বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ
মৌলভীবাজারে ব্যক্তিগত কাজে বন কর্মকর্তার দুই গাড়ি
বহিরাগত নারী নিয়ে সরকারি বাসায় রাত যাপন * কর্মচারীকে দিয়ে করান শরীর ম্যাসাজ
Advertisement
হোসাইন আহমদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বহিরাগত রমণী নিয়ে সরকারি বাসায় রাত যাপন করেন মৌলভীবাজারের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন সরকারি দুটি গাড়ি। কর্মস্থলে না গিয়ে অধিকাংশ সময়ই বাসায় কাটান। কর্মচারী কাশেমকে দিয়ে তিনি বডি ম্যাসাজও করান। এছাড়া কর্মচারীদের তটস্থ রাখতে অকারণে শোকজ করেন। চাকরি খাওয়ার ভয় দেখান প্রতিনিয়ত। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেন কর্মচারীদের। সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জানা গেছে, স্বৈরাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জুলাই গণ-অভুত্থান পরবর্তী সময়ে এক বছর তাকে ঢাকা বন অধিদপ্তরে ওএসডি করে রাখা হয়। যুগান্তরের দীর্ঘ তিন মাসের অনুসন্ধানে এমন চিত্র ওঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ২৫ আগস্ট মৌলভীবাজারের সিলেট বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কার্যালয়ে যোগদান করেই ফের স্বৈরাচার শাসনামলের মতো বেপোরোয়া হয়ে ওঠেন মো. আবুল কালাম। নিজেকে স্বঘোষিত বনের রাজা বলে দাবি করেন। তার আগের কর্মস্থলেও একইভাবে কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও অনৈতিক কার্যক্রমের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। যশোর সামাজিক বন বিভাগে স্টাফদের সঙ্গে অসদাচরণ করায় তারা কালামকে অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখেন। কর্মচারীদের টাকা দিয়ে বাজার ও নাস্তা করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার স্ত্রীর সঙ্গেও রয়েছে দূরত্ব। দায়িত্বশীল সূত্র ও সংগ্রহে থাকা ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৪ জুলাই রাত ১২টার দিকে নিজের ব্যবহৃত সরকারি গাড়ি নিয়ে শেরপুর যান এবং সেখান থেকে এক রমণীকে তিনি গাড়িতে করে ১২টার ৪৯ মিনিটে সরকারি বাসায় নিয়ে আসেন বন কর্মকর্তা কালাম। সেখানে তাকে নিয়েই রাত যাপন করেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো-সেদিনের ট্যুর বইতে তিনি লিখেছেন, রাত ১২টায় শেরপুরে অভিযান চালিয়ে একটি পাখি ধরে নিয়ে আসেন এবং ২৫ জুলাই অবমুক্ত করেন। রমণীকেই তিনি পাখি বুঝিয়েছেন। সূত্র বলছে, খাবার টেবিলে একজন অপরজনকে মুখে খাবার তুলে খাওয়াতেন। আগন্তুক রমণী নিজেকে সরকারি চাকরিজীবী হিসাবে পরিচয় দিতেন কর্মচারীদের কাছে। এ রমণী গত কোরবানির ঈদের পরপর এবং ঈদের এক মাস আগেও একবার এসেছিলেন। সূত্র আরও জানায়, ঢাকা থেকে এ রমণী মৌলভীবাজারে এলে বাসার দ্বিতীয় তলায় ওঠা নিষেধ ছিল কর্মচারীদের। কর্মচারীরা বলছেন, ঢাকা থেকে এ রমণী এলে দুটি বিছানা প্রস্তুত করে রাখলেও ব্যবহার হতো একটি। ওই বন কর্মকর্তার আগের কর্মস্থলেও খোঁজ নিয়ে এমন অনৈতিক কাজের ফিরিস্তি পাওয়া যায়।
স্টাফদের পোশাক ও জুতা ক্রয়ে তিনি চরম অনিয়ম করেছেন। নিম্নমানের পোশাক ও জুতা দিয়েছেন তাদের। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করে টাকা ভাগবাঁটোয়ারা করেছেন তিনি। সরকারি গাড়ি ব্যবহারে কর্মকর্তাদের মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। কিন্তু বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম সরকারের সে নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে একাই দুটি গাড়ি ব্যবহার করছেন। স্বজন ও পরিচিতজনরা এলে সরকারি গাড়ি দিয়েই ঘোরাফেরা করান তিনি। অভিযোগে জানা যায়, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক ও অফিস সংস্কারের জন্য ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। সে কাজ পায় আয়ুব অ্যান্ড ব্রাদার্স। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম নিজেই কাজ করান। অভিযোগ রয়েছে, ওয়ার্ক অর্ডার কিংবা এস্টিমেট অনুযায়ী কাজ হয়নি। নামকাওয়াস্তে কাজ করে অর্ধেকের বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, ‘ওই মহিলা আমার বোন।’ বোনকে কী আপনি মুখে তুলে ভাত খাওয়াতে পারেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি মিথ্যাচার। সরকারি গাড়ি দিয়ে তাকে রিসিভ করা এবং আবার গাড়িতে তুলে দেওয়া কতটুকু আইনসম্মত-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো উত্তর দেননি। অনিয়মের অন্যান্য অভিযোগ ও কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
