চায়না দুয়ারি জালে হুমকিতে হাওড়ের মাছ ও জীববৈচিত্র্য
প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও নেই কার্যকর পদক্ষেপ * পেশা হারানোর শঙ্কায় জেলেরা
Advertisement
কামাল হোসাইন, নেত্রকোনা
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেত্রকোনার ছোট-বড় ১৩৪টি হাওড়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে নির্বিচারে মাছ ও জলজ প্রাণী নিধন চলছে। প্রতিটি হাওড়েই শত শত সূক্ষ্ম ফাঁসের চায়না দুয়ারি জাল পেতে মাছ ধরছেন শিকারিরা। এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি মাছের পোনা, মা মাছ এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ছে। এতে হাওড়ের মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় জেলেদের আশঙ্কা, এভাবে মাছের পোনা ও প্রজননক্ষম মাছ নিধন অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে হাওড়গুলোতে মাছের সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তবে দুর্গম হাওড় এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রশাসন। চায়না দুয়ারি জাল মূলত মাছ ধরার বিশেষ ধরনের ফাঁদ। জালের দুই পাশে প্রবেশপথ বা ‘দুয়ার’ থাকে। মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী এসব পথে ভেতরে ঢোকার পর আর বের হতে পারে না। এ জাল ‘চায়না রিং জাল’ নামেও পরিচিত। স্থানীয়ভাবে ৫০-২০০ হাত পর্যন্ত লম্বা জাল তৈরি করা হয়। জালের ভেতরে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর রিং বসানো থাকে। পানিতে পেতে রাখার পর এর ফাঁদে বিভিন্ন আকারের মাছ ও জলজ প্রাণী আটকা পড়ে। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইনে সরাসরি ‘চায়না দুয়ারি জাল’ শব্দ বন্ধের উল্লেখ নেই। তবে আইনে মাছ ধরার জন্য মাটিতে গেঁথে বা অন্য কোনো উপায়ে স্থির করা জাল, খাঁচা, মৎস্য ফাঁদ কিংবা মাছ ধরার অন্য কোনো কৌশলকে ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ বলেন, চায়না দুয়ারি জাল ফিক্সড ইঞ্জিনের আওতায় পড়ে। এ কারণে এটি অবৈধ। এভাবে চলতে থাকলে খাল-বিল, নদী-নালা, হাওড়-বাঁওড়ে একসময় মাছ পাওয়া যাবে না।
নিষিদ্ধ হলেও নেত্রকোনার বিভিন্ন হাটবাজারে প্রকাশ্যেই চায়না দুয়ারি জাল বিক্রি হচ্ছে। মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা ও বারহাট্টার বিভিন্ন বাজার, হাওড়ের লেপসিয়া বাজারে দিনে-রাতে এসব জাল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৫-১০২ হাত পর্যন্ত লম্বা চায়না দুয়ারি জালের দাম ৪-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। জাল ও রিং সহজলভ্য হওয়ায় স্থানীয়ভাবেও এসব জাল তৈরি করা হচ্ছে। শুধু হাটবাজারেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে এর বেচাকেনা। ‘চাইনা রিং জাল পাকাড়ি বাজার’সহ বিভিন্ন ফেসবুক পেজে চায়না রিং জাল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ চায়না দুয়ারি জালের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে ১৩ এপ্রিল দেশের সব বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালকদের চিঠি দেয় মৎস্য অধিদপ্তর। এতে অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ওই নির্দেশের পর নেত্রকোনায় কতটি অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে, তার সমন্বিত তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাওয়া যায়নি। মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকটের পাশাপাশি হাওড়ের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা অভিযানের ক্ষেত্রে বড় বাধা। অবশ্য বৃহস্পতিবার খালিয়াজুরীর হাওড়ে অভিযান চালিয়ে ৭৮টি চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। নেত্রকোনা আবু আব্বাছ কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল কবীর সরকার বলেন, চায়না দুয়ারি জালে মাছ, মা মাছ, মাছের পোনার পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণীও ধরা পড়ে। ফলে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। হাওড় ও নদীর মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, দীর্ঘমেয়াদে তারাও পেশা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। সর্বোপরি হাওড়ের মিঠাপানির মৎস্য সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার হুমকির মুখে পড়বে। ইউএনও অলিদুজ্জামান বলেন, হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে মানুষের চলাচলের রাস্তা নষ্ট করা এবং স্থায়ী স্থাপনা বসিয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হবে না। স্থানীয় জেলেদের দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ ও ধ্বংস করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধের পাশাপাশি হাওড়ের প্রবেশপথ ও বাজারগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে।
