বাইসাইকেলে ৩২ বছর ডিমের ব্যবসা
বিদেশে যেতে খুইয়েছেন ১০ লাখ টাকা * হারিয়েছেন বসতভিটা চাষের জমি
Advertisement
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাইসাইকেল নিয়ে ছুটছেন মাগুরার লাল মিয়া। যশোরের বাঘারপাড়ার খাজুরা-আরামবাগ মোড়ে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রায় ৩২ বছর বাইসাইকেল চালিয়ে ব্যবসা করছেন মো. লাল মিয়া (৫৪)। জীবিকার জন্যে প্রতিদিন তাকে ৫০ কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালাতে হয়।
কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। শুরু হয় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে তার ডিম সংগ্রহ অভিযান। বাইসাইকেলের পেছনে দুপাশে ঝোলানো দুটি বড় ঝুড়ি। একপাশে হাঁসের ডিম, অন্যপাশে মুরগির। যেদিন ডিম সংগ্রহ হয়, সেদিন আর বিক্রি নয়। পরদিন সকালে দুই ঝুড়িতে ডিম ভরে বেরিয়ে পড়েন বিভিন্ন বাজারের উদ্দেশ্যে। কখনো পাইকারি, কখনো দোকানে খুচরা দিয়ে দেন ডিমগুলো।
মাগুরার শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়নের ছোটআমিয়ান গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়া। দাম্পত্য জীবনে তিন সন্তানের জনক। দুই মেয়ে ও এক ছেলে। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ঢাকায় একটি গার্মেন্টে কাজ করেন, পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকেন। বাড়িতে থাকেন লাল মিয়া ও স্ত্রী চম্পা বেগম।
বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা-আরামবাগ মোড়ে দেখা হয় এই মানুষটির সঙ্গে। রংচংহীন বাইসাইকেলের সামনে-পেছনে কোনো চাকার ওপরেই নেই মাডগার্ড, রডে টাইট করে বাঁধা একটি ছাতা। পেছনে দুটি ঝুড়ির একটিতে ৫০০ পিস হাঁসের ডিম অপর ঝুড়িতে ৩০০ পিস মুরগির ডিম। সামনে ঝোলানো ব্যাগে পানির বোতল, কিছু ওষুধ ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস।
লাল মিয়া বলেন, মানুষকে বিশ্বাস করে চার চারবার ঠকেছি। খুব ইচ্ছে ছিল বিদেশে যাব। সে কারণে দালালের কাছে চারবারে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা খুইয়েছি। ২০০২ সালে প্রথমবার সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য দালালকে দেই ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু যেতে পারিনি। এরপর মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্যে ২০০৬ সালে আড়াই লাখ টাকা, ৪ বছর পর ২০১০ সালে আবারও মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্যে ৩ লাখ টাকা দেই। সবশেষ ২০১২ সালে দুবাই নিয়ে যাবে বলে এক দালাল আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নেয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তারা এমনভাবে বলে, আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হই।
এই বিদেশে যাওয়ার ভূত মাথায় চাপার কারণে মাঠের ৪ বিঘা জমি এমনকি বসতভিটার সাড়ে ১২ শতক জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। এখন পরের জায়গায় ঘর তুলে থাকেন।
লাল মিয়া প্রতিদিন সকালে সাইকেল নিয়ে বের হন। শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতি, সিংগাড়ি, তিলপাড়া, দিবিলা, ধাউখালি, বগুড়া, বোটঘাট, মশাখালি, শ্রীঅফলতলা, যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার পান্তাপাড়া, তালা, তেঘোর, কামালপুর, বিনোদপুর, মল্লিকপুর, দামোদর-এমন প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে লাল মিয়া ডিম সংগ্রহ করেন। হাঁস-মুরগি নির্বিশেষে ডিম কেনেন ৫০ টাকা হালি আর বিক্রি করেন ৬০ টাকায়। ব্যাপারীদের কাছ থেকে কিনলে দাম একটু বেশি পড়ে, লাভও হয় কম।
লাল মিয়া বলেন, সংগৃহীত ডিম পরদিন সকালে নিয়ে বের হই। কখনো মাগুরা বাজার, আড়পাড়া আবার ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও বারবাজার এবং যশোরের খাজুরা বাজারের দোকানে দোকানে অথবা ব্যক্তিবিশেষের কাছে বিক্রি করি। সপ্তাহে তিন দিন ডিম সংগ্রহ এবং তিন দিন বিক্রি, একদিন বিশ্রাম। প্রতি মাসে গড়ে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হয়।
লাল মিয়া বলেন, প্রতিদিন বাইসাইকেলে প্রায় ৫০ কিমি চলতে হয়। সকালে বের হলে কোনোদিন সন্ধ্যা, কোনোদিন রাত হয়ে যায়। শনিবার রাত ৮টার পরে বাড়ি পৌঁছেছি। তিনি বলেন, ৫ বছর আগেও ডিমের দাম বেশ কম ছিল, লাভ হতো বেশি। এখন ডিমের দাম বেশি, কিন্তু লাভ কম।
একসময় চাষযোগ্য জমি, নিজের জায়গায় বসতঘর থাকলেও এখন লাল মিয়া ভূমিহীন। সরকারের কোনো দপ্তর থেকেই পান না কোনো সহায়তা। তার আকাঙ্ক্ষা একটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। কেননা বয়স বাড়ছে, পরিশ্রম করার মতো শক্তিও দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে।
