Logo
Logo
×

Advertisement

নগর-মহানগর

রহস্যজনক কারণে প্রশাসন নীরব

প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় নিউ হোপের জমি দখল

ফসলি জমি, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ অব্যাহত, প্রতিকার চান ভুক্তভোগীরা * উত্থান আওয়ামী লীগ আমলে, এখন অপকর্মের সহযোগী অন্য দল

Advertisement

Icon

শাহ সামসুল হক রিপন, গাজীপুর

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় নিউ হোপের জমি দখল

ছবি-যুগান্তর

Advertisement

স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে জেলার শ্রীপুরে জমি দখল, ফসলি জমির ক্ষতি, বায়ু ও পরিবেশদূষণসহ নির্বিঘ্নে নানা অপকর্ম অব্যাহত রেখেছে নিউ হোপ নামে একটি পশুখাদ্য উৎপাদন কারখানা। কারখানাটির অবস্থান পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ভাংনাহাটি এলাকায়। প্রভাবশালী মহলটি প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের অবৈধ কাজ জায়েজ করা ছাড়াও এলাকায় গার্মেন্টের ঝুট ও বর্জ্য ব্যবসা, ইট-বালু সরবরাহ থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিউ হোপের স্থানীয় কর্ণধাররা বিদেশিদের জিম্মি করে নানা কায়দায় বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া কোম্পানিটির বিরুদ্ধেও রয়েছে জোরপূর্বক অন্যের জমি দখল করাসহ ডিলার নিয়োগে কারসাজির বিস্তর অভিযোগ। মাছের খাবার সরবরাহের জন্য একজনকে অফিশিয়ালি ডিলার নিয়োগ দেওয়ার পর কোনো কারণ ছাড়াই একই এলাকায় আরেকজনকে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তাদের প্রতারণা ও হয়রানির ফাঁদে পড়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মাছ ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে এ ধরনের বিভিন্ন অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। 

মাওনা-শ্রীপুর সড়কের ভাংনাহাটি এলাকায় অবস্থিত নিউ হোপ ফিড মিলটি বাতাসে বিষাক্ত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কারখানাটির পশ্চিমে ইটের রাস্তা দিয়ে একটু হেঁটে গেলেই বাতাসে ভেসে আসে তীব্র গন্ধ। এরপর দেখা মিলবে কারখানা থেকে বের হওয়া দূষিত বর্জ্য, যা খোলামেলা বিশাল গর্তে গিয়ে জমা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উন্মুক্ত বিশাল গর্তটি স্থানীয় মাসুম মন্ডলের কাছ থেকে বছরে ৫ লাখ টাকায় ভাড়া নিয়েছে নিউ হোপ ফিড মিল কর্তৃপক্ষ। সারা বছর ওই গর্তে ময়লা আর বিষাক্ত বর্জ্য জমা করা হয়। কিন্তু একটু বৃষ্টি হলেই তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। স্থানীয়রা জানান, এতে তাদের ফসলি জমির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। 

এ বিষয়ে স্থানীয় এলাকাবাসীর অনেকে যুগান্তরকে বলেন, নিউ হোপ ফিড মিলের শব্দ ও পরিবেশদূষণের কারণে তাদের এখানে সুস্থভাবে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অজ্ঞাত কারণে স্থানীয় সাংবাদিকরাও জনস্বার্থে এই কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবেদন করেন না। 

জমি উদ্ধারে সংবাদ সম্মেলন : পশুখাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিউ হোপ ফিড মিল লিমিটেডের বিরুদ্ধে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করেন স্থানীয় পলাশ মন্ডল। তিনি অভিযোগ করেন, জোরপূর্বক তার জমি মিল মালিক দখল করে রেখেছেন। এজন্য তিনি সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি যুগান্তরকে জানান, নিউ হোপ ফিড মিল কর্তৃপক্ষ প্রভাব খাটিয়ে তার ১৯.৮৩ শতাংশ রেকর্ডীয় পৈতৃক সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে। এ নিয়ে বহু দেনদরবার এবং আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ করলেও অদ্যাবধি জমি ফিরিয়ে দেয়নি। ভুক্তভোগী পলাশ মন্ডলের ভাই ডা. এমরানুল হক স্বপন মন্ডল জানান, তার বাবা সামছুল হক মন্ডল চাকরির সুবাদে বেশি সময় বাড়ির বাইরে থাকতেন। ২০১৫ সালে তিনি অবসরে এসে জমির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে দেখতে পান-নিউ হোপ ফিড মিল তার ১৯.৮৩ শতাংশ জমিসহ বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে দখল করে নিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিউ হোপ ফিড মিলের সহকারী ব্যবস্থাপক রাজিবুল হক বলেন, ‘আমরা ওনাদের কাছ থেকে জমি ক্রয় করিনি। শুরু থেকেই সীমানা প্রাচীরসহ এসব জমি কেনা হয়। তবে বিষয়টি জানার পর বেশ কয়েকবার স্থানীয়ভাবে বসে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’ এছাড়া তিনি অন্যান্য অভিযোগও অস্বীকার করেন। 

এদিকে স্থানীয় হোটেল মালিক কাদির মন্ডল বলেন, ‘আমার কিছু জমিও ফ্যাক্টরির দখলে রয়েছে। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ফ্যাক্টরি মালিক আমাকে মালামাল সরবরাহের কিছু কাজ দিয়েছেন। এজন্য তিনি আপাতত জমি দখল নিয়ে কোনো অভিযোগ তুলছেন না।’ তিনি জানান, মালেক নামে অপর একজনের ৭ শতাংশ জমিসহ অনেকের জমি এখনো এই ফ্যাক্টরির দখলে আছে।

নেপথ্যের আশ্রয়দাতা যারা : গত ১৫ বছর এই ফিড মিলের পেছনে অন্যতম আশ্রয়দাতা ছিলেন শ্রীপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও জেলা জাতীয় পার্টির সদস্যসচিব মো. কামরুজ্জামান মন্ডল এবং তার ভাতিজা আওয়ামী লীগ নেতা ও শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বুলবুল মন্ডল। তাদের ছত্রছায়ায় নিউ হোপ স্বেচ্ছাচারভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিপুল সম্পদের মালিক বনে যায়। বিনিময়ে প্রভাবশালী গডফাদারদের দেওয়া হতো শ্রমিক, ইট-বালু ও বস্তা সরবরাহসহ কারখানাসংশ্লিষ্ট নানা ধরনের ব্যবসা। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কামরুজ্জামান মন্ডল বলেন, ‘এই ফ্যাক্টরি আমি নিজে করে দিয়েছি। জমি কেনাসহ চীনের বিনিয়োগকারীদেরও এনেছিলাম। কিন্তু এখন জোর-জুলুম করে ওরা আমার কাছ থেকে সব নিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের সময় খেয়েছি গাড়ি পোড়ার মামলা, আর এখন হত্যা মামলা খেয়ে দুই বছর ধরে বাড়িছাড়া। বলতে পারেন পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’

এদিকে চব্বিশের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর এখন নিউ হোপের ত্রাণকর্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন উপজেলা ও পৌর বিএনপির কয়েকজন নেতা। যারা এখন নিউ হোপের কাছ থেকে ব্যবসায়িক নানা সুবিধা নিয়ে তাদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করছেন। সূত্রমতে, তারা হলেন আব্দুল মোতালেব, শাফায়েত আকন্দ, আউয়াল মন্ডল, রুহুল আমিন প্রমুখ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল মোতালিব বলেন, ‘নিউ হোপ অন্য মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে কি না বা ফ্যাক্টরির উচ্ছিষ্ট বর্জ্য খোলা স্থানে ফেলা হয় কি না, তা তার জানা নেই। তিনি দাবি করেন, নিউ হোপের কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির কারও কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ পরিবেশ অধিদপ্তর গাজীপুরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল জানান, ‘পরিবেশদূষণের বিষয়টি তার জানা নেই এবং কারখানাটির পরিবেশের ছাড়পত্র আছে কি না, তা দেখে তিনি জানাতে পারবেন।’

ডিলার নিয়ে হয়রানি : যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করে নাদিম মাহমুদ নামে একজন ভুক্তভোগী জানান, গত বছর পহেলা নভেম্বর নিউ হোপ কোম্পানি তাকে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ডিলার নিয়োগ করে। ডিলার কোড নং-৭.০০৬.০৯৪। এরপর তিনি স্থানীয় ২০ জন খামারিকে যথাসময়ে মাছের খাদ্য সরবরাহ করতে চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তার অনুকূলে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ রাখে নিউ হোপ। এর ফলে তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন। একপর্যায়ে প্রতিকার চেয়ে গত বছর ২১ ডিসেম্বর তিনি নিউ হোপের কান্ট্রি ডিরেক্টর বরাবর লিখিত আবেদন জমা দেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। সম্প্রতি তিনি ব্যবসা বাঁচাতে বেশি দামে অন্য স্থান থেকে তার দোকানে কিছু খাদ্য এনে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এই খাদ্য বিক্রির সময় তার অটোগাড়িভর্তি ৩০ বস্তা খাদ্য রাস্তা থেকে নিউ হোপের ক্যাডাররা জোরপূর্বক নিয়ে যায়। এ সময় গাড়ি ভাঙচুরসহ চালককে মারধর করে। এদিকে ভুক্তভোগী এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তসহ বিচার চেয়ে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর জেলা প্রশাসকের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।


Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

পদ্মা নদী থেকে বিএনপি নেতাদের বালু উত্তোলন ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া

ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া

ডেঙ্গুবাহক এডিস শনাক্ত করবে ঢাবির ‘স্মার্ট ফাঁদ’

ডেঙ্গুবাহক এডিস শনাক্ত করবে ঢাবির ‘স্মার্ট ফাঁদ’

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুরোগী বৃদ্ধি ফার্মেসিতে মিলছে না ডিএনএস স্যালাইন

ফার্মেসিতে মিলছে না ডিএনএস স্যালাইন

চট্টগ্রামে পরিবহণ ভাড়া দ্বিগুণ চালসহ নিত্যপণ্যের খরচ বেড়েছে

চালসহ নিত্যপণ্যের খরচ বেড়েছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম