রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
বিনা রসিদে অর্থ আদায়
আলট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে পরীক্ষার টাকা কোষাগারে জমা হওয়া নিয়ে প্রশ্ন
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষায় রসিদবিহীন অর্থ আদায় ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান ও আউটসোর্সিং কর্মী সবুজের বিরুদ্ধে। গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবায় রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও দেওয়া হচ্ছে না কোনো রসিদ। ফলে রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী অল্প খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০টি এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। তবে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষায় রসিদ ছাড়া সেবা দেওয়ায় রোগীদের কাছ থেকে কি পরিমাণ টাকা আদায় করা হয় তা অজানা থেকে যায়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আউটসোর্সিং কর্মী হিসাবে কর্মরত সবুজ নামের এক ব্যক্তি প্রতিটি এক্স-রে করার জন্য রোগীদের কাছ থেকে ২১০ টাকা করে নেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। অন্যদিকে, হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান নিজেই আলট্রাসনোগ্রাফি করেন এবং রোগীদের কাছ থেকে ২২০ টাকা করে নেওয়া হলেও সেখানেও রসিদ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন সেবাগ্রহীতারা।
স্থানীয় ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বশীল কয়েকজনকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে রসিদ ছাড়াই রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। আর এসব অর্থ যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কিনা তার স্বচ্ছ হিসাবও দৃশ্যমান নয়। রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে অথচ তার বিপরীতে সরকারি রসিদ দেওয়া হবে না এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির নামে আদায় করা অর্থের প্রকৃত হিসাব, প্রতিদিনের পরীক্ষার সংখ্যা, রসিদ বই, কম্পিউটার ডেটা, ক্যাশবুক এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আউটসোর্সিং কর্মী, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অর্থ জমার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা জরুরি বলে দাবি করা হচ্ছে। দিঘীরপাড় এলাকার মিজান নামের এক যুবক তার দাদিকে বুকের এক্স-রে করাতে নিয়ে আসেন। এজন্য তাকে দিতে হয় ২০০ টাকা। কিন্তু টাকা নেওয়া হলেও দেওয়া হয়নি কোনো রসিদ। মিজান বলেন, আমাকে বলা হয়েছিল রসিদ পরে দেওয়া হবে। এক্স-রে করাতে ২০০ টাকা নিয়েছে, রসিদ না দেওয়ায় এই টাকা কোথায় যাচ্ছে তার কোনো হিসাব থাকবে না। একইভাবে পায়ের এক্স-রে করাতে আসা নিজাম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকেও ২০০ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু তাকেও রসিদ দেওয়া হয়নি। হরিশপুর এলাকার রিজিয়া পড়ে গিয়ে হাতে ব্যথা পাওয়ার পর এক্স-রে করাতে আসেন। তার কাছ থেকেও ২১০ টাকা নেওয়া হয়। একইভাবে পারুলের হাতের এক্স-রে করাতেও নেওয়া হয় ২১০ টাকা। কিন্তু তাদেরও রসিদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
খবির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে ২২০ টাকা দেন। কিন্তু তাকেও কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। একইভাবে ফোরদৌস ও সুমি নামের দুই সেবাগ্রহীতার কাছ থেকেও ২২০ টাকা করে নেওয়া হলেও তাদেরও রসিদ দেওয়া হয়নি। আলট্রাসনোগ্রাফি কক্ষে দায়িত্বে থাকা এক নারী কর্মী এসব টাকা গ্রহণ করছিলেন বলে জানান তারা।
হাসপাতালে এক্স-রে টেকনিশিয়ান পরিচয় দেওয়া সবুজ বলেন, প্রায় ৬ বছর ধরে হাসপাতালে মাস্টাররোলে কাজ করছি। রসিদ কেটেই এক্স-রে করার নিয়ম। তবে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়াই এক্স-রে করা হয় এবং পরে রসিদ কাটা হয়। প্রতিদিন ৫-৭টি এক্স-রে করা হয়। এক্সরে ফি ২১০ টাকা নেওয়া হয়। এরমধ্যে এক্স-রে ফি ২০০ টাকা এবং একটি খামের জন্য ১০ টাকা। এখানে কোনো অনিয়ম হয় না বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান বলেন, সপ্তাহে তিন দিন আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়, যা আমি নিজেই করে থাকি। এক নারী সহায়তা করে। লোকবল সংকটের কারণে রসিদ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে খাতায় নোট করে রাখি। মাস শেষে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। আপনারা যদি এটাকে ভুল মনে করেন তাহলে আমি আলট্রাসনোগ্রাফি করা বন্ধ করে দেব।
নওগাঁর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুনির আলী আকন্দ বলেন, রসিদের বাইরে কোনো ধরনের লেনদেনের নিয়ম নেই। রসিদ কেটেই সেবা দিতে হবে। রোগীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়াই এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
