মা-বাবাকে হারিয়েও থামেনি তাহমিনা
Advertisement
এমএ মান্নান, লাকসাম-মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা)
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তাহমিনা যখন নবম শ্রেণির ছাত্রী, তখন ক্লাস চলাকালীন সময় হঠাৎ করে পরিবার বা শিক্ষকদের মাধ্যমে তার বাবা-মায়ের আকস্মিক মৃত্যুর খবর আসে। এক ঝোড়ো দিনে একটি সড়ক দুর্ঘটনা তার পুরোপৃথিবী ওলটপালট করে দেয়। এই চরম সত্যটি জানার পর ওই শিক্ষার্থীর যে বুকফাটা কান্না বা শোকাতুর পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা যে কোনো মানুষের চোখেই জল এনে দেয়। এক নিমিষেই সে তার বাবা ও মা দুজনকে একসঙ্গে হারায়। যে মেয়েটি সকালে বাবা-মায়ের আদরে ঘুম থেকে উঠত, স্কুলে পাঠানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ত বাবা-মা। সেই বাবা ও মায়ের নিথর দেহ পড়ে আছে বাড়ির উঠানে-পরিবারের সদস্য, স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কেউই মেয়েটির সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না, নিস্তব্ধ বাড়িতে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ে। পরিবারে সদস্যদের সান্ত্বনা আর প্রতিবেশীদের সহানুভূতি প্রথম কয়েক দিন থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই যে যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাহমিনা আক্তারের সামনে তখন দুটি পথ খোলা ছিল-হয় ভাগ্যের দোহাই দিয়ে কান্নাকাটি করে জীবনটাকে থামিয়ে দেওয়া, না হয় বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য উঠে দাঁড়ানো। তাহমিনা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেয়। সব বাধা পেরিয়ে তাহমিনা কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা আর দিনের বেলা কলেজে-এটাই চলছে তার রুটিন। তবে এই চরম নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও তাহমিনা যেভাবে ভেঙে না পড়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ভাগ্যের ওপর দোষ না চাপিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তার এই লড়াই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বলছি প্রায় পাঁচ বছর আগে মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিপুলাসার ইউনিয়ন সাইকচাইল গ্রামের দেলোয়ার প্রকৌশলীর বাড়ির বাসিন্দা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রুহুল আমিন ও শেফালী বেগম নামের এক দম্পতি মেয়ে তাহমিনা আক্তার কথা। জানা যায়, ২০২১ সালে ২ নভেম্বর নিজ বাড়ির থেকে অটোরিকশা করে রুহুল আমিন তার স্ত্রী শেফালী বেগমকে সঙ্গে নিয়ে করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য উপজেলা উদ্দেশ্য রওনা দেন। সকাল ৮টায় দিকে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের বিপুলাসার ইউনিয়নের বিহড়া নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে মারা যান ওই দম্পতি। নিহত ওই দম্পতির দুই ছেলে চার মেয়ে রয়েছে এদের মধ্যে তাহমিনা আক্তার সবার ছোট। বড় দুই ভাই প্রবাসে কর্মরত, তিন বোন বিয়ের পর থাকছে স্বামীর বাড়িতে আর তাহমিনা আক্তার বাবার বসতঘরে ভাই-ভাবিদের সঙ্গে থেকে পড়াশোনা করছেন। বর্তমান তাহমিনা আক্তার লাকসাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বাবার জমানো অল্প কিছু টাকা আর ভাইদের স্নেহ ভালোবাসা ও সাহসিকতা নিয়ে লেখাপড়া করছেন তিনি। কিন্তু এ লড়াই কতদিন চলবে, তাকে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে একদিন!
তাহমিনা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় অনুভূতিগুলোর একটি হলো- আমার মা নেই, বাবা নেই। মা-বাবাকে হারানোর কষ্ট কোনো দিন ভুলতে পারব না। ভাইদের স্নেহ-ভালোবাসা ও সাহস নিয়ে পড়াশোনা করছি। একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তা হয়ে মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আমার স্বপ্ন পূরণে সবার কাছে দোয়া চাই।’
