‘শান্তি’র কর্মে অশান্তির ছায়া
Advertisement
খোন্দকার রুহুল আমিন, টেকেরহাট (মাদারীপুর)
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নাম ‘শান্তি বেগম’ হলেও তার কাজে ছিল অশান্তির ছায়া। সাধারণ মানুষকে ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে ভাইয়ের মাধ্যমে নির্যাতন চালান। আর সেই ভিডিও স্বজনদের পাঠিয়ে হাতিয়ে নিতেন লাখ লাখ টাকা। এছাড়া লিবিয়ায় মাফিয়াদের সঙ্গে রয়েছে তাদের গভীর সখ্য। লোক ছাড়ানোর ব্যাপারে করতেন চুক্তিও। এভাবেই দুহাতে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিজ এলাকায় গড়ে তুলেছেন আলিশান ভিলা। অথচ তার স্বামী শাহ আলম পেশায় একজন ভ্যানচালক। স্বামী ভ্যানচালক হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এমন অট্টালিকা গড়ে উঠল, তা নিয়ে এলাকায় চলছে নানা কানাঘুষা ও ক্ষোভ।
মাদারীপুর সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নের ত্রিভাগদি গ্রামের তৈয়ব আলী ফকিরের মেয়ে শান্তি বেগম ও তার ভাই সোহেল ফকিরের বিরুদ্ধে উঠেছে এ মানব পাচার ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ। অনুসন্ধানে জানা যায়, মানব পাচারকারী হিসাবে শান্তি বেগমের নাম বেশ পরিচিত। তিনি অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে বহু লোককে ইতালি পাঠিয়েছেন। এ অপকর্মের মাধ্যমে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তার লোক পাঠানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার যুবকরা প্রবাসে যাওয়ার জন্য তার কাছে ভিড় জমাতেন। আর এ সুযোগকে কাজে লাগাতেন তিনি। বিভিন্ন সময় লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি করার নাটক সাজিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো। কেউ সহজে টাকা দিতে না চাইলে চালানো হতো অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। আর এসব নির্যাতনের মূল হোতা ছিলেন শান্তি বেগমের আপন ভাই সোহেল ফকির। এদের অপকর্মে ইতোমধ্যে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। তাই প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। ভয় ও আতঙ্কে এলাকার অনেকেই ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, এ ভাইবোনের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেকেই। তাদের পাঠানো অনেক তরুণের খোঁজ মেলেনি, আবার সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। অত্যন্ত চালাক প্রকৃতির হওয়ায় এরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কৌশলে আপস করে ফেলতেন অথবা বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতেন। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এত গুরুতর অপরাধের পরও কীভাবে তারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে এলাকায় থাকছে। সদর উপজেলার শ্রীনদী এলাকার রায়কান্দি গ্রামের হাতিম মোল্লা নামে এক ভুক্তভোগী জানান, ‘তার জামাতা শান্তি বেগমের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং পরবর্তীতে সমুদ্রপথে নৌকাডুবিতে সে মারা যায়। এছাড়া আরও ১৩ জন ওই নৌকাডুবিতে মারা যান। ওই নৌকায় শান্তি বেগমেরও পাঠানো বেশ কয়েকজন লোক ছিলেন। তবে শান্তি বেগম নৌকাডুবির ঘটনার পর এলাকার মাদবরদের ধরে আমাকে সালিশ মানতে বাধ্য করা হয়। সালিশে আমাকে কিছু টাকাও দেওয়া হয়। কিন্তু টাকায় কি সব পাওয়া যায়। আমি কি আমার জামাইকে ফেরত পাব।’ এ বিষয়ে শান্তি বেগমের বক্তব্য জানতে তার বাড়িতে গেলে স্বামী শাহ আলম দাবি করেন, তিনি ঢাকায় কাজে গেছেন। পরবর্তীতে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে শান্তি বেগম দাবি করেন, তিনি আগে এ কাজ করলেও দুই মাস ধরে লোক পাঠানো বন্ধ রেখেছেন। তবে নিহতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে, শান্তি বেগমের ভাই সোহেল ফকিরের খোঁজ নিতে বাড়িতে গেলে জানানো হয় তিনিও ঢাকায় আছেন। কিছুদিন হলো দেশে ফিরেছেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনিও একই দাবি করে জানান, তারা এখন আর লোক নেন না। এছাড়া নির্যাতন ও নিহতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে তাদের আপস-মীমাংসা হয়ে গেছে। মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিহা রফিক ভাবনা বলেন, শান্তি বেগম ও সোহেল ফকিরের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কেউ অভিযোগ দেন, তাহলে দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হবে।
