কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা
শিক্ষক বদলিতে বাণিজ্য
Advertisement
আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদলিতে মানা হয়নি সরকারি কোন বিধিবিধান। অর্থ বাণিজ্য এবং তদবিরের জোরে বদলির আদেশ জারি করা হয় রাতে। অভিযোগের মূল তীর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবু বকর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে। বদলি বাণিজ্যের ঘটনায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে সাধারণ শিক্ষকের মাঝে। বৃহস্পতিবার এ তথ্য ফাঁস হলে শিক্ষা বিভাগে তোলপাড় শুরু হয়।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিকের বিরুদ্ধে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলিতে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ‘বদলি বাণিজ্যের’ গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বিধিবিধান ভেঙে শূন্যপদ না থাকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, আবেদন না করা শিক্ষককে বদলি এবং শূন্যপদে আবেদন করেও শিক্ষককে বঞ্চিত করার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে। সহকারী শিক্ষক মতিউর রহমান বলেন, তিনি যথা সময়ে যতিনেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রথম চয়েস দ্বিতীয় চয়েস বেলগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং তৃতীয় চয়েস ভেলাকোপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবেদন করেন। তিনি ২০১২ সালের ২ সেপ্টেম্বর চাকরিতে যোগদান করেন। অথচ যতিনেরহাট বিদ্যালয়ে দেওয়া হয়েছে পাপড়ি রাণীকে। তিনি ২০২২ সালে ফুলবাড়ি উপজেলা পরিবর্তন করে সদরের রেল বাজারের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। একইভাবে বেলগাছা ও ভেলাকোপা স্কুলে যাদের বদলি করা হয়েছে তারা আমার জুনিয়র। কাজেই এ বদলি প্রক্রিয়া পুরোপুরি পক্ষপাতদুষ্ট এবং অনিয়ম করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বদলি বঞ্চিত একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, বদলির ক্ষেত্রে নিয়মনীতি ও জ্যেষ্ঠতার তোয়াক্কা না করে পছন্দের শিক্ষকদের শুধু টাকার জন্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কোথাও জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলে কনিষ্ঠ শিক্ষক বদলি পেয়েছেন, কোথাও আবার শূন্যপদ না থাকা বিদ্যালয়েও দেওয়া হয়েছে পদায়ন।
সদর উপজেলার পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও চৈতার খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুর রহিমকে ওই বিদ্যালয়ে বদলি করার অভিযোগ উঠেছে। জনশ্রুতি রয়েছে এজন্য আব্দুর রহিমকে গুনতে হয়েছে লাখ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, শূন্যপদের তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম না থাকার পরও সেখানে শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. ফরিদা বেগমকে ১১ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে পেছনে ফেলে পৌর এলাকার ভেলাকোপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
একই বদলি আদেশে আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠতার ক্রম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের দাবি, জ্যেষ্ঠতার নির্ধারিত ক্রম যদি অনুসরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে ফরিদা বেগম কীভাবে ১১ জনকে পেছনে ফেলে বদলির সুযোগ পেলেন-এটি তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগ উঠেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা উপেক্ষা করে শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন দোবারিয়ার ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকার, চাকেন্দা খানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রোকসানা পারভীন, রেলবাজার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পাপড়ি রানী এবং পরমালী বড়ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুনিরা আক্তার। রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আতাউর রহমানকে। তাকে নীতিমালা লংঘন করে পাঁচ পোস্টের বিদ্যালয় খেওয়ার আলগার চর স্কুল থেকে সরিয়ে আনা হয়।
পরমালী বড়ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুনিরা আক্তারের বদলি নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয়করণ করা হলেও তার চাকরিকাল কাগুজে কলমে দেখানো হয় ২০১০ সালের ৫ আগস্ট। এদিকে বদলির আবেদন না করেও সারডোব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদা আক্তারকে বালাকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। অথচ ২০টি শূন্যপদের বিপরীতে ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেছেন, সেখানে আবেদন না করা একজন শিক্ষক কীভাবে চূড়ান্ত বদলি তালিকায় স্থান পেলেন তা মানতে পারছেন না বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকরা। অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দীক বলেন, ‘উৎকোচ নিয়ে বদলির বিষয়টি সঠিক নয়। বদলি করার ইখতিয়ার আমার হাতে নেই। বদলি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদেশ দেওয়া হয়েছে। ভুল ইনফরমেশন এবং নানাবিধ চাপের কারণে একটু অনিয়ম হয়েছে । নিউজ করলেও আমার কিছুই করার নাই।’
উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির উত্থাপিত যে আবেদনগুলো আমরা পেয়েছি, সেই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে বদলি করা হয়েছে। তবে যদি কেউ মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে বদলিতে ভূমিকা পালন করে থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় বলেন, সরকারি বিধিবিধান মেনে উপজেলা শিক্ষা কমিটি বদলির সুপারিশ করবেন। এটাই নিয়ম। তবে ব্যাত্যয় ঘটলে তার দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। কোন অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের পরিপেক্ষিতে প্রয়োজনে রিভিউ করা হবে।
