে ফেরার কথা থাকলেও সেটাও হয়নি। যদিও একক নায়িকা হিসাবে তার আগের মতো জনপ্রিয়তা পাওয়া সম্ভব নয় বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
একসময়ের ব্যস্ত মডেল ও অভিনেত্রী সারিকা সাবরিন মডেলিং দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। কিন্তু ক্যারিয়ারে তুমুল ব্যস্ত সময়ে প্রেম ও বিয়ে নিয়ে নানারকম ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। বিয়ে-সংসার ও পারিবারিক সমস্যার ছায়া শুটিংয়ের শিডিউলে পড়ায় একাধিকবার পরিচালক-প্রযোজকরা অভিযোগ তুলে তাকে সাময়িক সময়ের জন্য ব্যানও করেছিলেন। বারবার ধাক্কা খেয়েও তিনি ফিরে এসেছেন, এখনো নিজেকে ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তবে আগের সাফল্য তিনি আর ফিরে পাননি। যদিও তিনি এখন নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। কাজও করছেন, তবে অপেক্ষায় আছেন এমন একটি প্রজেক্টের, যা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে হারানো জনপ্রিয়তা।
সারিকার সমসাময়িক আরেক জনপ্রিয় মডেল অভিনেত্রী আনিকা কবির শখ। সারিকার মতো তার জীবনও ব্যক্তিগত ঝুট ঝামেলায় ভরা। তুমুল জনপ্রিয় থাকা অবস্থায় অভিনেতা নিলয়কে বিয়ে করে ক্যারিয়ারের গতি নিজেই মন্থর করে দেন এ অভিনেত্রী। কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি বেশিদিন। এরপর কাজে দীর্ঘ বিরতি। আবারও বিয়ে, সন্তান জন্মদান-এসবের কারণে ফেরা হয়নি। অবশেষে শখ ফিরেছেন। কিন্তু আগের মতো আর জনপ্রিয়তা নেই এ বিষয়টি তিনি নিজেও অনুধাবন করেছেন। তবু চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিজেকে ব্যস্ত রাখার।
রিয়েলিটি শো থেকে উঠে আসা বিন্দু বিজ্ঞাপন, নাটক ও সিনেমা, তিন মাধ্যমেই কাজ করেছেন। ২০০৭ সালে তৌকীর আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’ সিনেমায় অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান। ‘জাগো’ ও ‘এই তো প্রেম’ সিনেমাতেও প্রশংসিত হন। কিন্তু তিনিও বিয়ে করে মিডিয়া থেকে পরবাসী হয়ে যান। ২০১৪ সালে বিরতি নেওয়ার পর ২০২৩ সালে আবারও ফেরেন ‘উনিশ২০’ ওয়েব ফিল্মের মাধ্যমে। ফিল্মটি দিয়ে দর্শকের মধ্যে নিজের প্রতি আবারও নতুন করে আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন এ অভিনেত্রী। মডেলিং নিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন সাদিয়া জাহান প্রভা। ক্যারিয়ার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় বিয়ে করেন অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্বকে। কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি প্রভার পুরোনো প্রেমিকের এক ভিডিও প্রকাশের কারণে। এরপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ের প্রভা। চলে যান দীর্ঘ বিরতিতে। ব্যক্তিগত নানা চড়াই-উতরাই ও দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নাটকের শুটিংয়ে নিয়মিত অংশ নেওয়া শুরু করেছেন এ অভিনেত্রী। কিন্তু আগের মতো জনপ্রিয়তা ফিরে পাননি তিনি।
