আশুলিয়ায় কর্মজীবী নারী হোস্টেল
জায়গা গিলে খাচ্ছে প্রভাবশালীরা
Advertisement
জাভেদ মোস্তফা, ঢাকা উত্তর
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাভারের আশুলিয়ায় গার্মেন্টস কর্মজীবী নারী হোস্টেলের জায়গা দখল করে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দল’ সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। আদালতে মামলা থাকা সত্ত্বেও বিএনপির অঙ্গসংগঠনটির আহ্বায়ক পরিচয়ে খেজুরবাগান এলাকায় দখলবাজি করছেন সেলিম মোল্লা নামের এক প্রভাবশালী। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, ওই ধরনের কোনো বৈধ কমিটি সাভারে নেই।
জানা গেছে, হোস্টেলের জন্য বরাদ্দ সরকারি জমি দখল করে সেখানে দোকানপাট ও পরিবহণ পার্কিং তৈরি করেছেন সেলিম মোল্লা। দোকান বসিয়ে মাসে তিন হাজার টাকা এবং পার্কিংয়ে রাখা প্রতিটি পরিবহণ থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্ত সেলিম মোল্লা নিজেকে জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দলের আশুলিয়া ইউনিয়ন শাখার আহ্বায়ক দাবি করে আসছেন। তার দখল ও প্রভাবের কারণে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
সরকারি রেজিস্ট্রি ও খতিয়ান বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানাধীন বড় আশুলিয়া মৌজায় ২০২৫-৬০০০২২ নম্বর খতিয়ানের অধীন ৭০৮১, ৭৩০৭ ও ৭৩০৮ দাগের জমি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামে নিবন্ধিত। ওই খতিয়ানে মোট ৯৭ শতাংশ জমি রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করা হয়েছে।
হোস্টেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কর্মজীবী নারীদের আবাসনের সুবিধার্থে হোস্টেল সম্প্রসারণের জন্য ২০১২ সালে ওই জমির ৫৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেলিম মোল্লা ও তার সহযোগীরা জমিটি দখল প্রক্রিয়া শুরু করেন।
সরেজমিন ওই জমিতে একটি ‘আইনগত বিজ্ঞপ্তি’ লেখা সাইনবোর্ড দেখা যায়। এতে বলা হয়েছে, ‘মো. সেলিম মোল্লা ও মো. আলিম মোল্লা গং বাদী হয়ে মামলা করলে ঢাকার দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলাটি চলমান আছে।’ তবে হোস্টেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ওই মামলাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে সরকারি জমিতে রাতারাতি দোকানপাট ও পরিবহণ পার্কিং গড়ে তোলা হয়েছে। হোস্টেলের নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক নারী হোস্টেল ত্যাগ করে চলেও গেছেন। সন্ধ্যার পর প্রতিদিন সেখানে হকারদের জটলা ও উচ্চশব্দে সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজানোর কারণে হোস্টেলের পরিবেশও নষ্ট করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সেলিম মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত কেন দখল করা হলো-এ প্রশ্ন এড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা আদালতে গিয়ে জজ সাহেবের সঙ্গে কথা বলুন, তিনি আমাকে এসব করতে বলেছেন। আমার আইনজীবীরা এসে সাইনবোর্ড লাগায় দিছে।’ তার দাবি, সড়কের পাশের প্রায় ৫০ শতাংশ জমি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি।
সেলিম মোল্লার দখলবাজির বিষয়ে মোটরচালক দল আশুলিয়া থানার সভাপতি নূর হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে মনগড়া কমিটি গঠন করে সেলিম ও তার দোসররা এসব অপকর্ম করছে। এটা জানার পর আশুলিয়া ইউনিয়ন কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
হোস্টেলের সাবেক কর্মকর্তা শাহিদা আক্তার মুঠোফোনে যুগান্তরকে বলেন, জমিটি সরকারি। ৫ আগস্টের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জমিটি নিজেদের দাবি করে মামলা করেছেন এবং অবৈধভাবে দখল বজায় রেখেছেন। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মামলা পরিচালনা করে জমি উদ্ধারের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর দখল করা জায়গায় উচ্চশব্দে গান বাজানো হয়। এতে হোস্টেলে থাকা অনেক শ্রমজীবী নারী যারা পড়াশোনা করেন, তারা হোস্টেল ত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ২২ আগস্ট আশুলিয়ায় চাঁদাবাজি ও ভূমিদখলের অভিযোগে সেলিম মোল্লাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে হোস্টেল দখলের প্রক্রিয়া শুরু করেন ও স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদী মোটরযান দল নামে কমিটি গঠন করেন। আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম মঙ্গলবার বিকালে যুগান্তরকে জানান, এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সেলিম মোল্লার দখলবাজির বিষয়ে আমি পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।
