Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

সিনেমায় নায়ক-নায়িকার ছড়াছড়ি

কিন্তু শিল্পী কজনা

ঢালিউডে এখন নায়ক-নায়িকার অভাব নেই। নতুন নতুন মুখ আসছে, সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের উপস্থিতিও বাড়ছে। কেউ রাতারাতি আলোচনায় আসছেন, কেউ সিনেমার প্রচারণায় নিজেকে তারকা হিসাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এত নায়ক-নায়িকার ভিড়ে প্রকৃত শিল্পী কতজন? পর্দায় যাদের দেখা যায়, তাদের সবাই কি অভিনয়শিল্পী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন? নাকি তারকা হওয়ার প্রতিযোগিতায় অভিনয়টাই ক্রমশ গৌণ হয়ে পড়ছে? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

Icon

আনন্দনগর প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একসময় ঢালিউডে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী হয়ে ওঠার পেছনে দীর্ঘ প্রস্তুতি, শ্রম ও সাধনা থাকত। অভিনয় শেখা, চরিত্র বোঝা, সংলাপের উচ্চারণ, অভিব্যক্তি এবং শরীরী ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ-সবকিছুর মধ্যদিয়ে একজন শিল্পী নিজেকে তৈরি করতেন। ফলে পর্দায় তাদের উপস্থিতি দর্শকের মনে দাগ কাটত। তারা শুধু নায়ক কিংবা নায়িকা ছিলেন না, ছিলেন চরিত্রের প্রাণ।

কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অনেকের কাছে অভিনয়ের চেয়ে তারকা হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দর চেহারা, আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন, ফ্যাশন সচেতনতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা কিংবা প্রচারণার দক্ষতাকে অনেক সময় অভিনয়যোগ্যতার মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অথচ ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো আর একজন দক্ষ অভিনেতা হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়।

এ মুহূর্তে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তরুণ প্রজন্মের নায়কদের মধ্যে কাজ করছেন আফরান নিশো, সিয়াম আহমেদ, শরিফুল রাজ, জিয়াউল রোশান, নিরব, ইমন, কায়েস আরজু, ইয়াশ রোহানসহ আরও কয়েকজন। এর মধ্যে আফরান নিশো নাটক থেকে এসেছেন। সিনেমায় নিজের যোগ্যতার প্রমাণও দিয়েছেন। সিয়ামও নাটক থেকে এসে দীর্ঘদিন সিনেমায় কাজ করছেন। শরিফুল রাজ নিজের নামের প্রতি সুবিচার করার চেষ্টা করছেন। জিয়াউল রোশান এখনো নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। অন্যদিকে নিরব ও ইমন দুই দশক ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করলেও তারা এখন কতটা নায়ক, কতটা শিল্পী নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন। কায়েস আরজুর অবস্থাও তথৈবচ। ইয়াশ রোহানকে সিনেমার চেয়ে নাটকেই বেশি দেখা যায়। আর বাপ্পি চৌধুরী ও সাইমন সাদিক নায়ক হয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে এসে ‘শিল্পী’ হয়ে ওঠার আগেই হারিয়ে গেছেন। জায়েদ খান অনেক চেষ্টা করেছেন শিল্পী হয়ে ওঠার। কিন্তু পারেননি। নায়ক বিশেষণেও তাকে নিয়ে অনেকের আপত্তি। শিল্পী সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরীও নিজেকে শিল্পী বলে দাবি করেন। কিন্তু তিনি কতটা শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছেন তার অভিনীত সিনেমাগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তবে এ মুহূর্তে ইন্ডাস্ট্রিতে নায়ক থেকে পরীক্ষিত শিল্পী হয়েছেন একজনই, তিনি শাকিব খান। আরেফিন শুভও শিল্পী হয়ে উঠার পথে রাজনৈতিক কারণে বিতর্কিত হয়ে পিছলে পড়েছেন। তবে তাকে ‘শিল্পী’ বলা যায়। এ ছাড়া ঢালিউডে এ মুহূর্তে আরও অনেকেই আছেন, যারা নিজেদের নায়ক বলে পরিচয় দেন। কিন্তু আদতে তারা না নায়ক, না শিল্পী! মূলত নায়ক তকমা জড়িয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে এরা সবাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির গায়ে কালি লেপনে লিপ্ত।

বর্তমানে ঢালিউডে নায়কের সংখ্যা কম হলেও নায়িকার তালিকা বেশ লম্বা। এদের আবার বেশির ভাগকেই বছরের কোনো না কোনো সময় সিনেমার কাজের খবর নিয়ে সামনে আসতে দেখা যায়। এ মুহূর্তে সিনেমায় যেসব নায়িকা কাজ করছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জয়া আহসান, অপু বিশ্বাস, শবনম বুবলী, পূজা চেরী, বিদ্যা সিনহা মিম, পরীমনি, সুনেরা বিনতে কামাল, জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, মিষ্টি জান্নাত, আইরিন সুলতানা, অধরা খান, শিরীন শিলাসহ আরও কয়েকজন। এরমধ্যে জয়া নিজেকে শিল্পী হিসাবে গড়ে তুলেছেন। অপু বিশ্বাসকেও শিল্পী বলা যায়। বুবলীরও চেষ্টার কমতি নেই। মিম তো পেশাদার নায়িকা। পূজা চেরী চেষ্টা করছেন শিল্পী হতে, তবে ভাগ্য সহায় হচ্ছে না। আর দীঘি তো ছোটবেলায় শিল্পী হয়েই ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছেন, কিন্তু বড় হয়ে নায়িকা হওয়ার পর আর শিল্পী হতে পারছেন না। অন্যদিকে পরীমনিকে বলা হয় বিতর্কের রানি। শিল্পী হওয়া তো দূরের কথা, নায়িকা তকমা দিয়েই তিনি ইন্ডাস্ট্রিকে কলুষিত করে ফেলেছেন। মিষ্টি জান্নাত নায়িকাই রয়ে গেছেন এখনো, শিল্পী হতে পারেননি। অধরা খান নায়িকা হয়ে কাজ করছেন। ইদানীং তাকে দেখা যায় অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সের কাজেও। চেষ্টা করছেন নিজেকে শিল্পী হিসাবে গড়ার। শিরীন শিলা নায়িকা পরিচয়টাকেই অপব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আগের প্রজন্মের মধ্যে শাবনূর, মৌসুমী, পূর্ণিমা, পপিরা শিল্পী হয়েই ইন্ডাস্ট্রিকে অনেক হিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন। এ ছাড়া নাটকের জগৎ থেকে বর্তমানে যারা শিল্পী হয়েই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম মেহজাবীন চৌধুরী, আজমেরী হক বাঁধন। আবার নাটক থেকে সিনেমায় এসে শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করছেন তাসনিয়া ফারিণ, নাজিফা তুষি, সাদিয়া আয়মানরাও।

কিন্তু সিনেমায় থেকেই কোনোদিন শিল্পী হতে পারেননি, এরকমও আছেন অনেকে। আবারও অনেকে আছেন যারা নায়িকা পরিচয়ে ঘুরে বেড়ান। যাদের নির্বাচন বা কোনো অনুষ্ঠান হলে এফডিসিতে এসে নায়িকা তকমা নিয়ে বেশ শোরগোল করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মৌ খান, রাজ রিপা, স্নিগ্ধা চৌধুরী, রোদেলা জান্নাত, সূচনা আজাদ, রোমানা নীড়, মৌমিতা মৌ, নিঝুম রুবিনা, রাহা তানহা খান। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বিভিন্ন রকম অপকর্মেও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রিতে এত এত নায়ক-নায়িকা থাকার পরও কেন শিল্পী নেই। কেন নির্ভর করার মতো শিল্পী তৈরি হচ্ছে না? সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এদের মধ্যে কম-বেশি কাজ সবাই করেছেন, করছেন। সমস্যা হচ্ছে, তাদের অনেকের অভিনয়ে চরিত্রের গভীরতা খুঁজে পাওয়া যায় না। সংলাপ বলার সময় স্বাভাবিকতা থাকে না, আবেগের দৃশ্যে কৃত্রিমতা প্রকাশ পায়, আবার অনেকের মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষায় চরিত্রের কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। পর্দায় তারা উপস্থিত থাকেন ঠিকই, কিন্তু চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন না। ফলে দর্শক গল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বদলে অভিনয়ের দুর্বলতাই বেশি চোখে পড়ে। তাই তারা শিল্পী হয়ে উঠতে পারেন না।

অবশ্য এর দায় শুধু নায়ক-নায়িকাদের নয়। সিনেমা নির্মাণের সামগ্রিক পরিবেশও এ জন্য দায়ী। প্রযোজক, পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছে এখন পরিচিত মুখ কিংবা আলোচিত তারকাকে সিনেমায় যুক্ত করাই কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একজন অভিনয়শিল্পী চরিত্রের জন্য কতটা উপযুক্ত, তার অভিনয়দক্ষতা কতটা, এসব প্রশ্ন অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ গুরুত্ব পায় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিনয়ের চেয়ে তারকাখ্যাতি নির্ভর হয়ে পড়ছে কাস্টিং।

তা ছাড়া ইন্ডাস্ট্রিতে প্রশিক্ষণের অভাবও বড় একটি বিষয়। অভিনয় একটি চর্চার বিষয়। নিয়মিত অনুশীলন, পর্যবেক্ষণ, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার মধ্যদিয়ে একজন অভিনেতা পরিণত হন। কিন্তু আমাদের সিনেমায় নতুনদের অভিনয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

তবে ঢালিউডে ভালো শিল্পী নেই, এমনটা বলাও ভুল হবে। এখনো কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী নিজেদের অভিনয় দিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করছেন। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেদের বদলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সীমিত সুযোগের মধ্যেও তারা প্রমাণ করছেন, অভিনয় শুধু জনপ্রিয়তা কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি মেধা, মনন, শ্রম ও সংবেদনশীলতার সমন্বয়। এসব গুণাবলি যাদের মধ্যে রয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী। তারা আগাগোড়া শিল্পী। কিন্তু এরা সিনেমার জন্য ডেডিকেটেড নয়। নাটকেও তাদের নিয়মিত দেখা মেলে।

প্রকৃত শিল্পীকে চেনা যায় তার কাজ দিয়ে। তিনি পর্দায় কতটা সময় থাকলেন, কত বড় বাজেটের সিনেমায় অভিনয় করলেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা আলোচিত হলেন, তা দিয়ে তার শিল্পীসত্তার বিচার হয় না। বরং একটি ছোট চরিত্রেও যিনি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে অভিনয়শিল্পী। তাই ঢালিউডের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তারকার সংখ্যা বাড়ানো নয়, দক্ষ অভিনয়শিল্পী তৈরি করা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সিনেমায় নায়ক-নায়িকার ছড়াছড়ি কিন্তু শিল্পী কজনা

কিন্তু শিল্পী কজনা

সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েও ফিরছেন কিম কার্দাশিয়ান

সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েও ফিরছেন কিম কার্দাশিয়ান

ঠান্ডায় অসাড় জাহ্নবী তবু শুটিংয়ে উচ্ছ্বসিত

ঠান্ডায় অসাড় জাহ্নবী তবু শুটিংয়ে উচ্ছ্বসিত

বাপ্পার আক্ষেপ

বাপ্পার আক্ষেপ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম