Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

নাটকে মধ্যবিত্তরা কতটা জীবন্ত

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার মানেই একদিকে স্বপ্ন, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধন, অন্যদিকে আয়-ব্যয়ের হিসাব, ঋণের বোঝা, বেকারত্ব, সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চাপ আর সম্পর্কের নানা জটিলতা। প্রতিদিনের জীবনে ঘটে যাওয়া এসব ছোট-বড় সংকটই নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের টেলিভিশন ও ইউটিউবকেন্দ্রিক নাটকে মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম নানা মাত্রায় উঠে আসছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, পর্দায় মধ্যবিত্তের হাসি-কান্না যতটা দৃশ্যমান হচ্ছে, তাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকট কি ততটাই গভীরভাবে তুলে ধরা হচ্ছে? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে-

Icon

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বাংলাদেশের নাটকের দর্শক দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পান। কারণ, এই শ্রেণির মানুষের জীবনেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি বৈপরীত্য। মাসের শুরুতে বেতনের টাকা হাতে পেয়ে সংসারের খরচ, বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, বাজারসদাই, চিকিৎসা এবং নানা পারিবারিক দায় মেটাতে গিয়ে মাসের শেষ দিকে প্রায়ই শূন্য হয়ে যায় পকেট। অথচ সামাজিক অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজেদের অভাব-অনটনও প্রকাশ করতে চান না তারা। এ বাস্তবতা বাংলাদেশের নাট্যনির্মাতাদের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিচ্ছে।

মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প বলতে গেলে উঠে আসে একজন চাকরিজীবী বাবার কথা, যিনি নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে চান। উঠে আসে একজন মায়ের কথা, যিনি সংসারের সীমিত আয় দিয়ে সবার চাহিদা পূরণের চেষ্টা করেন। থাকে বেকার তরুণের হতাশা, উচ্চশিক্ষিত সন্তানের চাকরি না পাওয়ার যন্ত্রণা, প্রেমের সম্পর্কে আর্থিক অবস্থানের প্রভাব এবং ভাইবোনের মধ্যে সম্পত্তি কিংবা দায়িত্ব নিয়ে বিরোধ। এসব বিষয় নাটকে কেবল পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

সাম্প্রতিক সময়ের নাটকে পারিবারিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েন বেশ লক্ষণীয়। নির্মাতা কাজল আরেফিন অমির ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ নাটকে শহুরে তরুণদের বাসা, চাকরি, প্রেম, বন্ধুত্ব ও টিকে থাকার সংগ্রাম হাস্যরসের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। যদিও এটি সরাসরি মধ্যবিত্ত পরিবারের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়, তবু শহরে বসবাসকারী তরুণদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক বাস্তবতার কিছু দিক এতে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘বড় ছেলে’ নাটকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্ব, পরিবারের বড় সন্তানের আত্মত্যাগ এবং ব্যক্তিগত স্বপ্ন বিসর্জনের বিষয়টি দর্শকের আবেগকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। অপূর্ব ও মেহজাবীন চৌধুরীর অভিনয় নাটকটিকে মধ্যবিত্ত জীবনের এক পরিচিত আবেগের গল্পে পরিণত করেছে।

এ ধারার সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসাবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় মাছরাঙা টিভিতে প্রচার চলতি ধারাবাহিক নাটক ‘মিডল ক্লাস ফ্যামিলি’। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জমিরউদ্দিন সরকারের পরিবারকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে এ নাটকের গল্প। সন্তানদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বাবার আদর্শ, মায়ের মমতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং প্রজন্মের চিন্তাগত পার্থক্য-সব মিলিয়ে এখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের বহুমাত্রিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে একদিকে বাবার নৈতিক আদর্শ, অন্যদিকে সন্তানের অর্থবিত্তের প্রতি আকর্ষণ মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধের পরিবর্তনকে সামনে নিয়ে এসেছে।

একইভাবে চলতি বছরের আলোচিত নাটক ‘সংসারের বোঝা’ মধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্ব ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টিকে সামনে এনেছে। নাটকটিতে অভিনয় করেছেন মুশফিক আর ফারহান ও নীলাঞ্জনা নীলা। পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পূরণ, দায়িত্বের ভার এবং পারস্পরিক প্রত্যাশা কীভাবে একটি সংসারে অশান্তি তৈরি করে, সেটিই নাটকের মূল উপজীব্য। অন্যদিকে ‘থাকে তবু ভালোবাসা’ নাটকে গোলাম কিবরিয়া তানভীর ও নাবিলা ইসলাম অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চাপ, ঋণ, বাড়তি খরচ এবং দাম্পত্য সম্পর্কের সংকট উঠে এসেছে। সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণের চেষ্টা কীভাবে একজন মানুষকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে, নাটকটি তারই একটি উদাহরণ। এসব নাটক কেবলই উদাহরণ। আরও অনেক নাটক আছে যেগুলোতে মধ্যবিত্তের টানাপড়েন তুলে ধরা হয়েছে এবং সেসব নাটক দর্শকরা পছন্দও করেছেন।

তবে মধ্যবিত্তের সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানসিক চাপ ও সম্পর্কের অদৃশ্য দেয়াল। অনেক পরিবারে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয় পেশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধ থেকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রত্যাশার চাপ কিংবা আত্মীয়স্বজনের হস্তক্ষেপ সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। আবার পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন সদস্যের ওপর সবার নির্ভরশীলতা অনেক সময় তার ব্যক্তিগত জীবনকে সংকুচিত করে দেয়। নাটকে এসব বিষয় যত বেশি বাস্তবসম্মতভাবে উঠে আসবে, দর্শক তত বেশি নিজেদের জীবনের গল্প খুঁজে পাবেন।

এ প্রসঙ্গে তরুণ নাট্যনির্মাতা এহসান এলাহী বাপ্পি বলেন, ‘মধ্যবিত্তের গল্পে বড় কোনো ঘটনা থাকার প্রয়োজন নেই। মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারের টাকা ফুরিয়ে যাওয়া, সন্তানের আবদার রাখতে না পারা কিংবা অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে না পারার মধ্যেও অনেক বড় নাটকীয়তা রয়েছে। এই ছোট ছোট সংকটগুলোকে সত্যিকারভাবে তুলে ধরতে পারলেই দর্শক নাটকের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবেন।’

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী দিলারা জামান বলেন, ‘মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মায়ের চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে শুধু সংলাপ বললেই হয় না, তার না বলা কষ্টগুলোও বুঝতে হয়। সংসারের সবার মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে একজন নারী নিজের কত ইচ্ছা বিসর্জন দেন, সেটি পর্দায় তুলে ধরা জরুরি।’

তবে বাংলাদেশের নাটকে মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক সময় বাস্তব সংকটকে অতিরিক্ত আবেগনির্ভর করে দেখানো হয়। অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান আসে হঠাৎ কোনো ধনী ব্যক্তির সহযোগিতায়, কিংবা দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে একটি আবেগঘন সংলাপের মাধ্যমে। এতে বাস্তব জীবনের জটিলতা অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। আবার মধ্যবিত্তের গল্প বলতে গিয়ে কখনো কখনো শুধু ঢাকা শহরের নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের জীবনকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। অথচ মফস্বল শহর, জেলা কিংবা গ্রামাঞ্চলের মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকটের ধরনও আলাদা। সেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক মর্যাদা এবং পারিবারিক দায়িত্বের চাপ ভিন্নভাবে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নাট্যকার ও নির্মাতাদের উচিত মধ্যবিত্ত জীবনের আরও গভীরে প্রবেশ করা। শুধু হাসি-কান্না কিংবা প্রেম-বিরহ নয়, মূল্যস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তা, বাড়িভাড়া, ঋণ, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বয়স্ক মা-বাবার দায়িত্ব এবং নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের সংঘাতও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। একইসঙ্গে মধ্যবিত্ত পরিবারের আনন্দ, পারস্পরিক সহযোগিতা, সংকট মোকাবিলার সাহস এবং ছোট ছোট প্রাপ্তির গল্পও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের নাটকে মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম এখন আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এ সময়ের বেশিরভাগ নাটকেই সেই বাস্তবতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরছে। তবে মধ্যবিত্তের প্রকৃত জীবনচিত্র ফুটিয়ে তুলতে হলে গল্পে প্রয়োজন আরও গভীর পর্যবেক্ষণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। কারণ, মধ্যবিত্তের জীবন মানেই শুধু অভাবের গল্প নয়; এটি সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা এবং প্রতিদিন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। আর সেই গল্পই যখন নাটকের পর্দায় সত্যিকার অর্থে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন দর্শক শুধু নাটক দেখেন না, সেখানে নিজের জীবনকেই দেখতে পান।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

নাটকে মধ্যবিত্তরা কতটা জীবন্ত

নাটকে মধ্যবিত্তরা কতটা জীবন্ত

অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেই মঞ্চে গাইছেন সেলিন ডিওন

অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেই মঞ্চে গাইছেন সেলিন ডিওন

প্রথমবার সিনেমায় রিচি

প্রথমবার সিনেমায় রিচি

বিপ্লব ও সংহতি দিবস নিয়ে বিটিভির আয়োজন

বিপ্লব ও সংহতি দিবস নিয়ে বিটিভির আয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম