নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের ছক
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিশেষ জোর
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের রূপরেখা রয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। প্রথম বাজেটেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাজেটে আইসিটি, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে বড় উদ্যোগ। মূলত ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে বাণিজ্য সহজীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানির নিবন্ধন, ১০ দিনের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভিসা প্রদান, এইও পদ্ধতিতে গ্রিন চ্যানেলে পণ্য খালাস করা হবে। ক্ষুদ্র ও নতুন ব্যবসায়ীদের দ্রুত ব্যবসা শুরু করার সুবিধার্থে একটি অনলাইনভিত্তিক প্রাথমিক অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা দ্রুত অপারেশন শুরু করতে পারবেন এবং বাকি আনুষ্ঠানিকতা ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার সুযোগ পাবেন।
শিল্পের অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে এবং কর নীতিতে ধারাবাহিকতা বা পূর্বাভাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পাঁচ বছরের কর কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের একতরফা বা একক ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে, যা কর হয়রানি কমাতে সাহায্য করবে। কাস্টমসে পণ্য খালাস দ্রুত করতে এবং জট কমাতে সরকারি ল্যাবরেটরির পাশাপাশি বেসরকারি ল্যাবরেটরি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ট্যাক্স এবং ভ্যাট আপিল ফি কমানো হয়েছে।
স্টার্টআপ, নতুন উদ্যোক্তা ও এসএমই খাতের প্রসার টার্নওভার করে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছৈ। এসএমই উদ্যোক্তাদের বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার ট্যাক্স সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়া ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সম্পূর্ণ ডিজিটাল উপায়ে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ‘ই-লোন’ বা মাইক্রো-লোনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মতো উদীয়মান খাতের জন্য নানামুখী করছাড় ও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এ খাতে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দিয়ে প্রতিবছর দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়টি বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা। তবে সরকারের প্রথম বাজেটেই শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দ বাড়িয়েছে বিএনপি সরকার। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপির বরাদ্দ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১ দশমিক ০৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবাসী কর্মীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। হাইটেক পার্কে ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে সরকার। এসএমই খাতের বিকাশে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।
বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এজন্য দেশের জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার টার্গেট ঠিক করা হয়। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, আগামী ৫ বছরে জিডিপিতে আইসিটি ও টেলিকম খাতের অবদান ১-২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে। স্পোর্টস ইকোনমি খাতেও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে তারেক রহমানের সরকার। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মাসিক সম্মানি ও নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস আয়োজনে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি খাতেও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রেখেছে সরকার। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহ করবে সরকার। এদিকে খাদ্যনিরাপত্তায় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তায় বিষয়টিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরতদের মাসিক সম্মানি, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি রয়েছে। এছাড়া নারী ও শিশু কল্যাণেও বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এবারের বাজেটে যোগাযোগ অবকাঠামোতেও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পুরোটাই বাজেটে স্থান পেয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাত নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উল্লেখ করা হয়েছে।
