সড়কে স্বামীহারা, স্টেশনে জীবনযুদ্ধ
Advertisement
আসাদুজ্জামান খন্দকার, সাঘাটা (গাইবান্ধা)
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বামী মারা গেছেন ছয় বছর আগে। তখন আমিনা আক্তারের গর্ভে সন্তান। সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি। অনাগত সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। একসময় স্বামীর উপার্জনে চলত সংসার। সেই মানুষটি চলে যাওয়ার পর বদলে যায় জীবনের হিসাব। এখন নিজেই সংসারের হাল ধরেছেন আমিনা আক্তার। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া রেলস্টেশনে ভাপা পিঠা বিক্রি করে চালাচ্ছেন মা-মেয়ের সংসার।
আমিনার বাড়ি সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম রাঘবপুর গ্রামে। তার স্বামী হারুনের বাড়ি মৌলভীবাজার সদর এলাকায়। ঢাকায় প্রাইভেট পিকআপ চালিয়ে সংসার চালাতেন হারুন। তাদের সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও চলছিল স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু ঢাকায় পিকআপ চালানোর সময় সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান হারুন। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তাদের সাজানো সংসার। স্বামীর মৃত্যুর সময় আমিনার গর্ভে ছিল সন্তান। পৃথিবীতে আসার আগেই বাবাকে হারায় শিশুটি। স্বামী হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন আমিনা। এরপর থেকে ছয় বছর ধরে শোক আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে আছেন তিনি।
বর্তমানে বোনারপাড়া রেলস্টেশনে নিজের মা শহীদা বেগমের সঙ্গে ভাপা পিঠা বিক্রি করেন আমিনা। পাশে থাকে তার মেয়ে আরিফা। পিঠা বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে চলে তাদের সংসার। প্রতিদিনের সামান্য উপার্জনেই মেটে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা। আয় কম হলে সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। স্টেশনে ট্রেনের শব্দ, যাত্রীদের ব্যস্ততা আর মানুষের ভিড়ের মধ্যে পিঠা বিক্রি করেন আমিনা। অনেকের কাছে ভাপা পিঠা শীতের সকালের প্রিয় খাবার। কিন্তু তার কাছে প্রতিটি পিঠা বিক্রি মানে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা। এই সামান্য আয়ের মধ্যেই মেয়েকে নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব সামলানোর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আমিনা। একসময় যিনি পরিবারের ভরণপোষণ করতেন, তার অনুপস্থিতিতে প্রতিদিনই নতুন করে লড়তে হচ্ছে তাকে। তবু থেমে যাননি। সন্তানকে বড় করে তোলা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় প্রতিদিন স্টেশনে ছুটে আসেন।
আমিনার জীবনসংগ্রাম সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারের দুর্দশার একটি প্রতিচ্ছবি। একটি দুর্ঘটনায় শুধু একজন মানুষের মৃত্যু হয় না, ভেঙে পড়ে একটি পরিবারও। স্বামী হারিয়ে অনেক নারীকে একাই সামলাতে হয় সন্তান লালনপালন, জীবিকা ও সংসারের দায়িত্ব। আবার অনেক শিশু জন্মের আগেই হারায় বাবার স্নেহ-ভালোবাসা। আমিনার প্রত্যাশা, সড়কে আর কোনো পরিবার যেন এমন দুর্ভাগ্যের শিকার না হয়। দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জন্যও প্রয়োজন সহায়তা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন।
বোনারপাড়া রেলস্টেশনে ভাপা পিঠা বিক্রি করতে থাকা আমিনা আক্তার আজও জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বামী হারানোর শোক বুকে চেপে প্রতিদিনের আয় দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তার জীবন যেন মনে করিয়ে দেয়, সড়কে একটি প্রাণ ঝরে গেলে তার ক্ষত শুধু একটি পরিবারকেই নয়, পরবর্তী প্রজন্মকেও বহন করতে হয়।
