ডেঙ্গুবাহক এডিস শনাক্ত করবে ঢাবির ‘স্মার্ট ফাঁদ’
Advertisement
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি শনাক্ত করতে স্বয়ংক্রিয় ফাঁদ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। ‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ নামে এ ‘স্মার্ট ফাঁদ’ শব্দের মাধ্যমে মশা আকৃষ্ট করে। এরপর ক্যামেরায় ছবি তুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মশার প্রজাতি শনাক্ত ও সংখ্যা গণনা করে। এরপর সংগৃহীত তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী তথ্যভান্ডারে পাঠিয়ে দেয়। ফলে কোনো এলাকায় এডিস মশার সংখ্যা বাড়ছে কি না, তা দূর থেকেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণাগার এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ গবেষক দল যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে। এ গবেষক দলে আছেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মাহমুদ উল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব, এএমএম মুনিফ খান, ফাহাদ আরেফিন ও আসিফ রহমান দীপ্ত এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার আশফাকুল মুঈদ, প্রভাষক আতিয়া সানজিদা শর্মী, মো. সিয়াম সরকার, নিলয় হাওলাদার ও আতিক বিন জাকির। ‘মাস্ট-ক্লাউডনেট : ইন্টারনেট সংযুক্ত শব্দভিত্তিক ফাঁদে এডিস মশার তাৎক্ষণিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি’ শিরোনামের গবেষণাটি ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
যেভাবে কাজ করে স্মার্ট ফাঁদ : স্ত্রী এডিস মশার ডানার শব্দে পুরুষ মশার আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে এ ফাঁদ। এটি ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ কম্পাঙ্কের এমন শব্দ তৈরি করে, যা স্ত্রী এডিস মশার ডানার শব্দের মতো। এ শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ মশা কাছে এলে ফাঁদের ভেতরে থাকা একটি পাখা সেগুলোকে টেনে নেয়। পরে হলুদ আঠালো কাগজে মশাগুলো আটকে যায়। ফাঁদের ভেতরে থাকা ক্যামেরা আটকে পড়া মশার ছবি তুলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী তথ্যভান্ডারে পাঠানো হয়। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি নমুনা সেগুলো বিশ্লেষণ করে মশার প্রজাতি শনাক্ত এবং সংখ্যা গণনা করে। এসব তথ্য একটি ওয়েবভিত্তিক তথ্যফলকে দেখা যায়। এর ফলে মাঠপর্যায়ে বারবার গিয়ে মশা গণনা না করেও বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
গবেষকরা বলছেন, মানুষকে কামড়ায় স্ত্রী মশা, পুরুষ মশা নয়। তবে পুরুষ এডিস মশা স্ত্রী মশার আগে পূর্ণবয়স্ক হয় এবং মশার প্রজননস্থলের কাছাকাছি থাকে। ফলে কোনো এলাকায় পুরুষ এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেখানে নতুন করে মশার প্রজনন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে আগাম ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এটি ডেঙ্গুর ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে।
পরীক্ষায় মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল : গবেষণাগারে খাঁচার ভেতরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, শব্দযুক্ত ফাঁদটি একই ধরনের শব্দহীন ফাঁদের তুলনায় গড়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি এডিস মশা ধরতে পেরেছে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় টানা তিন দিন যন্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়। এ সময় ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস ও শহুরে কোলাহল থাকলেও ফাঁদটি সচল ছিল। তিন দিনে এতে ৪৯টি এডিস মশা ধরা পড়ে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্রাংশসহ প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। তুলনামূলকভাবে মশা জরিপে ব্যবহৃত সিডিসি বাতিচালিত ফাঁদের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং বিজি-সেন্টিনেল ফাঁদের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা। একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক ফাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ফলে বড় পরিসরে ব্যবহার করা গেলে প্রতিটি ফাঁদের পরিচালন ব্যয় কমতে পারে। বিদ্যুৎ চলে গেলেও ব্যাটারির সাহায্যে ফাঁদটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা চালু রাখা যায়।
ঢাকার আবাসিক এলাকায় পরীক্ষার পরিকল্পনা : গবেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেলেও বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি বাড়ছে, তার একটি আগাম মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করা হবে।
ভবিষ্যতে যন্ত্রটিকে সৌরশক্তিচালিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে গবেষকদের। পাশাপাশি তারহীন ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই দূরবর্তী স্থানে তথ্য পাঠানোর জন্য এতে দূরপাল্লার বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তি যুক্ত করার কাজ চলছে। রোদ-বৃষ্টি সহনশীল করে এ ফাঁদের স্থায়িত্ব বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম এডিস মশা শনাক্তের যন্ত্র তৈরির জন্য গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোন কোন এলাকায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা বাড়ছে, তা জানা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। এক্ষেত্রে ফাঁদটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি এর আরও উন্নয়ন ও কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে জীবনঘনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানান।
