গাছে গাছে মুগ্ধের সচেতনতার বাণী
Advertisement
আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফুলবাড়ীর পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুগ্ধের ব্যতিক্রমধর্মী সমাজ সচেতনতামূলক কাজে মুগ্ধ এলাকার সবাই। মুগ্ধ নিজের হাতের লেখা বিভিন্ন সচেতনতামূলক বাণী লিখে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দুপাশের গাছে ঝুলিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর বড়ভিটা ইউনিয়নের শাহবাজারের ঘোগারকুটি গ্রামের পাকা সড়কের দুপাশে সারিবদ্ধ গাছ। সেই গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে সুন্দর হাতের লেখায় কয়েকটি পোস্টার। এসব পোস্টারে লেখা-অকারণে গাছ কাটব না, পাখি আমাদের বন্ধু, মোড়ে গতি কমান জীবন বাঁচান বা মাদককে না বলুন, বাল্যবিয়েকে না বলুন, ট্রাফিক আইন মেনে চলুন।’ সড়কে এই পথ ধরে যারাই হেঁটে যাচ্ছেন, তারাই থমকে দাঁড়াচ্ছেন, পোস্টারের লেখাগুলো পড়ছেন আর বিস্মিত হচ্ছেন। এই পোস্টারগুলো লিখেছে ওই গ্রামেরই উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী মিছবাহুল ইসলাম মুগ্ধ।
মুগ্ধ বরাবর ক্লাসে প্রথম হয়। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে চিন্তা করে এলাকার জন্য, দেশের জন্য ভালো কিছু করার। এ জন্য সময় পেলেই সে রঙ-তুলি আর কাগজ নিয়ে পরম যত্নে মেঝেতে বসে বিভিন্ন বাণী লেখে। স্কুলে টিউটোরিয়াল ক্লাস থেকে ছবি আঁকা ও সুন্দর হাতের লেখার হাতেখড়ি তার। আর সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সে এখন একাই বদলে দিচ্ছে চারপাশের চিরচেনা রূপ। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছে ক্লাসের সহপাঠী ও এলাকার শিশুরা। মুগ্ধ নিজের সাইকেলে বা হেঁটে হেঁটে বন্ধুদের নিয়ে সুতো দিয়ে গাছের গায়ে পোস্টার লাগায়। এ জন্য সে একটি মইও তৈরি করেছে।
পথচারী রিয়াজুল ইসলাম জানান, ‘আমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় লেখাগুলো দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি। এত ছোট্ট একটা ছেলে, এত সুন্দর চিন্তা করতে পারে, তা ভাবাই যায় না।’
মুগ্ধর মা মমতা বেগম জানান, ‘আমার ছেলে ঘরে থাকা বিভিন্ন কার্টন কেটে খাতার পৃষ্ঠা ছিড়ে বিভিন্ন বাণী লিখে জমা করত। এরপর পাড়ার বন্ধুরা মিলে একটি মই তৈরি করে আমার কাছ থেকে আটা আর সুতো কিনে সেগুলো নিয়ে বাইরে যায়। পরে পাড়ার লোকজন এসে বলতে লাগল, তোমার ছেলে পুরো গ্রামজুড়ে গাছের মধ্যে পোস্টার লাগিয়ে বেড়াচ্ছে। কথাগুলো শুনে আমরা বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। ছেলে যে এ ধরনের পরিকল্পনা করেছে, তা আমার জানা ছিল না। ওর জন্য সবাই দোয়া করবেন। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য যেন সবসময় ভালো কিছু করে।’
মুগ্ধর বাবা ফুলবাড়ী শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুজাউদ্দৌলা জানান, ‘স্কুল ছুটি শেষে বাসায় ফিরছিলাম, সবাই বলাবলি করছে-মুগ্ধ গাছে গাছে যেন কি লাগাচ্ছে। আমি সড়কের দুপাশে তাকিয়ে লক্ষ করি, আমার ছেলের হাতের লেখা পোস্টার! সুন্দর সুন্দর নীতিবাক্য লিখে ছড়িয়ে দিয়েছে। গোপনে এসব কাজ করছিল সে। আমাকে জানায়নি। আমি সত্যি অবাক হয়ে গেছি। এত ইমোশনাল হয়ে গেছি যে, বাসায় এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। আপনারা দোয়া করবেন, ছেলে যতদিন এ ধরনের কাজ করবে ততদিন আমি তাকে বন্ধুর মতো সহযোগিতা করব।’
উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী জানান, ‘টিউটোরিয়াল ক্লাসে ছবি আঁকা, পোস্টার-প্লাকার্ড ও হাতের লেখা শেখানো হতো। মুগ্ধর হাতের লেখা ভালো ছিল। সবসময় নতুন কিছু করতে চাইত। সেই চাওয়া থেকে হয়তো এমন ভালো কাজ করতে পেরেছে সে। এভাবে সব শিক্ষার্থী যদি সামাজিক জনসচেতনতামূলক কাজে এগিয়ে আসে, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে।’
দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট মুগ্ধ বলে, ‘আমি গ্রামের মানুষকে নিয়ে ভাবি। এলাকার অনেক মানুষ পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন নয়, তারা অকারণে গাছ কেটে ফেলছে, বাড়ির চারপাশ নোঙরা করে ফেলছে, অনেকে মাদকাসক্ত। এসব মানুষকে সচেতন করার জন্য পোস্টার লিখে বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তার দুপাশে লাগিয়ে দেই। যাতে তারা মনে করে, অনেক কাজ আছে যেগুলো তারা না করলেও পারে। আমার এই ছোট্ট কাজে যদি একজন মানুষও সচেতন হয়, সেটিই হবে আমার সফলতা। এই কাজ আমি চালিয়ে যাব।’
