কাঠফাটা রোদে তেলের লাইন, অসুস্থ হচ্ছেন মানুষ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চৈত্রের তপ্ত দুপুরের সূর্য যেন আগুন ঝরাচ্ছে রাজপথে। একদিকে পিচঢালা সড়কের উত্তাপ, অন্যদিকে যানবাহনের ইঞ্জিনের গরম-সব মিলিয়ে রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলো এখন একেকটি অগ্নিকুণ্ড। এই নরকযন্ত্রণার মধ্যেই এক লিটার জ্বালানি তেলের জন্য মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। তেলের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে গরমে ক্লান্ত হয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। রোববার রাজধানীর তেজগাঁও, মগবাজার, আসাদগেট ও মিরপুর এলাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন অমানবিক দৃশ্য দেখা গেছে। এদিকে তেল নিতে গিয়ে শনিবার রংপুরে এক শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে।
সকাল ১০টায় তেজগাঁওয়ের ‘সিটি ফিলিং স্টেশন’-এর সামনে তেলের লাইন সাতরাস্তা ছাড়িয়ে মগবাজারের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। তপ্ত রোদে হেলমেট হাতে রাস্তার ওপর বসে ঝিমুচ্ছিলেন রাইড শেয়ার চালক কামাল হোসেন। সাড়ে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কামাল হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে পাশের চালকরা তাকে ধরে পানি পান করান। সুস্থ হয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভাই, পেটের দায়ে রোদে পুইড়া লাইনে খাড়াইছি। শরীর আর চলে না। একদিকে রোদের তাপ, আরেকদিকে তেলের চিন্তা-দুইয়ে মিইলা জানডা শেষ হয়া যাইতাছে।’
একই চিত্র দেখা গেছে আসাদগেটের তালুকদার পাম্পে। সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেট কার চালক জলিল মিয়ার শার্ট ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘সকাল ৬টায় আসছি, এখন বাজে ১২টা। পাম্পের সামনে কোনো ছায়া নাই। রোদে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বুক ফেটে যাচ্ছে। তেল না নিয়ে গেলে মালিকের বকুনি খাব, আর লাইনে থাকলে জান যাবে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, রোদে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় অনেক চালক ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতায় ভুগছেন। মিরপুর ১০ নম্বরের একটি পাম্পে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মোটরসাইকেল চালককে দেখা গেল পাম্পের পাশের দেওয়ালে ভর দিয়ে হাঁপাচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় স্থানীয়রা তাকে দ্রুত ছায়ায় নিয়ে যান। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত ছায়া বা পানীয় জলের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। জ্বালানি তেলের এই তীব্র সংকট এখন কেবল যাতায়াত ব্যবস্থাকে নয়, মানুষের ধৈর্যকেও পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। ফলে তুচ্ছ ঘটনায় পাম্পে পাম্পে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। অনেক পাম্পে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়ায় মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, এই কাঠফাটা রোদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে যারা বাইক চালক বা খোলা যানবাহনে কাজ করেন, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি ভয়াবহ। পর্যাপ্ত পানি পান না করা এবং দীর্ঘ সময় রোদে থাকার ফলে রক্তচাপ কমে গিয়ে যে কেউ জ্ঞান হারাতে পারেন।
বলা হচ্ছে, রাজধানীতে তেলের এই দীর্ঘ সারি মূলত এক অব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও পাম্পগুলোতে তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আকাশচুম্বী হয়েছে। নগরবাসী এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন-কবে কাটবে এই তেলের সংকট। কবে চৈত্রের এই উত্তাপ আর তেলের হাহাকার থেকে মুক্তি পাবে সাধারণ মানুষ।
রংপুরে তেল নিতে গিয়ে স্কুল শিক্ষকের মৃত্যু : ব্যুরো জানায়, রংপুরে জ্বালানি তেলে নিয়ে তেলেসমাতি কারবার চলছে। রোববার নগরীর শাপলা চত্বরে ইউনিক ট্রেডার্স পাম্পে দাঁড়িয়ে থেকে তেল না পাওয়ায় সেখানে সংঘর্ষ ঘটে। শনিবার নগরীর আর কে রোডে সুরমা পেট্রোল পাম্পে তেল নিয়ে গিয়ে একজন স্কুল শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হলেও তারাও ঠিকমতো কাজ করছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার সকাল থেকে নগরীর ও আশপাশের ২৮টি তেলের পাম্পে কোনো তেল সরবরাহ করা হয়নি। চাহিদামতো কেন্দ্রীয় ডিপোগুলো থেকে তেল সরবরাহ না করায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে শাপলা পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল না পাওয়ায় সেখানে বাগ্বিতণ্ডার জেরে তেল ক্রেতাদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। এতে ৪ জন আহত হয়েছেন।
শনিবার সুরমা পেট্রোল পাম্পে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে থেকে মোটরসাইকেলে তেল না পাওয়ায় এক স্কুল শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। স্কুল শিক্ষক মেহেদি হাসানের (২৯) বাসা নগরীর মুনসি পাড়ার মতিউর রহমানের ছেলে। তিনি সদর উপজেলার লাহিড়ির হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তিনি রংপুর জিলা স্কুল ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত নগরীর প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
