Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

পদ্মা নদী থেকে বিএনপি নেতাদের বালু উত্তোলন

ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া

Advertisement

Icon

তানজিমুল হক, রাজশাহী

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন রাজশাহীর বিএনপি ও ছাত্রদল নেতারা। পেশিশক্তি আর ক্ষমতার দাপটে তারা গত ২ মাসে পদ্মা নদী থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ৫০ লাখ সিএফটি (ঘনফুট) বালু লুট করছেন। জেলা প্রশাসন থেকে মাত্র ২৪ একর বালুমহাল ইজারা দেওয়া হলেও এর বাইরে তিনটি পয়েন্ট থেকে প্রকাশ্যে দিনের আলোতেই ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। বাঘায় ইজারা দেওয়া লক্ষ্মীনগর বালুমহাল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পদ্মা থেকে নিয়মিত লুট করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এসব বালু রাজশাহী, নাটোর, পাবনা এবং কুষ্টিয়ার অন্তত ১০টি এলাকায় স্তূপাকারে রেখে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিকার। সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

জানা গেছে, বালুমহালের ইজারাদার মেসার্স সিফাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আরফান মিয়া নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। ক্ষমতার দাপটে তার ইজারা নেওয়া বালুমহালের বাইরে বিএনপি নেতারা অবৈধভাবে বালু বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। চরাঞ্চলের পাঁচটি দুর্ধর্ষ বাহিনীকেও তারা অর্থের বিনিময়ে করছেন ‘ম্যানেজ’।

বিএনপি এবং ছাত্রদল নেতাদের দাবি, তারা মূল ইজারাদারকে টাকা দিয়ে বালু কিনে ব্যবসা করছেন। তবে ইজারাদার আরফান মিয়া বলছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা নিজেরাই রসিদ বানিয়ে তাদের অপকর্মের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

বালু লুটের সঙ্গে বাঘা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখরুল হাসান বাবলু, সাবেক সদস্য সচিব আশারাফ উল দৌলা, জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এসএম সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার, উপজেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক জুয়েল খান, বিএনপি নেতাদের অতি ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সজল খান এবং পাকুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাদের মোল্লাসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

যুগান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধান, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বেরিয়ে এসেছে সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। এছাড়া বালু উত্তোলনের ভিডিও এবং স্থির চিত্রও সংরক্ষিত রয়েছে।

এদিকে পদ্মা তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। ৫ অক্টোবর বাঘার গোকলপুরের শিক্ষার্থী রাতুল হাসান উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে অভিযোগের পর রাতুলকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।

সরেজমিন মঙ্গলবার দুপুরে বাঘার কিশোরপুরে এক কিলোমিটার নিচে মাদ্রাসা ঘাটে দুটি ড্রেজার এবং বালু পরিবহণে ব্যবহৃত পাঁচটি বড় নৌকা দেখা গেছে। এখান থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে পদ্মা থেকে দুটি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছিল। মাঝ পদ্মা থেকে ঘাটের দিকে আসছিল বালুভর্তি আরও চারটি ড্রেজার ও নৌকা। কিন্তু কাছাকাছি আসার পর গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেগুলো ফিরে যায়। সেখানে দেখা গেছে, ঘাট থেকে নৌকায় রাখা বালু পাম্প করে লোহার পাইপ দিয়ে এক কিলোমিটার ওপরে কিশোরপুর পদ্মার বাঁধের কাছে স্তূপাকারে রাখা হচ্ছে। সেখানে রয়েছে বালুর আরও কয়েকটি বড় স্তূপ। এছাড়া সদ্যনির্মিত পদ্মার বাঁধের ওপরেও রাখা হচ্ছে বালু। কিশোরপুর থেকেই বিক্রি হচ্ছে বালু। এখানে পাকুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাদের মোল্লা এবং স্থানীয় যুবদল নেতা জাকারিয়া সুলতানের সঙ্গে দেখা হয়। কাদের মোল্লা জানান, তারা ইজারাদার আরফান মিয়ার কাছ থেকে তিন টাকা সিএফটি মূল্যে বালু কিনছেন। আর বিক্রি করছেন ১০ টাকায়। তাদের কাছে বালু কেনার রসিদ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শামীম সরকার এবং ব্যবসায়ী সজল খান খোলা ঘাট নিয়ন্ত্রণ করছেন। ১০০ ভাগের মধ্যে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফকরুল হাসান বাবলু, শামীম সরকার এবং সজল খানের ৭৫ শতাংশ অংশীদারত্ব রয়েছে। এছাড়া বিএনপি নেতা আশরাফ উল দৌলা এবং যুবদল নেতা জুয়েল খানসহ আরও ৩০ জন বাকি ২৫ শতাংশের অংশীদার।’ কাদের বলেন, ‘বাঘার কিশোরপুর, গোকুলপুর, মোর্শেদপুর, চকরাজাপুর, নাটোরের লালপুর, পাবনার পাকশি ব্রিজ এবং কুষ্টিয়ার অন্তত ১০টি পয়েন্টে স্তূপাকারে বালু রেখে বিক্রি হচ্ছে। তবে পদ্মার বিভিন্ন বাহিনীকে চাঁদা দেওয়া হয় না, তারাও আমাদের ব্যবসার অংশীদার।’

অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শামীম সরকারকে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তবে ঘাটের মূল অংশীদারদের অন্যতম ব্যবসায়ী সজল খান অভিযোগের আংশিক সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘এলাকার কিছু ভাই-ব্রাদার আছেন, ব্যবসার জন্য তাদের সামান্য টাকা দিয়েছি। অনেকের কাছেই শুনেছি, বালু কাটা হচ্ছে। তবে আমি এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই।’

আরেক অংশীদার যুবদল নেতা জুয়েল খান বালু ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা ইজারাদারের কাছ থেকে বালু কিনে ব্যবসা করছি। অবৈধভাবে বালু কাটার অভিযোগ সঠিক নয়। কোনো বাহিনীকে ম্যানেজ করার প্রশ্নই আসে না।’

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখরুল হাসান বাবলু অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, ‘দলের এবং আমার নাম ভাঙানো হচ্ছে। কে কীভাবে বালু উত্তোলন করছেন, বলতে পারব না। এটি বন্ধ হওয়া দরকার। আমি অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই।’ তবে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন বাঘা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আশারাফ উল দৌলা। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রদল নেতা শামীম এবং বিএনপি নেতা কাদেরসহ অন্যদের স্থানীয় এমপি আবু সাঈদ চাঁদ ডেকেছিলেন। তিনি বালু তুলতে নিষেধ করেছেন। তবে এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই।’

এদিকে কিশোরপুরের পাশেই গোকুলপুরের তাহেরের ঘাট। সেখানেও স্তূপাকারে বালু রাখা হয়েছে। তবে পরিমাণ কম। এখানে দুটি ড্রেজার ছিল। একটি ড্রেজারের চালক ছিলেন নাটোরের গুরুদাসপুরের চাচকৌড়ের আলমগীর হোসেন। আরেকটির চালক রাজশাহী মহানগরীর জাহাজঘাটের বাবু। এ দুই চালকই পদ্মা থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে ড্রেজারের উপস্থিতির প্রশ্নে তারা সদুত্তর দিতে পারেননি।

এলাকাবাসী জানান, এখানে বালু উত্তোলন করছেন রাজশাহী জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল হক। তার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। তবে নাজমুল বলেন, ‘ইজারাদার আরফানের সঙ্গে আমার ১৮ শতাংশ অংশীদারত্ব রয়েছে। অথচ প্রভাবশালী নেতাদের ক্ষমতা আর দাপটের কারণে আমি বঞ্চিত।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবির কারণে বালু কিনে বিক্রির চেষ্টা করছিলাম, সেটিও পারছি না। অথচ পদ্মা থেকে গত ২ মাসে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ৫০ লাখ সিএফটি বালু অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে। সেটি এখনো চলমান রয়েছে।’

এ ছাড়া স্থানীয়রা জানান, খায়েরখাট শিমুলতলা এলাকায় পদ্মা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ এলাকায় ছাত্রদল নেতা শামীম সরকার এবং বাঘা উপজেলা যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব শফি তাদের অনুসারীদের নিয়ে বালু উত্তোলন করছেন।

বালুমহালের বৈধ ইজারাদার আরফান মিয়া বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের রসিদ বানিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল বালু বিক্রি করছে। আমি জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনকে একাধিকবার লিখিতভাবে অবহিত করেছি। কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। বালুমহালটি ইজারা নিতে আমাকে সাত কোটি টাকা সরকারকে দিতে হয়েছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এদিকে বাঘার ইউএনওর কাছে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী রাতুল হাসান বলেন, ‘বালু কাটার কারণে চর ও বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। আমি প্রতিবাদ করার কারণে বিএনপি নেতা কাদের মোল্লা এবং তার লোকজন প্রাণনাশের হুমকিসহ নানা ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। মানববন্ধন করতে দিচ্ছেন না। কাদেরের পেছনে সজল খান ও জুয়েল খান রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি।’

বাঘার ইউএনও তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, ‘অবৈধভাবে অনেকেই বালু উত্তোলন করছেন। আমরা প্রমাণও পেয়েছি। মোবাইল কোর্টে যাচ্ছি। যাওয়ার পরে উত্তোলনকালীরা এলাকা থেকে সরে যাচ্ছেন। আমরা নিয়মিত মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রশাসন নির্বিকার থাকার অভিযোগ ভিত্তিহীন।’

রাজশাহী জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব সিনিয়র সহকারী কমিশনার অভিজিত সরকার বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে। ইজারাকৃত বালুমহালের সীমানার বাইরে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। এরকম ঘটনা ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

পদ্মা নদী থেকে বিএনপি নেতাদের বালু উত্তোলন ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া

ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া

ডেঙ্গুবাহক এডিস শনাক্ত করবে ঢাবির ‘স্মার্ট ফাঁদ’

ডেঙ্গুবাহক এডিস শনাক্ত করবে ঢাবির ‘স্মার্ট ফাঁদ’

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুরোগী বৃদ্ধি ফার্মেসিতে মিলছে না ডিএনএস স্যালাইন

ফার্মেসিতে মিলছে না ডিএনএস স্যালাইন

চট্টগ্রামে পরিবহণ ভাড়া দ্বিগুণ চালসহ নিত্যপণ্যের খরচ বেড়েছে

চালসহ নিত্যপণ্যের খরচ বেড়েছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম