ইফতারের সময় পানিও দেয়নি পেকুয়া পুলিশ
Advertisement
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজারের পেকুয়ায় পিতৃপরিচয় ও ভিটেমাটির অধিকার চাইতে গিয়ে পুলিশের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক তরুণী ও তার মা। তারা হলেন-জুবাইদা বেগম (২১) ও তার মা রেহেনা মোস্তফা। মামলার তদন্তে ঘুসের দাবি না মানায় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়েছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে এক মাসের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে সমালোচনার মুখে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে বেকসুর খালাস দেন।
শনিবার সন্ধ্যায় মা-মেয়ে জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে তাদের চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের শরীরে মারধরের চিহ্ন রয়েছে।
জানা যায়, জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা ও তার স্বামীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। ২০১৩ সালে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হয়। সম্পত্তির ভাগ নিয়ে চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরুর পর তারা জুবাইদাকে অস্বীকার করেন। আদালতের মাধ্যমে জুবাইদা মামলা করেন। মামলার তদন্তভার পেকুয়া থানাকে দেওয়া হয়। থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দিতে রেহেনা ও জুবাইদার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে ২০ হাজার টাকা দেন তারা। কিন্তু ঘুস নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিপক্ষে মিথ্যা প্রতিবেদন দেন। এ কারণে টাকা ফেরত চাইতে গেলে মা-মেয়ের সঙ্গে পুলিশের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের মারধর করে। পরে ইউএনওকে ডেকে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে এক মাসের সাজা দেওয়া হয়।
কারাগার থেকে মুক্তির পর রেহেনা মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে পুলিশ আমাদের থানায় ডেকে নিয়ে ইচ্ছেমতো মারধর করেছে। থানার একটি রুমে আটকে লাথি ও ঘুসি মারেন এসআই পল্লব ও আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য। এতে আমরা মা-মেয়ে দুইজন রক্তাক্ত হই এবং একপর্যায়ে বেহুশ হয়ে যাই।
তিনি আরও বলেন, মারধরের পর ইউএনও মাহবুব আলম থানায় আসেন। আমরা পুলিশের নির্যাতনের কথা জানাই। ভেবেছিলাম, উনি আমাদের রক্ষা করবেন। কিন্তু আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেও কিছু না বলে উপরের কক্ষে চলে যান। দেড় ঘণ্টা পর সবাই চলে যান।
রেহেনা মোস্তফা বলেন, পরে পুলিশ আমাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে একটি কালো গাড়িতে তুলে। পথে ইফতারের সময় হলেও আমাদের পানি পর্যন্ত দেয়নি। অথচ তাদের হাতে তখন জুস ও অন্যান্য পানীয় ছিল। তিনি বলেন, কারাগারে নেওয়ার পর তাদের শারীরিক আঘাত দেখে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে গ্রহণ করতে চায়নি। পরে ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ ও কাগজপত্র পাঠানোর পর গ্রহণ করে।
এদিকে মুক্তির পর মা-মেয়েকে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিকভাবে দুজনই বিপর্যস্ত। বিশেষ করে জুবাইদা মানসিক ধাক্কায় ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না। কারাগার থেকে মুক্তির পর তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও মাহবুব আলম কোনো বক্তব্য দেননি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব বলেন, আমাকে জানানো হয়েছিল মা-মেয়ে মিলে পুলিশের ওপর হামলা করেছে। এখন মা-মেয়ের যে আঘাতের চিহ্ন তা কীভাবে হলো তা তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আইনজীবী মিজবাহ উদ্দিন বলেন, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী জুবাইদা ও তার মা রেহেনা পুলিশের ওপর হামলা করেছে। কিন্তু তা না দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
