সিলেটে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই চক্রের দৌরাত্ম্য
সাঁড়াশি অভিযানে যাচ্ছে পুলিশ
Advertisement
সংগ্রাম সিংহ, সিলেট
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের তৎপরতায় সিলেট মহানগরবাসী চরম অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকা, কোথাও নিরাপত্তা নেই। আতঙ্কের মধ্যেই চলছে ঈদ ও অন্যান্য উৎসবের বাজার। দিন-দুপুরে ছিনতাই, ব্যাগ টানাটানি, মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। পুলিশের দাবি- অপরাধ চক্রকে চিহ্নিত ও গ্রেফতারে তারা তৎপর রয়েছে।
শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে নগর প্রশাসক, জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইচক্র দমনের ব্যাপারে নির্দেশনা দেন। আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী একথা স্বীকার করে বলেন, অপরাধ চক্রকে দমনে নগর ভবন ও প্রশাসন দফায় দফায় আলোচনা করেছে। রাজনীতিকরাও এ ব্যাপারে একমত। কোনোভাবেই অপরাধীরা ছাড় পাবে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সিলেটের পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালেই ফের ছিনতাইয়ের ঘটনায় আমরা সাঁড়াশি অভিযান শুরু করছি। কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইচক্রের মূলোৎপাটনই এই অভিযানের লক্ষ্য।
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী যুগান্তরকে বলেন, জনপ্রত্যাশা পূরণ ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইচক্রের মূলোৎপাটন জরুরি। আমি কোনো অপরাধীকে রক্ষায় কখনো ফোন করিনি, করবও না।
গত বৃহস্পতিবার নগরীর হাউজিং এস্টেট ও সাগরদিঘির পাড় এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের দুটি ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাউজিং এস্টেটের ঘটনায় দেখা যায়, তিনটি মোটরসাইকেলে যাওয়া ছয় তরুণ অটোরিকশার গতিরোধ করে। এ সময় অটোরিকশার ভেতরের নারীকে আর্তচিৎকার করতে দেখা যায়। ওই নারী ব্যাংক থেকে টাকা তুলেই বাসায় ফিরছিলেন। ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ থেকে নগদ টাকা ও চেক বইয়ের কিছু পাতা ছিনিয়ে নেয়।
সাগরদিঘির পাড়ের ঘটনায় ফুটেজে দেখা যায়, সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারীকে মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক পথরোধ করে। যুবকদের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। ওই নারীর মোবাইল ফোন, ব্যাগ এবং স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় তারা ধারালো লম্বা অস্ত্র দিয়ে কয়েকবার আঘাত করে ও মারধর করে ওই নারীকে।
সিলেটের ১৬ নং ওয়ার্ডের ভোটার বশির আহমদ জুয়েল নগর প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে খোলা চিঠিতে জানিয়েছেন, আপনি প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন মানুষ দরজা খুলে ঘুমাবে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মাথায় নগরীতে যা ঘটছে, তা উদ্বেগজনক। আপনার ঘোষণার পর এমন অপতৎপরতা শুরু হওয়ায় কোনো মহল ইন্ধন যোগাচ্ছে কি না তাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঘুরেফিরে নগরীর কয়েকটি হটস্পটে এসব অপকর্ম সংঘটিত হয়। স্পটগুলো হচ্ছে জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, কাজিরবাজার, আম্বরখানা, মদিনা মার্কেট, তালতলা, সুবহানীঘাট, শিবগঞ্জ, বালুচর, টিলাগড়, লামাবাজার, চৌহাট্টা, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, হাউজিং এস্টেট ও বিমানবন্দর সড়ক উল্লেখযোগ্য। ভিড়ের সুযোগ, নির্জন অলিগলি, পর্যাপ্ত আলোর অভাব ও সিসিটিভি নজরদারির সীমাবদ্ধতা অপরাধীদের অপকর্মে সুযোগ সৃষ্টি করছে।
পুলিশ জানায়, প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অভিযানে নেমেছে মহানগর পুলিশ। গত তিন দিনে বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রংমহল টাওয়ার সংলগ্ন ড্রেন থেকে ৭ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৪টি চাকু, ছিনতাই হওয়া টাকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এর আগে বাগবাড়ীর পিডিবি গেটের সামনে কিশোর গ্যাংয়ের ৫ সদস্যকে আটক করা হয়। তারা হলো সাদি ইসলাম সানি, আবুল মোড়ল, রিফাত তালুকদার, জনি আহম্মেদ ও নাহিদ আহমেদ রনি। একই দিনে শাহ পরান (রহ.) থানার অভিযানে সাদ্দাম হোসেন গ্রেফতার হন। তার কাছে মোটরসাইকেলসহ ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়। এছাড়া কাস্টঘর এলাকা থেকে আবদুর রহিমকে আটক করা হয়। গ্রেফতার করা হয় ‘বুলেট মামুন গ্রুপ’ নামে পরিচিত কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্য সিয়াম ও অপর দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নগরে ছিনতাইকারীদের বেশ কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। কেউ নির্জন স্থানে চাকু বা ছুরি ব্যবহার করে, কেউ জনসম্মুখে বা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই সংঘটিত করে। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, নগরের অপরাধ চক্রগুলোর একটি বড় অংশ কিশোরদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বেকারত্ব, পারিবারিক অবহেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া ও মাদকের সহজলভ্যতা অনেক তরুণকে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
