শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল
দায়িত্ব ফেলে ক্লিনিকে ডাক্তার
দালালচক্রের কাছে জিম্মি রোগীরা
Advertisement
কেএম রায়হান কবীর, শরীয়তপুর
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জেলা সদরে অবস্থিত শরীয়তপুর সদর হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী দালালচক্র ও অবৈধ ক্লিনিকের রমরমা বাণিজ্য। হাসপাতালের নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় রোগীর সেবা না করে ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখা এবং সময়মতো হাসপাতালে উপস্থিত না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে হাসপাতাল চত্বরে সক্রিয় দালালচক্র ছয়টি উপজেলার দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বাইরের ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে তারা প্রতারণার শিকার হয়ে আর্থিক ও শারীরিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এসবের পাশাপাশি হাসপাতালে নিয়মিত চুরির ঘটনাও ঘটছে। শরীয়তপুর সিভিল সার্জন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও এর কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না রোগীর স্বজনরা। বৃহস্পতিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের ১৫ থেকে ২০০ গজের মধ্যে ৬-৭টি এবং আরও একটু দূরে ৮-১০টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে শরীয়তপুর হাসপাতালের গেটের পূর্ব পাশে ফাতেমা ক্লিনিক, আল বারাকা হাসপাতাল, ডক্টর পয়েন্ট ডায়গনস্টিক, রুপসী বাংলা হাসপাতাল ও মেট্রো ক্লিনিক, কেয়ার ৯৮ ডায়াগনস্টিক, মর্ডান ডায়াগনস্টিক, খান ডায়াগনস্টিক, মক্কা ক্লিনিক ও ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অন্যতম। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেয়ার ৯৮ ডায়াগনস্টিক, মর্ডান ডায়াগনস্টিক, খান ডায়াগনস্টিক, নার্সিং হোম ও ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং সাগরিকা ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যূনতম নির্দেশনা মানছে না। এদের নেই ভৌত অবকাঠামোও। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের নেই পর্যাপ্ত ডিউটি ডাক্তার, ডিপ্লোমা নার্স, টেকনিশিয়ান কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। মূলত সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে ব্যবসা করাই এসব ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য। এসব ক্লিনিকের প্রচারসামগ্রী ও চিকিৎসক তালিকায় শরীয়তপুর হাসপাতালের চিকিৎসকদের নাম ব্যবহারের বিষয়টিও লক্ষণীয়। স্থানীয় আলিম মৃধা, রনি সরদার, নয়ন মিয়া, ময়না বেগমসহ অনেকের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা হয়। এরপর দালালের মাধ্যমে রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়। একাধিক রোগীর স্বজনের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও কাক্সিক্ষত সেবা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। সদর হাসপাতালের দেওয়াল ঘেঁষে ক্লিনিক গড়ে উঠলেও শরীয়তপুর জেলা সিভিল সার্জন অফিস কখনো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন বরাবর করা আবেদন সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার অফিস চলাকালীন ১টা ২০ মিনিটে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শরীয়তপুর আধুনিক সদর সরকারি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থেশিয়া) ডা. রফিকুল ইসলাম মামুন একটি বেসরকারি ক্লিনিতে রোগী দেখতে গেছেন। অথচ ওই সময়ে তার হাসপাতালেই ডিউটিতে থাকার কথা ছিল। অন্যদিকে, ডা. রফিকুল ইসলাম মানুনের স্ত্রী একই হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. ফাহমিদা নাজনীন, তার বোন নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ফারহান ডেইজীও হাসপতপালে তাদের ডিউটি চলাকালীন বিভিন্ন ক্লিনিকে রোগী দেখেন বলে একাধিক রোগীর স্বজনের অভিযোগ রয়েছে। তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শরীয়তপুর সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর গ্রামের মো. ওয়াসিম সরদার নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ফারহান ডেইজীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তকে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে ডা. রফিকুল ইসলাম মামুন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা। আমি অফিসের সময় কোনো ক্লিনিকে যাইনি। এসব বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ ক্লিনিকের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, ‘আমি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
