বৃক্ষমানব একরামুলের জীবনযুদ্ধ
এক পা অচল অন্যটিও দুর্বল তবুও অদম্য
Advertisement
আব্দুল কুদ্দুছ বসুনিয়া, কাউনিয়া (রংপুর)
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্র্যাচে ভর দিয়েও ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। একটি পা প্রায় অচল, অন্য পা-টিও দুর্বল। অথচ জীবিকার তাগিদে সেই একরামুলই উঠে যান গাছের মগডালে। এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে লাফিয়ে কাটেন ডালপালা। প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজ করেই চলে তার জীবন-সংসার। ৩৩ বছর বয়সি একরামুল হকের বাড়ি কাউনিয়ার দক্ষিণ মদামুদন এলাকায়। ১৫ বছর বয়স থেকেই গাছের ডালপালা কাটার কাজ করছেন তিনি। এ কাজ করে প্রতি মাসে তার আয় হয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এ আয় দিয়েই স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ করেন তিনি। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেও কিছু সহায়তা পান, তা সংসারে কিছুটা স্বস্তি জোগায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অন্য আট-দশটি শিশুর মতোই স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিয়েছিল একরামুল। কিন্তু মাত্র তিন বছর বয়সে পোলিও আক্রান্ত হয়ে তার একটি পায়ের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। অন্য পা-টিও অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে তিনি। এরপর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কারও কাছে হাত না পেতে নিজের কর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছেন একরামুল। সারাদিন ক্র্যাচে ভর দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। খুঁজে দেখেন কোথাও গাছের ডালপালা কাটার কাজ পাওয়া যায় কি-না। কাজের কথা পাকা হলেই সেখানে গিয়ে ক্র্যাচ রেখে গাছ বেয়ে উঠে পড়েন। মুহূর্তেই উঠে যান গাছের মগডালে। কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছেও লাফিয়ে চলে যান। একরামুলের বাবা আবদুল করিম ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই বলতেন, জীবন যত কঠিনই হোক, কারো কাছে হাত পেতে খাওয়া যাবে না। সে কথাই যেন জীবনের মূলমন্ত্র করে নিয়েছেন একরামুল। স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, তিন ভাই ও এক বোন নিয়ে একরামুলের পরিবার। দুই ভাইয়ের আলাদা সংসার। বোনকে বিয়ে দেওয়া হলেও তার সংসার টেকেনি। ফলে পরিবারের বড় একটি দায়িত্ব একরামুলের কাঁধেই। একরামুলের গাছে ওঠা-নামার দৃশ্য আশপাশের মানুষের জন্য যেমন বিস্ময়ের, তেমনি উদ্বেগেরও। স্ত্রী হাসনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামীর বয়স বেড়ে গেছে, তার শরীরে শক্তি কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন আমরা ঝুঁকিপূর্ণ গাছের ডাল কাটা কাজে যেতে বাধা দিচ্ছি। তিনি কারও কথা শোনেন না, পেটের দায়ে কাজে চলে যান। তাই সরকার বা বিত্তবান মানুষের কাছে আমার চাওয়া—ব্যাটারিচালিত একটি অটোগাড়ি বা গালামালের দোকান করার জন্য কিছু মূলধনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে আমার স্বামী গাছের ডাল কাটার ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি হয়তো ছেড়ে দিতে পারতেন।
