তামা গলিয়ে বিক্রি
সারা দেশে চোরের নজর এখন এসির পাইপে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকের বাসিন্দা আলী হোসেন রাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালু করে ঘুমাতে যান। ভোররাতে অতিরিক্ত গরমে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখেন এসি বন্ধ। প্রথমে বিদ্যুৎ নেই মনে করলেও লাইটের সুইচ চাপতেই ভুল ভাঙে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন-এসির আউটডোরের সঙ্গে থাকা পাইপ ভেঙে নিয়ে গেছে চোর।
শুধু শেখেরটেক নয়, রাজধানী ঢাকাসহ জেলা ও থানা শহরে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এসির পাইপসহ অন্য সব সরঞ্জাম চুরির হিড়িক। বাসাবাড়ি বা সরকারি অফিস, মসজিদ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না চোরচক্রের হাত থেকে। গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসির পাইপ চুরির শতাধিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। তবে এর প্রকৃত সংখ্যা বা এ সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেফতারের সঠিক কোনো হিসাব নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বাসা বা অফিস থেকে খুলে ফেলেছেন এসি। এদিকে চুরি করতে গিয়ে চোরচক্রের অনেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বা বহুতল ভবন থেকে পড়ে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টরা জানান, এসির পাইপে থাকা তামার, বৈদ্যুতিক তার ও অন্য সব যন্ত্রাংশ সহজে বিক্রয়যোগ্য হওয়ায় চোররা এসব সামগ্রী চুরি করছে। চুরি করা পাইপের তামার টুকরো গলিয়ে (স্ক্র্যাপ) ভাঙারি দোকানে ৫০০ থেকে ২-৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীদের গচ্চা দিতে হচ্ছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। এতে সাধারণত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, নেশাসক্ত বা স্থানীয় ছোট চোর বেশি জড়িত। তবে পাইপ চুরিতে বড় কোনো সিন্ডিকেট জড়িত কিনা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসির ইনডোর ও আউটডোর ইউনিটের মধ্যে রেফ্রিজারেন্ট বা হিমায়ক পদার্থ চলাচলের জন্য কপার টিউব ব্যবহার করা হয়। এসির পাইপ কেটে ফেললে রেফ্রিজারেন্ট বেরিয়ে গিয়ে সিস্টেমে লিক তৈরি হয়। এতে এসির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও পুরান ঢাকার একাধিক ভাঙারি দোকানে সরেজমিন ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চোরাই ধাতু, বৈদ্যুতিক তার, যন্ত্রাংশ ও অন্য সব সহজে বিক্রয়যোগ্য হওয়ায় চোররা এসব সামগ্রী চুরি করার প্রতি ঝুঁকেছে। পাইপে থাকা প্লাস্টিক বা রাবারের ইনসুলেশন সরিয়ে তামার অংশ আলাদা করা হয়। এরপর তামা স্ক্র্যাপ হিসাবে বা গলিয়ে ভাঙারি দোকানে বা পিতলের সরঞ্জাম তৈরি করা প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করা হয়। গলিয়ে অন্য ধাতুর সঙ্গে তামা মিশিয়ে ফেললে এর প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন কপার পাইপ, গ্যাস রিফিল, আনুষঙ্গিক সামগ্রী ও মিস্ত্রির মজুরি বাবদ ভুক্তভোগীকে ৫ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা গচ্চা দিতে হয়। এসির মডেল, পাইপের দৈর্ঘ্য, গ্যাসের ধরন, ভবনের উচ্চতা ও মেরামতের ধরন অনুযায়ী প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি। চোরাই এসির সরঞ্জাম কারা কিনছে, চোরচক্রের সঙ্গে কাদের যোগাযোগ আছে-তা খতিয়ে দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে হবে। ২৫ আগস্ট মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় দৈনিক অবজারভারের সাংবাদিক মামুনুর রশিদের বাসার এসির পাইপ চুরি হয়। মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে তাকে মেরামত করতে হয়েছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, শুধু আমার বাসায় নয়, ঢাকাজুড়ে এসির পাইপ চুরির মহোৎসব চলছে। চুরি বন্ধে জড়িতদের গ্রেফতারের পাশাপাশি ভাঙারি দোকানে অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ১৩ আগস্ট রাতে শেখেরটেকের একটি ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয়তলা পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্ল্যাটের এসির পাইপ চুরির ঘটনা ঘটে। বাসিন্দা হুমায়ুন জানান, রাতের অন্ধকারে কখন বা কীভাবে পাইপ চুরি হয়েছে-কেউ টের পায়নি। সকালে চুরির বিষয়টি বাসিন্দাদের নজরে আসে। গত জুনে ঈদুল আজহার ছুটিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ৯৮টি এসির পাইপ চুরি হয়। পরে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে এগুলো মেরামত করা হয়। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে ১১টি, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে ৯টি, রামেক ক্যাম্পাসের মসজিদ থেকে ৫টি এবং একটি মাদ্রাসা মসজিদ থেকে ৩টি এসির পাইপ চুরি হয়। এ বছরের শুরুর দিকে যশোর সদর উপজেলায় শতাধিক বাসাবাড়িতে এসির পাইপ চুরির ঘটনা ঘটে। থানায় এ ধরনের ১০টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে এবং চোরচক্রের ১৫ জনকে আটক করা হয়। একই সময়ে পিরোজপুর শহরে এসির তামার পাইপ চুরির পর চোরচক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। স্থানীয় একটি ক্লিনিক থেকে পাইপ চুরি হওয়ার পর প্রতিটি এসি সচল করতে প্রায় ৮ হাজার টাকা করে লেগেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের হাইটেক সিটির নির্মাণাধীন স্থাপনা থেকে ১৪টি এসির তামার পাইপ ও তামার তার চুরি হয়। পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে ১৪টি পাইপ, গলানো ৩ কেজি তামার তার এবং ২৫ কেজি বৈদ্যুতিক কেবল উদ্ধার করে। জুনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে একটি মসজিদের ছাদে থাকা ৬টি এসি ভেঙে কম্প্রেসার, তামার পাইপ ও বৈদ্যুতিক তার নিয়ে যায় চোররা।
এদিকে চুরির পর চোরচক্রের অনেক সদস্য জনতার হাতে ধরা পড়েছে। আবার কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বা বহুতল ভবন থেকে পড়ে মৃত্যুর শিকার হয়েছে। জুনে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে এসির পাইপ চুরির সময় স্থানীয় লোকজনের ধাওয়া খেয়ে পাঁচতলা ভবন থেকে পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়। আগস্টে সিলেটের শাহজালাল এলাকায় পাইপ চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে এক কিশোর মারা যায়। পাশাপাশি ভবন থেকে পড়ে অনেকে গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সেপ্টেম্বরে আদাবর থেকে ছয় অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। এদের সবাই ছিনতাই ও এসির পাইপ চুরির সঙ্গে জড়িত। আগস্টে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ১১টি এসির পাইপ ও অন্য সব সরঞ্জাম চুরির ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে এপ্রিলে ঝালকাঠি প্রেস ক্লাবের এসির পাইপ চুরির সময় দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর চুরির সংখ্যা, মামলা বা গ্রেফতারসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করলেও আলাদাভাবে ‘এসির পাইপ’ চুরির তথ্য রাখা হয় না। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৯ হাজার ৬৭২টি চুরির মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৬৫৫টি মামলা হয়। অর্থাৎ এক বছরে চুরির মামলা বেড়েছে ১ হাজারের বেশি। মামলার সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত ঘটনা কয়েকগুণ বেশি বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। মূলত আইনি ঝামেলা বা হয়রানি এড়াতে অনেকে পুলিশের দ্বারস্থ হতে চান না।
এ বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত এসির পাইপ বা এ ধরনের চুরি গভীর রাতে ঘটে। এছাড়া ভবনের ছাদ বা আড়ালে ঘটায় টহল পুলিশের সদস্যদের পক্ষে তাৎক্ষণিক টের পাওয়া কঠিন। ঘটনার পর চোরচক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতারে চেষ্টা চালানো হয়। শুধু এসির পাইপ চুরি নয়, সব ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

