যাত্রীদের জীবন বাঁচিয়ে পঙ্গু দুলু
১৭ বছরে সেই যাত্রীরা কেউ খোঁজ নেয়নি * কর্ম নেই, দিন কাটে খেয়ে না খেয়ে
Advertisement
আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনটা এমন দুর্বিষহ হবে কোনোদিন কল্পনাতেও ভাবিনি। দূরপাল্লার বাসে হেলপারের কাজ নিয়ে বিয়ে করি। ঘরে নতুন বউ সুখী সংসারের স্বপ্ন বুনি। কাজ করি নতুন উৎসাহে। সব ঠিকঠাক চলছিল। একটা সড়ক দুর্ঘটনায় উলটপালট হয়ে গেল গোটা জীবন। একটা স্বপ্নের পতন। ১৭ বছর ধরে কষ্ট আর যন্ত্রণার জীবন। ধুঁকে ধুঁকে জীবন চলছে। অর্থাভাবে চিকিৎসা প্রায় বন্ধ। ডাক্তারের পরামর্শ মতে একাধিক অস্ত্রোপচার করতে হবে, লাগাতে হবে কৃত্তিম হাড়। এ জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০-১২ লাখ টাকা। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে এ টাকা জোগাড় প্রায় অসম্ভব। তাই তিনজনের সংসার এখন কাটে অনাহার, অর্ধাহার আর অনিশ্চয়তায়। এমনই আকুতি নিয়ে জীবন সংগ্রামের কথা বলছিলেন কুড়িগ্রাম সদরের পিটিআই সংলগ্ন বস্তিতে বসবাস করা দুলু। দুলু বলেন, বিয়ের মাত্র তিন মাস পর ২০০৯ সালের ১৩ মে মোল্লা এন্টারপ্রাইজে হেলপার হিসাবে সকালে ৪০ জন যাত্রী নিয়ে ফিরছি কুড়িগ্রাম। দুপুরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ওভার ব্রিজের কাছে ঘটে দুর্ঘটনা। গাড়িতে তখন যাত্রীদের আহাজারি, জীবন বাঁচানোর আকুতি। প্রথমে একটা বাসের সাইডে আঘাত লেগে সামনের গ্লাস ভেঙে গিয়ে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ড্রাইভার রিপন গাড়িটি নিউটালে রেখে পালিয়ে যায়। বাসের কন্ট্রাক্টর নেমে যায়। গাড়ি একা চলছে, সাথে যাত্রীদের কান্না আর চিৎকার। বিবেকের তাড়নায় যাত্রীদের বাঁচাতে চলন্ত বাসে একটা গিয়ার ফেলতে যাই। যেন গাড়িটা গড়িয়ে খাদে না পড়ে। তারুণ্যের শক্তিতে গিয়ার ফেললাম ঠিকই। নিজের পা আর সরাতে সুযোগ পেলাম না। বিপরীত থেকে আসা একটি ট্রাকে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো। বাসের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে বাম পা আটকে গেল। যাত্রীরাও অনেকে আহত হলো, ঠিকই কিন্তু সবাই নিরাপদে বের হলো। কিন্তু আমি আটকা থাকলাম বাসে। পরে বাসের ইঞ্জিনের অংশের প্লেন শিট কেটে আমাকে বের করে। রক্তে ভেসে যায় শরীর। টাঙ্গাইল হাসপাতাল হয়ে ঢাকা পিজি হাসপালে ভর্তি করানো হয়। এরপর নেওয়া হয় পঙ্গু হাসপাতালে। এভাবেই হাসপাতালে ৬ মাস কেটে যায়। এরপর বাড়িতে এনে রাখা হয়। প্রায় ৫ বছর ছিলাম শয্যাশায়ী।
কুড়িগ্রাম সদরের পিটিআইসংলগ্ন বস্তিতে দুই ছেলেকে নিয়ে বসবাস। সংসার চলে না। তাই বড় ছেলেকে পড়ালেখা বাদ দিয়ে মোটরসাইকেল মেকারের দোকানে কাজে দিয়েছে। আর স্বামী-স্ত্রী মিলে কলেজ মোড়ে একটা পানের দোকান চালায়। সেখান থেকে গড়ে দিনে আয় হয় ৩০০-৩৫০ টাকা। দুলু মিয়া বলেন, যাদের বাঁচাতে জীবন বাজি রেখে দুর্ঘটনার শিকার হলাম, আজ ১৭ বছরে তারা কেউ খোঁজ নেয়নি। চারজনের সংসার চলে অনাহার অর্ধাহারে। চিকিৎসা করাব কেমনে। রাস্তায় শ্রমিক কল্যাণের নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা উঠছে। অথচ ১৭ বছরে আমার কোনো কল্যাণ হয়নি। তা হলে কার কল্যাণ হচ্ছে এ প্রশ্ন দুলুর। দুলুর স্ত্রী কল্পনা বেগম জুঁই বলেন, আমাদের জীবনে এত কষ্ট গেছে তা বলে বোঝাতে পারব না। ঘরে ভাত ছিল না। পড়ার মতো কাপড় চোপড় ছিল না। সবই অন্যদের সাহায্য সহযোগিতায় চলেছি। বিয়ের তিন মাসের মাথায় স্বামীর ওই দুর্যোগ।
