নেত্রকোনায় রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প
কাজের আগেই বিল
Advertisement
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জেলা হিসাব ও অর্থ কার্যালয়ে (অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স) সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিল নিষ্পত্তি, পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধার অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রধান হিসাব মহানিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষকের (সিএজি) কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেত্রকোনা জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. আবদুল গাফফার রয়েছেন। জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা মো. মনজুরুল কবীরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ২০ মে ই-টেন্ডার আহ্বান করা হয়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৫ টাকা ৮৯ পয়সা। পরে বগুড়ার সালেক সোলার পাওয়ার লিমিটেডকে কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবদুল গাফফারের অভিযোগ, কাজ পাওয়ার প্রায় এক মাসের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ও কার্যাদেশ সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই জেলা হিসাব ও অর্থ কার্যালয়ে বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিলের ভাউচার প্রস্তুত ও অনুমোদন করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সম্প্র্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ছাদে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শতাধিক সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রকল্পের মোট কাজের প্রায় অর্ধেক। তবে স্থাপন করা প্যানেলগুলোর সঙ্গে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজেরও উল্লেখযোগ্য অংশ বাকি রয়েছে। প্রকল্পের বিলসংক্রান্ত তথ্য জানতে জেলা হিসাব ও অর্থ কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য না দিয়ে এক সপ্তাহ সময় নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী দাবি করেন, ওই সময়ের মধ্যে তড়িঘড়ি করে বেশকিছু সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। শুধু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিল নয়, জেলা হিসাব ও অর্থ কার্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। বৈধ বেতন-ভাতা ও ইনক্রিমেন্টের বিল নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনসংক্রান্ত কাজেও অনৈতিকভাবে অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ঘুস বা কমিশন দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ৫ মে জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের উচ্চমান সহকারী আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের অফিস সহকারী এনামুল হক। যৌথ স্বাক্ষর করা ওই অভিযোগে কার্যালয়ের একজন অডিটর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হয়রানি, অসদাচরণসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। নেত্রকোনা পৌর শহরের সাতপাই এলাকার বাসিন্দা এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শিকা নাসিমা সিদ্দিকীর স্বামী মো. আবু তাহের বলেন, তার স্ত্রী গত ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যান। সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা টালবাহানা করা হচ্ছিল। পরে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে কাজটি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগকারী মো. আবদুল গাফফার বলেন, জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা মো. মনজুরুল কবীরকে এসব বিষয়ে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে তার অভিযোগ। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান সালেক সোলার পাওয়ার লিমিটেডের ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। অভিযোগের বিষয়ে জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা মো. মনজুরুল কবীর বলেন, রুফটপ সোলারের যে বিল দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের অন্য বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পটির কাজ চলমান রয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যেই কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর বিল দেওয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলের সমপরিমাণ অর্থের একটি চেক জামানত হিসাবে রাখা হয়েছে।’
