অভিযোগ পটিয়ার সাবরেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে
পাঁচ কোটি টাকার সরকারি জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি
আবেদ আমিরী, পটিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের পটিয়ায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবরেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি অবমুক্ত না করেই দানপত্র দলিলের মাধ্যমে মালিকানা ব্যক্তির নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া রেজিস্ট্রেশনবিহীন আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ জমি বিক্রয় দলিল হিসাবে রেজিস্ট্রি করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পেয়েছেন যুগান্তর প্রতিবেদক। স্থানীয়দের অভিযোগ, পটিয়া সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয় যেন ঘুসের হাটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দলিলদাতা ও গ্রহীতাদের সঙ্গে দরকষাকষির পর রেজিস্ট্রির কাজ সম্পন্ন হয়। প্রতিটি দলিলে উল্লিখিত মূল্যের ওপর এক শতাংশ নগদ অর্থ এবং হেবা, আমমোক্তারনামা ও ত্রুটিপূর্ণ দলিলের ক্ষেত্রে দরদাম করে ঘুস নেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইনের তোয়াক্কা করা হয় না বলেও অভিযোগ তাদের।
প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি জমি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ : আবদুল আউয়াল নামে এক ব্যক্তি জানান, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি ‘ক’ তফসিলভুক্ত দক্ষিণ ভূর্ষি মৌজার প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের জমি নিয়ে আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আবছার নামে এক ব্যক্তিকে আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দেওয়ার কথা ছিল। পটিয়া সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের পরিবর্তে তাকে কর্ণফুলী উপজেলা ক্যাম্প সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ওই ক্যাম্পের দায়িত্বও পালন করেন পটিয়ার সাবরেজিস্ট্রার। সেখানে দলিলের ধরন না জানিয়ে সাবরেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন দলিল নম্বর ৫৪৯৬/২৫ রেজিস্ট্রি করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, গ্রহীতা নুরুল আবছার ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে তথ্য গোপন করে বেআইনিভাবে ওই দলিল সম্পাদন করে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি জমি নিজের নামে নিয়ে নিয়েছেন।
তদন্তে সরকারি জমি শনাক্ত, ইউএনওর বক্তব্য : এ বিষয়ে রোববার সকালে যুগান্তরের প্রতিবেদক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিক তদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রয়া ত্রিপুরাকে নির্দেশ দেন। ইউএনও বলেন, খতিয়ানের ধরন অনুযায়ী দেখা যায়, ওই জমি ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি করার ক্ষমতা সাবরেজিস্ট্রারের নেই। রোববার বিকালে তদন্ত শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রয়া ত্রিপুরা জানান, তদন্তে জমিটি সরকারি বলে শনাক্ত হয়েছে। ব্যক্তির নামে খতিয়ান ও হালনাগাদ দাখিলা ছাড়া সাবরেজিস্ট্রার ওই জমি রেজিস্ট্রি করতে পারেন না।
পটিয়া দলিল লেখক সমিতির সভাপতি শামসুদ্দোহা বলেন, নামজারি বা জরিপ খতিয়ান এবং খাজনার হালনাগাদ রসিদ ছাড়াই ব্যক্তির নামে জমি রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। এ ঘটনায় সমিতির পক্ষ থেকে সাবরেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন আহমদকে আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি নোটিশ দিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
রেজিস্ট্রেশনবিহীন পাওয়ারে ২০ কোটি টাকার জমি রেজিস্ট্রি : অভিযোগ রয়েছে, কর্ণফুলীর চরলক্ষ্যা মৌজায় রেজিস্ট্রেশনবিহীন আমমোক্তারনামার (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) ভিত্তিতে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের একটি বিক্রয় দলিল (নম্বর-১২০৫৩/২৫) রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, প্রবাস থেকে কারও নামে আমমোক্তারনামা পাঠানো হলে ১২০ দিনের মধ্যে তা গ্রহীতাকে রেজিস্ট্রি করতে হয়। কিন্তু ২০১০ সালে প্রবাস থেকে পাঠানো রেজিস্ট্রেশনবিহীন ওই আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে ১৫ বছর পর ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর, প্রায় ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে বিক্রয় দলিলটি রেজিস্ট্রি করে দেন সাবরেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন-এমন অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক দলিল লেখক ও ভুক্তভোগীর দাবি, অফিস সহকারী জাহাঙ্গীর সিকদারের মাধ্যমে দরকষাকষি করে সাবরেজিস্ট্রারের সঙ্গে গোপন সমঝোতা হলে ত্রুটিপূর্ণ বা যে কোনো ধরনের দলিল রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয়। সেক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইনের তোয়াক্কা করা হয় না। এ কারণে পটিয়া সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয় মানুষের কাছে ‘ঘুসের হাট’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। জাহাঙ্গীর সিকদার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সাবরেজিস্ট্রারের বক্তব্য : পটিয়ার সাবরেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ঘুস নেওয়া অভিযোগ মিথ্যা। এখানে সব নিয়মতান্ত্রিকভাবেই হয়। পটিয়ায় দলিল রেজিস্ট্রির চাপ বেশি। তাই সব দলিল একা দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে সব দায় আমার। তিনি আরও বলেন, পটিয়া সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের পরিবর্তে কর্ণফুলী উপজেলা ক্যাম্প সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল করতে কোনো বাধা নেই।
রেজিস্ট্রেশনবিহীন আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে জমি রেজিস্ট্রি করা যায় না-এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কর্ণফুলীর চরলক্ষ্যার ওই পাওয়ার সরকারি আদেশ জারির আগের। তাই ওই পাওয়ারের ভিত্তিতে দলিল রেজিস্ট্রি করতে আইনগত কোনো বাধা ছিল না।
