দ্বিকক্ষ সংসদের প্রস্তাব বাদ দেওয়ার পরামর্শ সিপিডির
উচ্চকক্ষ থাকলে শেখ হাসিনা দানব হয়ে উঠতে পারত না : বদিউল আলম
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। এর বদলে বিদ্যমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থাকেই আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে শক্তিশালী করার প্রস্তাব করেছে তারা। সংস্থাটি বলেছে, কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ছাড়া শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর জবাবদিহি আনতে পারবে না। তাই উপরের কক্ষ গঠন না করে বিদ্যমান সংসদকেই কার্যকর করার ওপর জোর দিতে হবে। সিপিডি বাংলাদেশে সংসদীয় জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন এই প্রস্তাব দেয়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জাতীয় সংলাপে এ আহ্বান জানান সিপিডির গবেষকরা। ‘প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ কি জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে?’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নিজাম আহমেদ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্থার কমিশনের সদস্য ড. আলিম, অধ্যাপক আসিফ এম শাহান, সিপিডির পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজিম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রওনক জাহান। সিপিডি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিপক্ষে মত দিলেও এর স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘উচ্চকক্ষ থাকলে শেখ হাসিনা দানব হয়ে উঠতে পারত না। উচ্চকক্ষ থাকলে তার পক্ষে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী সম্ভব হতো না। এই সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনা দানব হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার কথা যদি ধরি, তিনি কিন্তু ট্যাংকে করে আসেন নাই, উর্দি পরেও আসেন নাই। এসে (ক্ষমতায়) সংবিধানও বাতিল করে দেননি। তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছিলেন, যদিও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু কিভাবে শেখ হাসিনা স্বৈরাচার, দানবে পরিণত হয়েছিলেন? কারণ, স্বৈরাচারী ব্যবস্থাই তাকে দানবে পরিণত করেছে। বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, সংবিধান সংশোধনীর ক্ষেত্রে কোনো একক দল যাতে আর একক সিদ্ধান্ত নিতে না পারে এজন্যই উচ্চকক্ষ করা। ফলে উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। তিনি আরও বলেন, সবাই যে কোনো একটি ব্যাপারে ঐকমত্য হবে, সেটা নয়। এটি হতে পারে শুধু ইউটোপিয়ায়। কোনো রাজনৈতিক দল যাতে আর দানব হয়ে উঠতে না পারে সে জন্যই উচ্চকক্ষ করা হচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক নিবর্তনমূলক আইন হয়েছে-যেগুলো উচ্চকক্ষ থাকলে কিছুটা মডারেটর হবে।
এদিকে সিপিডির গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত বেশ কিছু সংস্কার ধারণা যেমন-বাইক্যামেরালিজম, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি বা নিয়োগ কমিটি গঠন নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব কার্যকর নয়। এতে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিনের দলীয় আনুগত্য, পৃষ্ঠপোষকতা এবং ‘বিজয়ী সব পায়’ রাজনীতির সংস্কৃতিতে এসব প্রস্তাব কার্যত প্রতীকী হয়ে থাকে। এতে জবাবদিহি বা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বদলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সংস্থাটি দেশের সংসদীয় ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে বিরোধীদলীয় এমপিদের চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ, রাজনৈতিক দলের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকারকে আর্থিকভাবে আরও স্বনির্ভর করা, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং দলত্যাগ রোধে আইনি সংস্কার। সিপিডি মনে করে, শাসক দল যেন নির্বাহী দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে, এজন্য গুরুত্বপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদে সরকারের নিয়োগের ক্ষমতা থাকা উচিত। তবে এসব নিয়োগ সংসদীয় পর্যালোচনা কমিটির মাধ্যমে পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখতে হবে।
